Home বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিএআই ও ভবিষ্যৎ রোবট যখন মুদি সামগ্রী পৌঁছে দেয়

রোবট যখন মুদি সামগ্রী পৌঁছে দেয়

মিল্টন কেইন্সে ভবিষ্যতের ঝলক, যেখানে ডেলিভারি কর্মীর জায়গা নিচ্ছে ছয় চাকার যন্ত্র

0 comments 13 views 4 minutes read
A+A-
Reset

হাইলাইটস:

  • ইংল্যান্ডের মিল্টন কেইন্স শহরে রোবট এখন নিয়মিতভাবে মুদি সামগ্রী ও খাবার পৌঁছে দিচ্ছে।
  • এস্তোনিয়ার স্টারশিপ টেকনোলজিস দাবি করছে, তাদের রোবট মানুষের তুলনায় কম খরচে ডেলিভারি করতে সক্ষম।
  • ১২ বছরের প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ফলে প্রতি ডেলিভারির খরচ এক পাউন্ডেরও নিচে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়েছে সংস্থাটি।
  • ২০২৫ সালে স্টারশিপের ২,৪১৪টি রোবট ৫২ লক্ষ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেছে।
  • এই প্রযুক্তি শহরের চেহারা বদলে দিতে পারে, যদিও কর্মসংস্থান নিয়ে নতুন প্রশ্নও তুলছে।

বাংলাস্ফিয়ার: সানফ্রান্সিসকোতে বাস করলে মাঝে মাঝেই ভবিষ্যতের এক ঝলক চোখে পড়ে। হয়তো চালকবিহীন ট্যাক্সিতে চেপে অফিসে যাচ্ছেন, কিংবা রাস্তায় স্বয়ংক্রিয় গাড়ির বহর দেখছেন। কিন্তু যদি সত্যিই দেখতে চান মানুষের বদলে যন্ত্র কীভাবে দৈনন্দিন কাজ সামলাতে শুরু করেছে, তাহলে যেতে হবে ইংল্যান্ডের মিল্টন কেইন্স শহরে।

অক্সফোর্ড ও কেমব্রিজের মাঝামাঝি অবস্থিত এই শহরটি এতদিন পরিচিত ছিল তার অসংখ্য গোলচত্বরের জন্য। এখন সেটিই হয়ে উঠেছে এক নতুন প্রযুক্তিগত বিপ্লবের পরীক্ষাগার। এখানে ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে ডেলিভারি চালকদের উপস্থিতি। তাদের জায়গা নিচ্ছে ছোট ছোট ছয় চাকার রোবট।

এই পরিবর্তনের নেপথ্যে রয়েছে এস্তোনিয়াভিত্তিক সংস্থা স্টারশিপ টেকনোলজিস। তাদের দাবি, মুদি সামগ্রী বা খাবার পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে তারা এমন এক প্রযুক্তি তৈরি করেছে, যা মানুষের তুলনায় অনেক কম খরচে কাজ করতে পারে।

প্রথম দেখায় স্টারশিপের রোবটগুলোকে বড়সড় বরফ রাখার বাক্স বা কুলারের মতো মনে হয়। ছয়টি চাকার উপর ভর করে এগুলো ফুটপাথ ধরে এগিয়ে চলে। কিন্তু বাহ্যিক সরলতার আড়ালে রয়েছে জটিল প্রযুক্তির সমাহার।

রোবটগুলির গায়ে বসানো আছে বিভিন্ন ধরনের সেন্সর। বৃষ্টি, কুয়াশা কিংবা অন্ধকার—সব ধরনের পরিস্থিতিতে এগুলোকে পথ চিনতে হয়। শুধু তাই নয়, সংগৃহীত তথ্যকে বিশ্লেষণ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সফটওয়্যারকে নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে হয় কোন পথ সবচেয়ে উপযুক্ত হবে।

আরও বড় চ্যালেঞ্জ হল স্বনির্ভরতা। যদি কোনো কারণে তথ্যকেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তাহলেও রোবটকে তার কাজ চালিয়ে যেতে হবে। অর্থাৎ, তাকে শুধু নির্দেশ পালনকারী যন্ত্র হলেই চলবে না; পরিস্থিতি বুঝে নিজে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও থাকতে হবে।

তবে চালকবিহীন ট্যাক্সির তুলনায় ডেলিভারি রোবটের কাজ কিছুটা সহজ। একটি রোবটের ওজন মাত্র ৩৫ কিলোগ্রাম এবং এর সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ৬ কিলোমিটার। অন্যদিকে একটি গাড়ির ওজন হতে পারে দুই টনেরও বেশি এবং সেটি ঘণ্টায় ১১০ কিলোমিটার বেগে ছুটতে পারে।

ফলে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও তুলনামূলকভাবে কম। একটি রোবট যদি হঠাৎ ভুল করে, তার ক্ষতির পরিমাণ একটি দ্রুতগতির গাড়ির ভুলের তুলনায় অনেক কম হবে। আর পিৎজা বা মুদি সামগ্রী সামান্য নড়ে গেলেও বড় সমস্যা নেই।

তবু চ্যালেঞ্জের শেষ নেই। চালকবিহীন ট্যাক্সি নির্মাতারা গাড়ি তৈরির কাজটি প্রচলিত মোটরগাড়ি সংস্থাগুলোর উপর ছেড়ে দিতে পারে। কিন্তু ডেলিভারি রোবট নির্মাতাদের সেই সুযোগ নেই। তাদের নিজস্বভাবে যন্ত্রের নকশা তৈরি করতে হয়, নতুন সংস্করণ আনতে হয় এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ক্রমাগত উন্নতি করতে হয়।

স্টারশিপের সহ-প্রতিষ্ঠাতা আহতি হেইনলা—যিনি একসময় জনপ্রিয় ভিডিও কল পরিষেবা স্কাইপেরও সহ-প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন—বলছেন, বছরের পর বছর ধরে ছোট ছোট উন্নতির ফলেই আজকের অবস্থানে পৌঁছেছে সংস্থাটি।

কিছু উন্নতি এসেছে একেবারেই অপ্রত্যাশিত দিক থেকে। উদাহরণস্বরূপ, নতুন প্রজন্মের রোবটগুলো তারবিহীন পদ্ধতিতে চার্জ হয়। এর ফলে চার্জিং পোর্টের ক্ষয় কমে এবং চার্জ দেওয়ার প্রক্রিয়াও দ্রুত হয়।

এই ধরনের অসংখ্য সূক্ষ্ম পরিবর্তনের ফলেই গত ১২ বছরে ডেলিভারির খরচ নাটকীয়ভাবে কমে এসেছে। হেইনলার দাবি, এখন প্রতিটি ডেলিভারির ব্যয় একজন মানব কর্মীকে পারিশ্রমিক দেওয়ার তুলনায় অনেক কম। তাদের লক্ষ্য প্রতি ডেলিভারির খরচ এক পাউন্ডের নিচে নামিয়ে আনা। তাঁর কথায়, “সেই লক্ষ্য এখনও পুরোপুরি অর্জিত হয়নি, কিন্তু আমরা খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছি।”

সংস্থার বৃদ্ধির পরিসংখ্যানও চমকপ্রদ। ২০১৮ সালে স্টারশিপের ছিল মাত্র ১২৭টি রোবট। সারা বছরে তারা মোট ১ লক্ষ ১৬ হাজার কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেছিল। মাত্র সাত বছরের ব্যবধানে, ২০২৫ সালে রোবটের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২,৪১৪-এ। আর তাদের মোট ভ্রমণ দূরত্ব পৌঁছে যায় ৫২ লক্ষ কিলোমিটারে।

এই সময়ে মানব হস্তক্ষেপের প্রয়োজনও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, প্রতি কিলোমিটার চলাচলের ক্ষেত্রে মানুষের সহায়তার প্রয়োজনীয়তা আট ভাগের সাত ভাগ কমে গেছে।

তবু সমস্যামুক্ত বলা যাবে না। হাজার হাজার রোবট যখন প্রতিদিন রাস্তায় নামে, তখন বিরল ত্রুটিগুলিও নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়। কখনও কোনো রোবট রাস্তার মাঝখানে থেমে যেতে পারে, কখনও কোনো যান্ত্রিক গোলযোগ দেখা দিতে পারে।

এই সমস্যার সমাধানও প্রযুক্তিগত। স্টারশিপ একটি অতিরিক্ত ব্যাক-আপ কম্পিউটার যুক্ত করেছে, যার একমাত্র কাজ হলো জরুরি পরিস্থিতিতে রোবটটিকে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেওয়া।

এই ছোট্ট ছয় চাকার যন্ত্রগুলো ভবিষ্যতে শুধু ডেলিভারি ব্যবস্থাই নয়, শহরের চেহারাও বদলে দিতে পারে। ফুটপাথে মানুষ ও রোবটের সহাবস্থান হয়তো একসময় সাধারণ দৃশ্য হয়ে উঠবে।

তবে একটি প্রশ্ন থেকেই যায়—এতে কি মানুষ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে আরও বেশি ভালোবাসতে শিখবে?

সম্ভবত না। বিশেষ করে যদি আপনি এমন একজন ডেলিভারি কর্মী হন, যার চাকরির জায়গা দখল করছে এই প্রযুক্তি।

তবু প্রযুক্তির প্রতি মানুষের আবেগময় প্রতিক্রিয়ার কিছু মজার দৃষ্টান্তও রয়েছে। ফিনল্যান্ডে, যা স্টারশিপের সবচেয়ে বড় বাজার, এক সুপারমার্কেট অংশীদারের পরিচালককে প্রকাশ্যে অনুরোধ করতে হয়েছে—রোবটগুলো তুষারের স্তূপে আটকে গেলে যেন সহানুভূতিশীল পথচারীরা সেগুলো উদ্ধার করতে না যান।

কারণ, রোবটকে বাঁচাতে গিয়ে যদি কোনো মানুষ নিজেই পিছলে পড়ে আহত হন, তাহলে সেটি নিশ্চয়ই প্রযুক্তির অগ্রগতির সবচেয়ে অদ্ভুত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হবে।

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles