হাইলাইটস

  • ৫৮ জন বিধায়কের নতুন পরিষদীয় শিবিরকে ঘিরে শুরু হয়েছে মহারাষ্ট্র মডেলের তুলনা।
  • কিন্তু মহারাষ্ট্রে শিবসেনা ও এনসিপির বিভাজনের চরিত্র এক ছিল না।
  • পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে এনসিপির অভিজ্ঞতার মিল বেশি দেখা যাচ্ছে।
  • বিধায়ক সংখ্যার লড়াইয়ের পরে আসল পরীক্ষা হবে সংগঠন, প্রতীক এবং রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের প্রশ্নে।

বাংলাস্ফিয়ার: পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তৃণমূল কংগ্রেসের সাম্প্রতিক বিভাজনকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত শব্দবন্ধ হল “মহারাষ্ট্র মডেল”। রাজনৈতিক আলোচনায়, টেলিভিশনের বিতর্কে, সামাজিক মাধ্যমে এবং দলীয় অন্দরে বারবার এই তুলনা উঠে আসছে। কারণ ঘটনাটির বাইরের কাঠামো দেখলে মিল খুঁজে পাওয়া কঠিন নয়। একটি বড় আঞ্চলিক দলের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ পুরনো নেতৃত্ব থেকে দূরে সরে গিয়ে নতুন নেতৃত্বের চারপাশে জড়ো হয়েছে। বিধানসভার অভ্যন্তরে তারা আলাদা শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে এবং সেই শক্তি এখন আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতিও পেয়েছে।

কিন্তু রাজনৈতিক ইতিহাসের বিচার যদি একটু গভীরে গিয়ে করা হয়, তাহলে দেখা যাবে বিষয়টি এত সরল নয়। মহারাষ্ট্রে গত কয়েক বছরে দুটি বড় রাজনৈতিক বিভাজন ঘটেছে। প্রথমটি শিবসেনায়, দ্বিতীয়টি এনসিপিতে। এই দুই ঘটনার মধ্যে যেমন কিছু মিল ছিল, তেমনি ছিল গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যও। পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান পরিস্থিতিকে বোঝার জন্য তাই শুধু একনাথ শিন্ডের শিবসেনার দিকে তাকালে চলবে না। সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে অজিত পাওয়ারের এনসিপির ঘটনাকেও।

শিবসেনার ক্ষেত্রে বিদ্রোহের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন উদ্ধব ঠাকরে। বিদ্রোহী শিবিরের বক্তব্য ছিল, দল তার মূল আদর্শ থেকে সরে এসেছে এবং যে রাজনৈতিক পথে বালাসাহেব ঠাকরে সংগঠনকে তৈরি করেছিলেন, সেই পথ আর অনুসরণ করা হচ্ছে না। ফলে সেখানে সংঘাত ছিল প্রত্যক্ষ। নেতৃত্বের বৈধতা এবং রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা—দুটিই প্রশ্নের মুখে পড়েছিল। বিদ্রোহীরা নিজেদের নতুন শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার পাশাপাশি পুরনো নেতৃত্বের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকেও চ্যালেঞ্জ করেছিল।

এনসিপির ঘটনাটি অন্য রকম ছিল। অজিত পাওয়ার এবং তাঁর সঙ্গে যাওয়া বিধায়করা শরদ পাওয়ারের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা বা রাজনৈতিক অবদানকে অস্বীকার করেননি। প্রকাশ্যে তাঁরা বারবার শরদ পাওয়ারের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। কিন্তু একই সঙ্গে তাঁরা বাস্তব রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রকে নিজেদের দিকে সরিয়ে এনেছেন। ফলে বাইরে থেকে দেখলে শ্রদ্ধা বজায় ছিল, কিন্তু ভেতরে ভেতরে ক্ষমতার স্থানান্তর ঘটছিল। এই কারণেই অনেক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মনে করেন, এনসিপির বিভাজন ছিল রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের প্রশ্নে এক ধরনের নীরব যুদ্ধ।

পশ্চিমবঙ্গে বর্তমানে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তার সঙ্গে এই অভিজ্ঞতার সাদৃশ্য অস্বীকার করা কঠিন। কারণ বিদ্রোহী শিবিরের অধিকাংশ নেতা এখনও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সরাসরি আক্রমণের পথ বেছে নেননি। তাঁদের বক্তব্যের মূল লক্ষ্য দলের বর্তমান পরিচালন কাঠামো, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরন এবং নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ রূপ নিয়ে। অর্থাৎ বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর চারপাশে গড়ে ওঠা ক্ষমতার বলয়।

এই পার্থক্যটি রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কোনও দলের প্রতিষ্ঠাতার বিরুদ্ধে সরাসরি বিদ্রোহ সাধারণত অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। প্রতিষ্ঠাতা নেতা দলের আবেগ, ইতিহাস এবং পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকেন। কিন্তু উত্তরসূরি নেতৃত্বকে কেন্দ্র করে প্রশ্ন তোলা তুলনামূলকভাবে সহজ। কারণ সেখানে বিতর্কের জায়গা বেশি থাকে এবং দলের অভ্যন্তরে বিকল্প মত গড়ে ওঠার সুযোগও বেশি থাকে।

তৃণমূলের বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই বাস্তবতাই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। যারা নতুন পরিষদীয় শিবিরে গিয়েছেন, তাঁদের অনেকেই নিজেদের এখনও তৃণমূলের রাজনৈতিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবেই তুলে ধরছেন। তাঁরা দাবি করছেন, দলকে বাঁচানোর জন্যই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এই যুক্তির সঙ্গে এনসিপির অভিজ্ঞতার মিল খুঁজে পাওয়া যায়। কারণ সেখানেও বিদ্রোহীরা নিজেদের দলবিরোধী নয়, বরং দলের প্রকৃত প্রতিনিধিত্বকারী শক্তি হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছিলেন।

তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতার জায়গা রয়েছে। মহারাষ্ট্রের ঘটনাগুলিকে আজ আমরা যে রূপে দেখি, সেগুলি একদিনে সেই পর্যায়ে পৌঁছায়নি। প্রথমে বিধায়কদের সমর্থন জোগাড় হয়েছিল। তারপর শুরু হয়েছিল সংগঠনের ওপর নিয়ন্ত্রণের লড়াই। এরপর আসে নির্বাচন কমিশনের সামনে বৈধতার প্রশ্ন। শেষ পর্যন্ত প্রতীক, দলীয় নাম এবং রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে দীর্ঘ সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত ফলাফল নির্ধারিত হয়েছিল।

পশ্চিমবঙ্গে এখনও সেই দীর্ঘ পথের প্রথম ধাপ অতিক্রম করা হয়েছে মাত্র। আজকের দিনে সবচেয়ে বড় সম্পদ হল বিধায়ক সংখ্যা। কিন্তু রাজনীতির বাস্তব জগতে শুধু বিধায়ক সংখ্যা দিয়ে কোনও দলকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। জেলা কমিটি, ব্লক কমিটি, পুরসভা, পঞ্চায়েত, ছাত্র সংগঠন, যুব সংগঠন, শ্রমিক সংগঠন এবং স্থানীয় স্তরের হাজার হাজার কর্মী—এই সমগ্র নেটওয়ার্কই একটি রাজনৈতিক দলের প্রকৃত শক্তি তৈরি করে।

আগামী কয়েক মাসে যদি দেখা যায় এই সাংগঠনিক স্তরগুলির উল্লেখযোগ্য অংশও নতুন শিবিরের দিকে ঝুঁকছে, তাহলে মহারাষ্ট্রের তুলনা অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠবে। কিন্তু যদি বিভাজন বিধানসভার ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকে এবং সংগঠনের বৃহত্তর অংশ পুরনো নেতৃত্বের সঙ্গে থেকে যায়, তাহলে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন দিকে যেতে পারে।

আরও একটি বাস্তব পার্থক্য চোখে পড়ে। মহারাষ্ট্রে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলি শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার কাঠামোর অংশ হয়ে উঠেছিল। প্রশাসনিক ক্ষমতা, সরকারি প্রভাব এবং শাসনযন্ত্রের সঙ্গে তাদের প্রত্যক্ষ সংযোগ তৈরি হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই সুবিধা নেই। এখানে নতুন শিবিরকে নিজেদের রাজনৈতিক ভিত্তি গড়ে তুলতে হবে বিরোধী রাজনীতির পরিসরে দাঁড়িয়েই। ফলে তাদের সামনে চ্যালেঞ্জও অনেক বেশি।

এই কারণেই বর্তমান পরিস্থিতিকে সরাসরি মহারাষ্ট্র মডেল বলে চিহ্নিত করা কিছুটা অগ্রিম সিদ্ধান্ত হয়ে যাবে। বরং বলা যেতে পারে, ঘটনাপ্রবাহটি এখনও বিকাশের পর্যায়ে রয়েছে। আজ যা দেখা যাচ্ছে, তা মূলত পরিষদীয় শক্তির পুনর্বিন্যাস। আগামী দিনে দেখা যাবে সংগঠন কার হাতে যায়। তারপর নির্ধারিত হবে রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এবং দলের প্রকৃত পরিচয় নিয়ে লড়াই কোন দিকে এগোয়।

রাজনীতির ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, কোনও দলের ভাঙনের সবচেয়ে নাটকীয় মুহূর্তটি শুরুতে নয়, পরে আসে। প্রথমে সংখ্যার হিসাব পাল্টায়, তারপর ক্ষমতার কেন্দ্র বদলায়, এবং সবশেষে বদলে যায় রাজনৈতিক পরিচয়ের মালিকানা। পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান পরিস্থিতি সেই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার কোন পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে, তার উত্তর এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।

তবে একটি বিষয় নিশ্চিত। এই ঘটনাকে শুধুমাত্র শিবসেনার উদাহরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না। এনসিপির অভিজ্ঞতাও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। কারণ এখানে প্রশ্ন শুধু বিদ্রোহের নয়, উত্তরাধিকারেরও। প্রশ্ন শুধু সংখ্যার নয়, বৈধতারও। আর সেই কারণেই তৃণমূলের বর্তমান সংকটকে মহারাষ্ট্রের একক মডেল নয়, বরং শিবসেনা ও এনসিপি—দুই অভিজ্ঞতার আলোকে বিচার করাই অধিকতর যুক্তিযুক্ত।