Table of Contents
বাংলাস্ফিয়ার: সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া অতিপৌরুষত্বের প্রচার তরুণ পুরুষদের ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করছে। কিন্তু নারীদের আকৃষ্ট করার নামে যে ‘আলফা মেল’ তত্ত্ব বিক্রি হচ্ছে, বাস্তবে তার বেশিরভাগই অকার্যকর, এমনকি ক্ষতিকরও – এমনটাই বলছে গবেষণা।
ধারণাটি এসেছে চিড়িয়াখানার নেকড়ে থেকে
‘আলফা মেল’ ধারণার শিকড় লুকিয়ে আছে ১৯৪৭ সালে সুইস প্রাণীবিজ্ঞানী রুডলফ শেঙ্কেলের করা নেকড়ে গবেষণায় — তবে সেই গবেষণা হয়েছিল চিড়িয়াখানায় বন্দি নেকড়েদের ওপর। ১৯৭০ সালে প্রাণীবিজ্ঞানী ডেভিড মেক এই ধারণাকে জনপ্রিয় করে তোলেন। তবে প্রায় ত্রিশ বছর পরে মেক নিজেই তাঁর সেই তত্ত্ব থেকে সরে আসেন। কারণ বাস্তবে নেকড়েদের সামাজিক কাঠামো অনেক বেশি জটিল, আর মানুষের সমাজ তো আরও বহু গুণ বেশি।
নব্বইয়ের দশকের শেষ থেকে ‘ম্যানোস্ফিয়ার’ আন্দোলন এই ধারণাকে নতুন জীবন দেয়। তারা ‘আলফা মেল’-কে পুরুষত্বের একটি ‘প্রাকৃতিক’ আদর্শ হিসেবে তুলে ধরে এবং দাবি করে আধুনিক সমাজ পুরুষদের দুর্বল করে দিয়েছে। অনুপ্রেরণা নেওয়া হয় প্রাগৈতিহাসিক যুগ, প্রাচীন রোম বা মধ্যযুগের কল্পিত চিত্র থেকে। ফলে তরুণদের সামনে নেকড়ে হয়ে ওঠে এক ধরনের ফ্যান্টাসি — এক বন্য শিকারি, যে গোটা দলের ওপর আধিপত্য বিস্তার করে।
কোটি টাকার ব্যবসা, কিন্তু ভিত্তি কতটুকু?
গুগলের তথ্য বলছে, ২০১০-এর দশক থেকে ‘আলফা মেল’ নিয়ে আগ্রহ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। কোভিড মহামারির পর এই প্রবণতা আরও তীব্র হয় এবং ২০২৩ সালে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায় — ঠিক যে সময়টিতে অ্যান্ড্রু টেটের মতো বিতর্কিত ইনফ্লুয়েন্সারদের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। আজও ইনস্টাগ্রাম ও টিকটকে ব্যক্তিগত উন্নয়ন, জিম, ডায়েট, মানসিক শক্তি — সবকিছু একত্র করে ‘আলফা’ হওয়ার কোর্স বিক্রি হচ্ছে, একটির দাম ৯৯৭ ডলার পর্যন্ত।
এই ইনফ্লুয়েন্সাররা টেস্টোস্টেরন, জীববিজ্ঞান ও স্নায়ুবিজ্ঞানের দোহাই দিয়ে দাবি করেন, নারীরা স্বভাবগতভাবেই পেশিবহুল, কর্তৃত্বপরায়ণ ও অতিপুরুষালি পুরুষদের প্রতি আকৃষ্ট। কিন্তু বিজ্ঞান বলছে ভিন্ন কথা।
অতিরিক্ত পুরুষালি চেহারা নারীদের কাছে আকর্ষণীয় নয়
২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি স্কটিশ গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি পাঁচজন পুরুষের মধ্যে তিনজন মনে করেন তারা যথেষ্ট পুরুষালি নন। কিন্তু গবেষণাটি বলছে, পুরুষেরা নারীদের পছন্দ সম্পর্কে প্রায়ই ভুল ধারণা পোষণ করেন। অতিরিক্ত চওড়া চোয়াল, অত্যন্ত নিচু ভ্রু বা উঁচু গালের হাড় নারীদের কাছে আকর্ষণ বাড়ায় না — বরং কমায়। এর কারণ সমাজের তথাকথিত ‘নারীকরণ’ নয়, মানুষ সাধারণত পরিচিত ধরনের মুখই বেশি পছন্দ করে।
রাগী মুখ নয়, হাসিই বেশি কার্যকর
‘আলফা মেল’ ইনফ্লুয়েন্সারদের মুখে প্রায়ই রাগ ও কঠোরতার ছাপ দেখা যায়। বাস্তবে নারীরা এই ভাবকে সম্ভাব্য আগ্রাসনের সংকেত হিসেবে দেখেন এবং দূরে থাকতে চান। গবেষণা বলছে, একজন পুরুষ যত বেশি পুরুষালি দেখতে হন, মুখে হাসি থাকলে নারীরা তাঁকে তত বেশি আকর্ষণীয় মনে করেন।
পেশি কিছুটা সাহায্য করে, তবে সীমাবদ্ধতা আছে
পেশির প্রশ্নে বিজ্ঞান আংশিকভাবে আলফা তত্ত্বের পক্ষে। শারীরিক শক্তি ও পেশিবহুল গঠন, বিশেষত শরীরের উপরের অংশ, নারীদের আকর্ষণের সঙ্গে ইতিবাচক সম্পর্ক রাখে। তবে স্বল্পমেয়াদি সম্পর্কে হয়তো বেশি পেশিবহুল পুরুষ পছন্দ হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কে মাঝারি মাত্রার গঠনই বেশি পছন্দের।
আধিপত্য নয়, দক্ষতা ও সহানুভূতিই মূল চাবিকাঠি
২০০৮ সালের একটি গবেষণায় দেখা যায়, নারীরা আধিপত্যের চেয়ে অর্জিত মর্যাদাকে বেশি গুরুত্ব দেন অর্থাৎ কোনো ক্ষেত্রে দক্ষতা, সাফল্য বা যোগ্যতাই বেশি আকর্ষণীয়। খেলাধুলার প্রতিযোগিতায় আধিপত্য কিছুটা আকর্ষণীয় হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কে সেই আধিপত্যই অনেক সময় বিরক্তিকর হয়ে ওঠে। বন্ধুত্বপূর্ণ, সহানুভূতিশীল ও সহযোগিতাপূর্ণ হওয়া অনেক বেশি কার্যকর।
নারীদের বুঝতে হলে নারীদের কথা শুনুন
তথাকথিত ‘হার্ডকোর পুরুষত্ব’-এর প্রচারকরা এমন আচরণ শেখান, যা আকর্ষণ তৈরির বদলে তা কমিয়ে দেয়। ক্ষতিকর স্টেরয়েড ব্যবহারের ফলে যৌন সক্ষমতা হ্রাস বা সাময়িক বন্ধ্যাত্বের মতো শারীরিক ক্ষতিও হতে পারে। নিয়মিত শরীরচর্চা স্বাস্থ্য ও আত্মবিশ্বাসের জন্য উপকারী — এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি অন্য জায়গায়: যারা নারীদের নিকৃষ্ট বা তুচ্ছ মনে করেন, তারাই আবার নারীদের আকৃষ্ট করার জন্য সবচেয়ে বেশি ব্যস্ত কেন?
লক্ষণীয়, এই তথাকথিত আলফা ভিডিওগুলোর একটিতেও নারীদের প্রকৃত পছন্দ বা মতামত নিয়ে কোনো আলোচনা নেই — সব সময় পুরুষরাই নারীদের হয়ে কথা বলছেন।
নারীরা কী চান তা জানতে হলে সত্যিকারের আগ্রহ নিয়ে নারীদের কথা শুনতে হবে। সেখান থেকেই শুরু হোক আসল বোঝাপড়া।