Table of Contents
হাইলাইটস
- আমেরিকা পর পর দুই দিন ধরে ইরানের ওপর হামলা চালিয়েছে।
- প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, “গতকাল কঠোর আঘাত করেছি, আজও করব।”
- মার্কিন অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ভূপাতিত হওয়াকে কেন্দ্র করে এই সংঘাত।
- বাহরাইন, জর্ডন ও কুয়েতের মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান।
- হরমুজ প্রণালী নিয়ে অচলাবস্থা এবং ব্যর্থ শান্তি-আলোচনার জেরে দুই মাসের যুদ্ধবিরতি কার্যত ভেঙে পড়ার মুখে।
- কাতার নতুন করে মধ্যস্থতার চেষ্টা শুরু করলেও পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে।
- সংঘাতের প্রভাব পড়ছে আন্তর্জাতিক তেলের বাজার ও বিশ্ব অর্থনীতিতে।
বাংলাস্ফিয়ার: দুই মাস আগে যে যুদ্ধবিরতি মধ্যপ্রাচ্যে সাময়িক স্বস্তি এনে দিয়েছিল, তা এখন কার্যত ধ্বংসের মুখে। টানা দ্বিতীয় দিনের মতো ইরানের বিভিন্ন সামরিক ও কৌশলগত স্থাপনার উপর বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আরও বড় আঘাতের হুমকি দিয়ে জানিয়ে দিয়েছেন, ওয়াশিংটন আপাতত সামরিক চাপ কমানোর কোনও লক্ষণ দেখাচ্ছে না।
বুধবার সন্ধ্যায় মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) ঘোষণা করে যে প্রেসিডেন্টের নির্দেশে ইরানের একাধিক লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে নতুন করে “আত্মরক্ষামূলক হামলা” শুরু হয়েছে। মার্কিন সময় বিকেল ৫টা ১৫ মিনিটে শুরু হওয়া এই অভিযান কয়েক ঘণ্টা ধরে চলেছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর বক্তব্য, সাম্প্রতিক হামলাগুলি ইরানের “অযৌক্তিক ও ধারাবাহিক আগ্রাসনের” জবাব।
অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ভূপাতিত হওয়ার পর পরিস্থিতির বিস্ফোরণ
বর্তমান সংঘাতের সূত্রপাত ঘটে হরমুজ প্রণালীর উপরে একটি মার্কিন অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ভূপাতিত হওয়ার ঘটনাকে ঘিরে। ট্রাম্প প্রশাসন সরাসরি ইরানকে দায়ী করেছে।
মঙ্গলবার প্রথম দফায় মার্কিন বাহিনী ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, রাডার কেন্দ্র এবং স্থল নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামোর উপর হামলা চালায়। মার্কিন দাবি, এটি ছিল “অনুপাতিক প্রতিক্রিয়া”।
তবে বুধবার ট্রাম্প আরও আক্রমণাত্মক সুরে বলেন, “আমরা গতকাল ওদের কঠোরভাবে আঘাত করেছি, আজও করব।”
হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সামনে তিনি অভিযোগ করেন, ইরানি আলোচকরা শান্তি-আলোচনাকে ইচ্ছাকৃতভাবে দীর্ঘায়িত করছেন।
ট্রাম্পের ভাষায়, “আমরা একটা চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলাম। কিন্তু ওরা বারবার সময় নষ্ট করছে, আমাদের বোকা বানানোর চেষ্টা করছে।”
নতুন হামলায় কোথায় আঘাত?
ইরানের সরকারি ও আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, বুধবার রাতে দক্ষিণ ইরানের বান্দার আব্বাস, সিরিক এবং মিনাব এলাকায় একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়।
মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ হামলার আগে সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে সেন্ট্রাল কমান্ডের জন্য “ব্যস্ত রাত” অপেক্ষা করছে। তিনি বলেন, “ইরানের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলিতে বোমা পড়বে। আমরা যুদ্ধ বাড়াতে চাই না, কিন্তু এমন শর্ত তৈরি করতে চাই যা প্রেসিডেন্ট প্রত্যাশা করেন।”
ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প আরও একধাপ এগিয়ে ইঙ্গিত দেন যে প্রয়োজনে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র, সেতু এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতেও হামলা চালানো হতে পারে।
ইরানের পাল্টা জবাব
মার্কিন হামলার জবাবে ইরানও দ্রুত পাল্টা আঘাত হানে।
ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) দাবি করেছে, তারা বাহরাইন, জর্ডন এবং কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলির দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুঁড়েছে। তাদের বক্তব্য, যদি যুক্তরাষ্ট্র আবার হামলা চালায়, তাহলে “চূর্ণবিচূর্ণ করে দেওয়া হবে”।
তবে মার্কিন সেনাবাহিনীর দাবি, অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন মাঝ আকাশেই ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। কোনও বড় ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের খবর নেই।
পানীয় জলের সংকট: মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা
ইরানের সরকারি টেলিভিশন অভিযোগ করেছে, মার্কিন হামলায় দক্ষিণ ইরানের দুটি জলাধার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এর ফলে প্রায় ২০ হাজার মানুষ নিরাপদ পানীয় জল থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
স্থানীয় জল কর্তৃপক্ষের উদ্ধৃতি দিয়ে রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ৪৫ থেকে ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার মধ্যে পরিস্থিতি “অত্যন্ত সংকটজনক” হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি এই তথ্য সত্য হয়, তাহলে সংঘাত কেবল সামরিক পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থাকবে না; তা দ্রুত মানবিক সঙ্কটে পরিণত হতে পারে।
যুদ্ধবিরতি কার্যত অকার্যকর
এপ্রিল মাসের শুরুতে যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল, তা মূলত মার্কিন-ইরান সরাসরি সংঘাত থামানোর উদ্দেশ্যে গৃহীত হয়। কিন্তু তারপর থেকেই বারবার ছোটখাটো হামলা, পাল্টা হামলা এবং অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ চলছিল।
দুই পক্ষই একে অপরকে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের জন্য দায়ী করেছে। এই অবস্থায় সাম্প্রতিক হামলাগুলি যুদ্ধবিরতির অস্তিত্বকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
ইরানের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘায়ি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, মার্কিন হামলা শান্তি-আলোচনার পরিবেশ নষ্ট করে দিয়েছে। তার কথায়, “কোনও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার জন্য ন্যূনতম স্থিতিশীল পরিবেশ প্রয়োজন। সাম্প্রতিক ঘটনার পরে আমাদের পুরো পরিস্থিতি পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে।” তিনি আরও অভিযোগ করেন, লেবাননে ইজরায়েলের সামরিক তৎপরতাও আলোচনার পথে বাধা সৃষ্টি করছে।
কূটনীতির শেষ চেষ্টা: কাতারের উদ্যোগ
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে মধ্যস্থতাকারীরা এখনও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
ইরানি সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, কাতারের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল বুধবার তেহরানে পৌঁছেছে। তাদের লক্ষ্য, যুদ্ধবিরতি পুনরুজ্জীবিত করা এবং নতুন সংঘাত এড়ানো।
কাতার গত কয়েক মাস ধরেই আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে। তবে সামরিক পরিস্থিতি যেভাবে দ্রুত অবনতি হচ্ছে, তাতে কূটনৈতিক উদ্যোগ সফল হবে কি না, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
তেল, হরমুজ ও বিশ্ব অর্থনীতি
সংঘাতের কেন্দ্রে রয়েছে হরমুজ প্রণালী। বিশ্বের মোট সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে যাতায়াত করে।
বর্তমানে ইরান প্রণালীর উপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে চাইছে, অন্যদিকে আমেরিকা ইরানি বন্দরগুলির উপর অবরোধ চালিয়ে যাচ্ছে।
ট্রাম্প দাবি করেছেন, আমেরিকা গোপনে ইরানের লক্ষ লক্ষ ব্যারেল তেল সরিয়ে নিচ্ছে।
তিনি বলেন, “আমরা প্রতি রাতে লক্ষ লক্ষ ব্যারেল তেল বের করে আনছি। এ কারণেই তেলের দাম ২৫০ ডলার নয়, ৮৫-৯০ ডলারের মধ্যে রয়েছে।” যদিও এই দাবির পক্ষে তিনি কোনও প্রমাণ দেননি।
তবে বাস্তবতা হল, হরমুজ প্রণালীতে চলাচল বিঘ্নিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল, জ্বালানি সরবরাহ এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য ইতিমধ্যেই চাপে পড়েছে। খাদ্য, জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বহু দেশে বাড়তে শুরু করেছে।
শান্তিচুক্তির প্রধান বাধা
আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে স্থায়ী শান্তিচুক্তির পথে এখনও বড় কয়েকটি বাধা রয়ে গেছে।
ইরান চাইছে:
- আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার
- বিদেশে আটকে থাকা বিপুল সম্পদ মুক্ত করা
- হরমুজ প্রণালীর উপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ
অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রধান শর্ত:
- ইরান কোনও অবস্থাতেই পরমাণু অস্ত্র তৈরি করতে পারবে না।
যদিও তেহরান বারবার দাবি করেছে, তাদের পরমাণু কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ।
এ ছাড়া লেবাননে ইজরায়েল ও হিজবুল্লাহর সংঘর্ষও আলোচনাকে জটিল করে তুলেছে। ইরান চায়, যে কোনও চুক্তিতে লেবানন ফ্রন্টকেও অন্তর্ভুক্ত করা হোক। কিন্তু আমেরিকা ও ইজরায়েল এই দুই বিষয়কে আলাদা রাখতে আগ্রহী।
উপসংহার
পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে যুদ্ধ ও শান্তির মধ্যে ব্যবধান অত্যন্ত ক্ষীণ। একদিকে ট্রাম্প প্রশাসন সামরিক শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে ইরানকে চাপে ফেলতে চাইছে, অন্যদিকে তেহরানও পিছিয়ে যাওয়ার কোনও লক্ষণ দেখাচ্ছে না।
কাতারসহ আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীরা এখনও সমাধানের চেষ্টা চালাচ্ছেন। কিন্তু প্রতিদিনের নতুন হামলা, পাল্টা হামলা এবং উত্তেজনাপূর্ণ বক্তব্য সেই প্রচেষ্টাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
যদি দ্রুত কোনও রাজনৈতিক সমঝোতা না হয়, তাহলে হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে এই সংঘাত শুধু পশ্চিম এশিয়া নয়, সমগ্র বিশ্বের অর্থনীতি ও নিরাপত্তার জন্য এক নতুন সংকটের সূচনা করতে পারে।