হাইলাইটস
ব্যক্তিগত আয়করের সর্বোচ্চ হার প্রায় ৩৯.৭%, তবুও ধনীদের কাছে সুইজারল্যান্ডের আকর্ষণ অটুট।
বুলগেরিয়া, রোমানিয়া, হাঙ্গেরি, জর্জিয়া বা মলদোভার মতো দেশে কর অনেক কম হলেও সম্পদশালীরা এখনও সুইজারল্যান্ডকেই বেশি ভরসা করেন।
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, শক্তিশালী আইনি কাঠামো, উন্নত ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা এবং গোপনীয়তা সুইস আকর্ষণের মূল ভিত্তি।
আন্তর্জাতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও পারিবারিক সম্পত্তি সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সুইজারল্যান্ড এখনও বিশ্বের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র।
করের হার নয়, আস্থাই আসল সম্পদ
দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের ধনীদের কাছে সুইজারল্যান্ড মানেই ছিল সম্পদ সংরক্ষণের এক নিরাপদ দুর্গ। বিলিয়নিয়ার উদ্যোক্তা, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী, পারিবারিক সম্পদ পরিচালনাকারী গোষ্ঠী—সবার কাছেই আল্পস পর্বতমালার এই দেশটি ছিল অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রতীক।
কিন্তু সাম্প্রতিক এক গবেষণা দেখাচ্ছে, সুইজারল্যান্ডের জনপ্রিয়তার কারণ আর শুধু কর-সুবিধা নয়।
আন্তর্জাতিক উচ্চ-সম্পদশালী গ্রাহকদের নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান Enness Global-এর বিশ্লেষণ বলছে, সুইজারল্যান্ডে ব্যক্তিগত আয়করের সর্বোচ্চ হার প্রায় ৩৯.৭ শতাংশ। ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশের তুলনায় এটি যথেষ্ট বেশি।
তবুও ধনী ব্যক্তি ও পরিবারগুলির মধ্যে সুইজারল্যান্ডে বসবাস, সম্পদ স্থানান্তর এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক কাঠামো গড়ে তোলার আগ্রহ কমেনি।
কম করের দেশ আছে, কিন্তু কম ঝুঁকির দেশ?
আজকের ইউরোপে এমন অনেক দেশ রয়েছে যেখানে করের হার সুইজারল্যান্ডের তুলনায় অনেক কম।
- Bulgaria – ১০%
- Romania – ১০%
- Hungary – ১৫%
- Moldova – তুলনামূলকভাবে কম
- Georgia – তুলনামূলকভাবে কম
অন্যদিকে ইউরোপের বড় অর্থনীতিগুলিতে করের হার আরও বেশি:
- United Kingdom – ৪৫%
- Germany – ৪৭.৫%
- France – ৫৫.৪%
- Spain – ৫৪%
- Portugal – ৫৩%
অর্থাৎ সুইজারল্যান্ড আর আগের মতো ‘করস্বর্গ’ নয়। তবুও বিশ্বের ধনীরা কেন সেখানে যেতে চান?
ধনীরা করের চেয়ে বেশি কিছু কেনেন
বিশ্লেষকদের মতে, একটি বহুজাতিক সম্পদশালী পরিবারের কাছে করের হার সিদ্ধান্তের মাত্র একটি অংশ।
তাদের কাছে আরও গুরুত্বপূর্ণ:
- রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা
- অর্থনৈতিক পূর্বানুমানযোগ্যতা
- সম্পদের আইনি সুরক্ষা
- শক্তিশালী ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা
- ব্যক্তিগত গোপনীয়তা
- আন্তর্জাতিক কর-চুক্তির সুবিধা
- দক্ষ আইনজীবী, কর-পরামর্শদাতা ও সম্পদ ব্যবস্থাপকদের উপস্থিতি
অর্থাৎ ধনীরা শুধু কম করের দেশ খোঁজেন না; তারা এমন একটি পরিবেশ চান যেখানে তাদের সম্পদ আগামী ২০ বা ৩০ বছর নিরাপদ থাকবে।
বিশ্বের ব্যক্তিগত ব্যাঙ্কিং রাজধানী
Switzerland এখনও বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ব্যক্তিগত ব্যাঙ্কিং কেন্দ্র।
দেশটিতে এমন একটি পূর্ণাঙ্গ আর্থিক অবকাঠামো গড়ে উঠেছে যেখানে রয়েছে:
- ব্যক্তিগত ব্যাঙ্ক
- সম্পদ ব্যবস্থাপনা সংস্থা
- পারিবারিক অফিস
- আন্তর্জাতিক কর বিশেষজ্ঞ
- উত্তরাধিকার পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞ
- বৈশ্বিক ঋণ ও বিনিয়োগ পরিষেবা
ফলে একজন উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী বা বিলিয়নিয়ার পরিবার এক জায়গাতেই তাদের সম্পদের প্রায় সমস্ত ব্যবস্থাপনা করতে পারে।
অনিশ্চিত পৃথিবীতে নিশ্চিততার মূল্য
বর্তমান বিশ্বে ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত, নিষেধাজ্ঞা, যুদ্ধ, দ্রুত বদলে যাওয়া করনীতি এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে ধনীরা এমন দেশ বেছে নিতে চাইছেন যেখানে:
- সরকার হঠাৎ নীতি পরিবর্তন করে না
- আদালত স্বাধীন
- সম্পত্তির অধিকার সুরক্ষিত
- আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিশ্বাসযোগ্য
সুইজারল্যান্ডের সবচেয়ে বড় সম্পদ এখানেই।
ধনী ব্যক্তিদের কাছে “নিশ্চয়তা” অনেক সময় কয়েক শতাংশ কর ছাড়ের থেকেও বেশি মূল্যবান।
সুইস আগ্রহ এখনও বাড়ছে
Enness Global-এর তথ্য অনুযায়ী, সুইজারল্যান্ডভিত্তিক উচ্চ-সম্পদশালী গ্রাহকদের মধ্যে আবাসন ও অর্থায়ন-সংক্রান্ত পরিষেবার প্রতি আগ্রহ বছরে ২১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
একইসঙ্গে সম্ভাব্য গ্রাহকদের গড় সম্পৃক্ততার সময়ও ১৫ শতাংশ বেড়েছে।
এটি ইঙ্গিত দেয় যে আন্তর্জাতিক সম্পদ পরিকল্পনা ও উত্তরাধিকার ব্যবস্থাপনায় সুইজারল্যান্ড এখনও একটি প্রধান গন্তব্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
নিরাপদ বন্দরের মর্যাদা অটুট
বিশ্বে এমন বহু দেশ রয়েছে যারা কম করের মাধ্যমে ধনীদের আকৃষ্ট করতে চায়। কিন্তু করের হার কম হলেই যে আন্তর্জাতিক পুঁজির আস্থা পাওয়া যায়, তা নয়।
সুইজারল্যান্ডের শক্তি তার শতাব্দীপ্রাচীন সুনাম, রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা, শক্তিশালী আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং আইনি স্থিতিশীলতায়।
তাই আজও বিশ্বের ধনী পরিবার, উদ্যোক্তা এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে সুইজারল্যান্ড কেবল একটি দেশ নয়—এটি বৈশ্বিক সম্পদের জন্য এক ধরনের “নিরাপদ আশ্রয়স্থল”।
আর সেই কারণেই, করের দৌড়ে অনেক দেশ এগিয়ে গেলেও, সম্পদ সংরক্ষণের দৌড়ে সুইজারল্যান্ড এখনও শীর্ষ সারিতেই রয়ে গেছে।