বাংলাস্ফিয়ার: ফোনে মেসেজ দেখা, খাওয়ানোর সময় ইমেল পড়া, খেলতে খেলতে হঠাৎ নোটিফিকেশনের দিকে তাকানো কিংবা ঘুমপাড়ানি গল্পের মাঝখানে উত্তর লেখা—এগুলো আজকের জীবনের স্বাভাবিক দৃশ্য। কিন্তু এই ছোট ছোট বিঘ্ন কি শিশুদের মানসিক বিকাশে বড় প্রভাব ফেলছে? ফরাসি গবেষকেরা বলছেন, উত্তরটি উদ্বেগজনক।

নতুন শব্দ: ‘টেকনোফেরেন্স’

প্রযুক্তি (Technology) এবং হস্তক্ষেপ (Interference) শব্দ দুটির মিশ্রণে তৈরি হয়েছে একটি নতুন ধারণা—“টেকনোফেরেন্স” (Technoference)

এর অর্থ, স্মার্টফোন, ট্যাবলেট বা অন্যান্য ডিজিটাল যন্ত্রের কারণে বাবা-মা ও সন্তানের স্বাভাবিক যোগাযোগে যে বাধা সৃষ্টি হয়।

এই বিষয়টি নিয়ে প্রথম গবেষণা শুরু হয় আমেরিকায় ২০১০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে। পরিবার-মনোবিজ্ঞান গবেষক ব্র্যান্ডন ম্যাকড্যানিয়েল এবং শিশু বিশেষজ্ঞ জেনি রাডেস্কি দেখানোর চেষ্টা করেন, ডিজিটাল ডিভাইসের কারণে বাবা-মায়ের মনোযোগ বিচ্ছিন্ন হলে ছোট শিশুদের ওপর তার কী প্রভাব পড়ে।

এখন এই গবেষণা ফ্রান্সেও বিস্তৃত হয়েছে। গবেষণা চলছে ইউনিভার্সিটি প্যারিস নঁতের, ইউনিভার্সিটি অব লিলএবং এক্স-মার্সেই ইউনিভার্সিটি-এর বিভিন্ন গবেষণা দলে।

কোভিডের পর থেকেই বাড়তে থাকে উদ্বেগ

শিশু বিকাশ-মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক মায়া গ্রাতিয়ে বলেন, কোভিড-পরবর্তী সময়ে শিশু চিকিৎসক, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ এবং মনোবিজ্ঞানীরা ক্রমশ একই ধরনের অভিযোগ শুনতে শুরু করেন।

তাঁদের পর্যবেক্ষণ ছিল—অনেক বাবা-মা যেন সারাক্ষণ মোবাইল ফোনে ডুবে থাকছেন। ফলে তারা সন্তানের সঙ্গে উপস্থিত থেকেও প্রকৃত অর্থে উপস্থিত নন।

গ্রাতিয়ে এবং তাঁর সহকর্মী রানা ইসেইলি এই বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা শুরু করেন।

৯১টি পরিবারকে পর্যবেক্ষণ

গবেষকেরা ৯১ জন বাবা-মা ও তাঁদের শিশুদের আচরণ পর্যবেক্ষণ করেন। শিশুদের গড় বয়স ছিল প্রায় ১১ মাস।

তাদের দুটি অপেক্ষাকক্ষে পর্যবেক্ষণ করা হয়—একটির সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট অন্যটির থেকে ভিন্ন ছিল। কিন্তু একটি বিষয়ে দুই জায়গার চিত্র ছিল প্রায় একই।

যত বেশি সময় বাবা-মা স্মার্টফোনে ব্যয় করছিলেন, তত কম সময় তারা শিশুর সঙ্গে যোগাযোগ করছিলেন।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, শিশুরা যখন বাবা-মায়ের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছিল, তখন সেই প্রচেষ্টার উত্তর অনেক ক্ষেত্রেই তারা পাচ্ছিল না।

‘প্যারেন্টাল সেনসিটিভিটি’ বা সংবেদনশীলতা কমে যাচ্ছে

গবেষণার সবচেয়ে উদ্বেগজনক ফল ছিল একটি বিষয়—বাবা-মায়ের সংবেদনশীলতা কমে যাচ্ছে।

অর্থাৎ শিশু কী চাইছে, কী দেখাতে চাইছে, কী নিয়ে আগ্রহী, কী নিয়ে অস্বস্তিতে আছে, এসব সূক্ষ্ম সংকেত বোঝার ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

মায়া গ্রাতিয়ের কথায়, “শিশুরা শুধু অন্যদের দেখে শেখে না, তারা অন্যদের দ্বারা পর্যবেক্ষিত হয়েও শেখে।”

একটি শিশু যখন কোনও জিনিসের দিকে আঙুল দেখায়, তখন বাবা-মা যদি তাকিয়ে বলেন, “ওটা একটা পাখি” বা “ওটা একটা বল”, তখনই ভাষা শেখা শুরু হয়।

শিশু পৃথিবীকে বোঝে সেই যৌথ মনোযোগের মাধ্যমে।

কিন্তু যদি সেই মুহূর্তে বাবা বা মা ফোনের পর্দায় ব্যস্ত থাকেন, তাহলে শেখার সেই সুযোগটি হারিয়ে যায়।

বিখ্যাত ‘স্টিল-ফেস এক্সপেরিমেন্ট’

এই প্রসঙ্গে গবেষকেরা প্রায়ই একটি বিখ্যাত মনোবৈজ্ঞানিক পরীক্ষার কথা উল্লেখ করেন।

১৯৭০-এর দশকে মার্কিন গবেষক এডওয়ার্ড ট্রনিক একটি পরীক্ষা পরিচালনা করেন, যার নাম স্টিল ফেস এক্সপেরিমেন্ট।

পরীক্ষাটি ছিল খুবই সহজ।

প্রথমে একজন মা তাঁর এক বছরের শিশুর সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথা বলেন, হাসেন, খেলেন।

তারপর তাঁকে বলা হয় হঠাৎ মুখের সব অভিব্যক্তি বন্ধ করে দিতে—কোনও হাসি নয়, কোনও প্রতিক্রিয়া নয়, কোনও সাড়া নয়।

দুই মিনিট ধরে তিনি একেবারে নিরাবেগ মুখে শিশুর দিকে তাকিয়ে থাকেন।

শিশুর প্রতিক্রিয়া কী ছিল?

প্রথমে শিশু আবার মায়ের মনোযোগ আকর্ষণ করার চেষ্টা করে।

সে হাসে।

হাত নাড়ে।

শব্দ করে।

কিন্তু কোনও সাড়া না পেয়ে ধীরে ধীরে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে।

এরপর দেখা যায়—

  • উদ্বেগ বাড়ছে,
  • অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে,
  • কান্না শুরু হচ্ছে,
  • নিরাপত্তাবোধ নষ্ট হচ্ছে।

ক্লিনিক্যাল মনোবিজ্ঞানী সাবিন দুফ্লোর বলেন, “মানুষের সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনও অন-অফ সুইচ নেই।”

অর্থাৎ, শিশুর কাছে বাবা-মায়ের উপস্থিতি কেবল শারীরিক উপস্থিতি নয়; মানসিক উপস্থিতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

যদি এই ঘটনা দিনে বহুবার ঘটে?

স্টিল-ফেস পরীক্ষায় এই নিরাবেগ অবস্থা মাত্র দুই মিনিট স্থায়ী হয়।

কিন্তু বাস্তব জীবনে?

ধরা যাক—

  • খাওয়ানোর সময় ফোন,
  • খেলাধুলার সময় ফোন,
  • হাঁটতে বেরিয়ে ফোন,
  • ঘুম পাড়ানোর সময় ফোন।

তাহলে শিশুর দৃষ্টিকোণ থেকে সে বারবার একই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হচ্ছে—“আমি ডাকছি, কিন্তু কেউ সাড়া দিচ্ছে না।”

মনোবিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, এই ধরনের অভিজ্ঞতা দীর্ঘমেয়াদে শিশুর আবেগ নিয়ন্ত্রণ, সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং ভাষা বিকাশের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

বাবা-মায়ের অপরাধবোধ নয়, সচেতনতা দরকার

গবেষকেরা জোর দিয়ে বলছেন, উদ্দেশ্য বাবা-মায়েদের দোষারোপ করা নয়।

কারণ আধুনিক জীবনে ডিজিটাল ডিভাইস প্রায় অপরিহার্য।

সমস্যা ফোনের অস্তিত্ব নয়।

সমস্যা তখনই, যখন ফোন শিশুর সঙ্গে সম্পর্কের মাঝখানে নিয়মিত বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

সাবিন দুফ্লোর মতে, বাবা-মায়েরা যদি বুঝতে পারেন যে সন্তানের সঙ্গে প্রতিটি ছোট যোগাযোগও শেখার একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত, তাহলে তারা নিজেরাই ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করবেন।

শেষ কথা

একটি শিশু জন্মের পর প্রথম কয়েক বছর পৃথিবীকে চেনে বাবা-মায়ের চোখ দিয়ে। সে শিখে মুখের অভিব্যক্তি পড়তে, শব্দের অর্থ বুঝতে, ভালোবাসা চিনতে এবং নিরাপত্তা অনুভব করতে।

কিন্তু যদি সেই চোখ বারবার মোবাইলের পর্দায় আটকে থাকে, তাহলে শিশুর কাছে পৃথিবীও খানিকটা অস্পষ্ট হয়ে যায়।

প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে সহজ করেছে, এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু ফরাসি গবেষকেরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, শিশুর বেড়ে ওঠার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি এখনও স্মার্টফোন নয় বরং একজন মনোযোগী মানুষ।