Table of Contents
হাইলাইটস
- ভাঙড় বিস্ফোরণ মামলায় প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক সওকত মোল্লাকে ১৪ দিনের এনআইএ হেফাজতে পাঠাল বিশেষ আদালত।
- এনআইএ আদালতে দাবি করেছে, সওকত এই মামলার “মূল ষড়যন্ত্রী” এবং বিস্ফোরণের পর প্রমাণ নষ্ট করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল।
- তাঁর কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া মোবাইল ফোন ও পেন ড্রাইভের ফরেনসিক পরীক্ষার অনুমতিও দিয়েছে আদালত।
- বিস্ফোরণে এক মহিলার মৃত্যু ও একাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছিলেন বলে তদন্তকারী সংস্থার দাবি।
- আদালতে জামিনের আবেদন করলেও তা খারিজ হয়ে যায়।
পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত ঘটনায় নতুন মোড় এল শনিবার। ভাঙড় বিস্ফোরণ মামলায় গ্রেফতার হওয়া প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক সওকত মোল্লাকে ১৪ দিনের জন্য এনআইএ হেফাজতে পাঠিয়েছে বিশেষ আদালত। তদন্তকারী সংস্থার দাবি, তিনি শুধুমাত্র ঘটনায় জড়িত নন, বরং গোটা চক্রান্তের অন্যতম প্রধান পরিকল্পনাকারী।
শুক্রবার রাতে গ্রেফতারের পর শনিবার কড়া নিরাপত্তার মধ্যে তাঁকে আদালতে তোলা হয়। এনআইএ আদালতের কাছে জানায়, সওকত মোল্লাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা অত্যন্ত জরুরি, কারণ তদন্তে এমন তথ্য উঠে এসেছে যা তাঁর প্রত্যক্ষ ভূমিকার ইঙ্গিত দিচ্ছে। সংস্থার দাবি, বিস্ফোরণের ঘটনায় যুক্ত অন্যান্য অভিযুক্তদের তিনি নির্দেশ দিতেন এবং ঘটনার পরে প্রমাণ লোপাটের চেষ্টাও হয়েছিল।
কী ঘটেছিল ভাঙড়ে?
তদন্তকারীদের বক্তব্য অনুযায়ী, গত ১৯ মার্চ দক্ষিণ ২৪ পরগনার ভাঙড়ের দক্ষিণ বামুনিয়া এলাকায় একটি বিস্ফোরণ ঘটে। অভিযোগ, সেখানে বোমা তৈরির কাজ চলছিল। বিস্ফোরণে অন্তত একজনের মৃত্যু হয় এবং একাধিক মানুষ আহত হন। ঘটনাস্থল থেকে বিপুল পরিমাণ কাঁচা বোমা ও বিস্ফোরক সামগ্রী উদ্ধার করা হয়। পরে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের নির্দেশে মামলার তদন্তভার এনআইএর হাতে তুলে দেওয়া হয়।
এনআইএর দাবি, বিস্ফোরণটি কোনও বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা ছিল না। এর পিছনে একটি সংগঠিত নেটওয়ার্ক কাজ করছিল। তদন্তে ইতিমধ্যে চারজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আদালতে সংস্থা জানিয়েছে, এই চারজনের জিজ্ঞাসাবাদ এবং অন্যান্য তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতেই সওকত মোল্লার বিরুদ্ধে সন্দেহ আরও জোরদার হয়েছে।
আদালতে কী বলল এনআইএ?
বিশেষ আদালতে এনআইএর আইনজীবীরা দাবি করেন, সওকত মোল্লা এই মামলার “প্রধান ষড়যন্ত্রী”। তাঁকে এখনই মুক্তি দেওয়া হলে তদন্তে প্রভাব পড়তে পারে। তিনি এলাকার একজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা হওয়ায় সাক্ষীদের ওপর চাপ সৃষ্টি বা প্রমাণ নষ্ট করার আশঙ্কা রয়েছে বলেও আদালতকে জানায় সংস্থা।
এনআইএ আরও জানায়, সওকতের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া মোবাইল ফোন এবং একটি পেন ড্রাইভে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য থাকতে পারে। সেই কারণেই ওই ইলেকট্রনিক ডিভাইসগুলির ফরেনসিক পরীক্ষার অনুমতি চাওয়া হয়। আদালত সেই আবেদন মঞ্জুর করেছে।
সওকতের পাল্টা যুক্তি
অন্যদিকে সওকত মোল্লার আইনজীবীরা আদালতে জামিনের আবেদন করেন। তাঁদের বক্তব্য, একজন জেড-প্লাস নিরাপত্তাপ্রাপ্ত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের পক্ষে এমন কর্মকাণ্ডে সরাসরি যুক্ত থাকা বাস্তবসম্মত নয়। তাঁরা দাবি করেন, সওকতের সঙ্গে বিস্ফোরণের কোনও প্রত্যক্ষ যোগসূত্র এখনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
প্রতিরক্ষা পক্ষ আরও জানায়, ইতিমধ্যেই একাধিক মোবাইল ফোন বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে এবং বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ফলে শুধুমাত্র সন্দেহের ভিত্তিতে একজন প্রাক্তন বিধায়ককে দীর্ঘ সময় হেফাজতে রাখার যৌক্তিকতা নেই।
তল্লাশি থেকে গ্রেফতার
গ্রেফতারের আগে গত কয়েক দিনে এনআইএ সওকত মোল্লার বাড়ি ও তাঁর পরিবারের সঙ্গে যুক্ত একাধিক সম্পত্তিতে তল্লাশি চালায়। দক্ষিণ ২৪ পরগনা, সোনারপুর এবং অন্যান্য এলাকায় একাধিক স্থানে অভিযান চলে। তদন্তকারীরা তাঁর ছেলে ইমরান মোল্লার সঙ্গেও কথা বলেন। এই ধারাবাহিক অভিযানের পরই শুক্রবার রাতে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়।
রাজনৈতিক অভিঘাত
সওকত মোল্লা দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ ২৪ পরগনার রাজনীতিতে পরিচিত মুখ। ফলে তাঁর গ্রেফতারি এবং পরবর্তী এনআইএ হেফাজত নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক গুরুত্ব বহন করছে। বিশেষত এমন সময়ে এই ঘটনা ঘটল, যখন পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আগেই উত্তপ্ত।
তবে তদন্ত এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। আদালতে এনআইএ যে অভিযোগ করেছে, সেগুলি এখনও বিচারাধীন। শেষ পর্যন্ত আদালতে প্রমাণের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হবে সওকত মোল্লার ভূমিকা কতটা ছিল এবং তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ কতটা প্রতিষ্ঠিত হয়।
এই মুহূর্তে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, ভাঙড় বিস্ফোরণ মামলা শুধুমাত্র একটি ফৌজদারি তদন্ত নয়; এটি পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আইনি লড়াই হয়ে উঠতে চলেছে।