Table of Contents
বাংলাস্ফিয়ারঃ ভারতের বিরোধী রাজনীতির সবচেয়ে বড় সংকট আজ মতাদর্শের নয়, নেতৃত্বেরও নয়, বিশ্বাসের। দিল্লিতে একসঙ্গে ছবি তোলা যত সহজ, রাজ্যে রাজ্যে একে অপরের পাশে দাঁড়ানো ততটাই কঠিন।
গত কয়েক বছরে বিরোধী শিবিরের প্রতিটি বড় বৈঠকে “গণতন্ত্র বাঁচানো”, “সংবিধান রক্ষা”, “ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ঐক্য”—এই শব্দগুলি বারবার শোনা গেছে। কিন্তু ভোটের ময়দানে গিয়ে সেই ভাষণ প্রায়শই বদলে যায় কড়া প্রতিদ্বন্দ্বিতায়, সন্দেহে, এমনকি পরস্পরের বিরুদ্ধে বিষোদ্গারে।
এই দ্বন্দ্বটাই এখন বিজেপি-বিরোধী রাজনীতির মূল চরিত্র।
বাংলার বিপর্যয় যে সত্য উন্মোচন করল
বাংলায় তৃণমূল কংগ্রেসের সাম্প্রতিক বিপর্যয় এই সংকটকে আরও নগ্ন করে দিয়েছে। বহু বছর ধরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল জাতীয় স্তরে নিজেকে বিজেপি-বিরোধী রাজনীতির প্রধান মুখ হিসেবে তুলে ধরতে চাইছিল। কিন্তু বাস্তবে তৃণমূল কখনও চায়নি বাংলায় কংগ্রেস বা বামপন্থীরা শক্তিশালী হোক।
দিল্লিতে জোটের হাসিমুখ থাকলেও বাংলার মাটিতে ছিল নির্মম রাজনৈতিক সংঘর্ষ। কংগ্রেসও তৃণমূলকে কখনও পুরোপুরি বিশ্বাস করেনি। তারা জানত, মমতার রাজনীতি মূলত নিজের আধিপত্য রক্ষার রাজনীতি। ফলে জোটের ভিত শুরু থেকেই ছিল কাচের মতো ভঙ্গুর।
এখন তৃণমূল দুর্বল। ক্ষমতার দাপট কমতেই স্পষ্ট হয়েছে, আঞ্চলিক দলগুলির জাতীয় উচ্চাকাঙ্ক্ষা যত বড়ই হোক, তাদের সাংগঠনিক ভিত্তি প্রায় পুরোপুরি রাজ্যনির্ভর। রাজ্যে ধাক্কা খেলেই দিল্লির রাজনীতি কেঁপে ওঠে।
রাজ্যে রাজ্যে একই সমীকরণ
তামিলনাড়ুতেও একই ছবি। ডিএমকে এবং কংগ্রেসের সম্পর্ক বহুদিন ধরেই ছিল প্রয়োজনের বিয়ে। বিজেপিকে ঠেকাতে দুই দল একসঙ্গে থেকেছে ঠিকই, কিন্তু সেই সম্পর্কে কখনও গভীর আস্থা ছিল না। ডিএমকে জানে, কংগ্রেস যদি তামিলনাড়ুতে পুনরুজ্জীবিত হয়, তবে একদিন সে নিজেই প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারে। অন্যদিকে কংগ্রেসের আক্ষেপ—তারা জাতীয় দল হয়েও বহু রাজ্যে কেবল আঞ্চলিক দলের অনুগামী হয়ে আছে।
এই সমস্যাটা শুধু বাংলা বা তামিলনাড়ুর নয়। প্রায় প্রতিটি রাজ্যেই একই সমীকরণ।
উত্তরপ্রদেশে সমাজবাদী পার্টি চায় কংগ্রেস তাদের সঙ্গে থাকুক, কিন্তু কখনও এত শক্তিশালী না হোক যে মুসলিম ও দলিত ভোটে ভাগ বসাতে পারে। বিহারে আরজেডি-র মনোভাবও প্রায় একই। মহারাষ্ট্রে উদ্ধব ঠাকরের শিবসেনা এবং শরদ পাওয়ারের শিবির কংগ্রেসকে প্রয়োজনীয় মনে করে, কিন্তু প্রভাবশালী নয়। পাঞ্জাবে আপ এবং কংগ্রেস একে অপরকে প্রায় শত্রু হিসেবেই দেখে। কেরলে কংগ্রেস ও বামপন্থীরা সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বী।
দিল্লিতে জোট, রাজ্যে যুদ্ধ—এই অদ্ভুত দ্বৈততা এখন বিরোধী রাজনীতির স্থায়ী বাস্তবতা।
এখানেই বিজেপির সুবিধা
বিজেপি একটি কেন্দ্রাভিমুখী দল। তাদের নেতৃত্ব কাঠামো স্পষ্ট, সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্র একটিই, এবং রাজনৈতিক বার্তাও প্রায় সর্বত্র একরকম। নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহ দীর্ঘদিন ধরে বুঝেছেন যে আঞ্চলিক দলগুলির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হল পারস্পরিক অবিশ্বাস। তাই বিজেপি অনেক সময় বিরোধীদের বিরুদ্ধে যত না লড়ে, তার চেয়েও বেশি অপেক্ষা করে তারা কখন নিজেদের মধ্যেই ভেঙে পড়বে।
নেতৃত্বের প্রশ্নে ঘোর অনিশ্চয়তা
বিরোধী জোটের আরেকটি বড় সমস্যা নেতৃত্বের প্রশ্ন। মোদীর বিকল্প কে? এই প্রশ্নের উত্তর আজও স্পষ্ট নয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একসময় নিজেকে সেই জায়গায় তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। নীতীশ কুমারও চেষ্টা করেছিলেন। রাহুল গান্ধি নিজের ভাবমূর্তি বদলাতে চেয়েছেন। কিন্তু কোনও নামই সর্বসম্মত নয়।
আঞ্চলিক দলগুলির অনেকেই কংগ্রেসকে প্রয়োজনীয় মনে করে, কারণ কংগ্রেস ছাড়া সর্বভারতীয় পরিসরে বিজেপির মোকাবিলা করা কঠিন। কিন্তু একই সঙ্গে তারা কংগ্রেসকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যেও রাখতে চায়। অর্থাৎ তারা চায় কংগ্রেস ভোট আনুক, কিন্তু আধিপত্য না করুক। জাতীয় স্তরে মুখ হোক, কিন্তু রাজ্যে রাজ্যে মাথা না তুলুক।
এই মনোভাবই জোট রাজনীতির সবচেয়ে বড় অন্তর্ঘাত।
কারণ কংগ্রেসেরও একটি স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রবৃত্তি আছে। তারা একসময় সারা দেশের শাসক দল ছিল। তাদের পক্ষে চিরকাল অন্যের ছায়াসঙ্গী হয়ে থাকা সহজ নয়। ফলে যেখানে তারা একটু ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা দেখে, সেখানেই আঞ্চলিক দলগুলির সঙ্গে সংঘাত শুরু হয়।
বস্তুত, বিরোধী জোটের বর্তমান কাঠামো অনেকটা ভাড়াটে জোটের মতো। সবাই এক ছাদের নিচে আছে ঠিকই, কিন্তু প্রত্যেকের আলাদা হিসাব, আলাদা ভয়, আলাদা উচ্চাকাঙ্ক্ষা। বিজেপিকে হারানোর ইচ্ছা আছে, কিন্তু পরস্পরকে বড় হতে দেওয়ার মানসিকতা নেই।
তবু কি ঐক্যের পথ নেই?
আছে, কিন্তু তা মূলত পরিস্থিতিনির্ভর।
ভারতের রাজনীতিতে প্রায়ই দেখা গেছে, কোনও এক প্রবল কেন্দ্রীয় শক্তির বিরুদ্ধে বিরোধীরা শেষ পর্যন্ত একজোট হতে বাধ্য হয়েছে। ১৯৭৭ সালে জরুরি অবস্থার পরে যেমন হয়েছিল, ১৯৮৯ সালে রাজীব গান্ধির বিরুদ্ধে যেমন হয়েছিল। কিন্তু সেই ঐক্য সাধারণত দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। কারণ ক্ষমতায় আসার পরে অভ্যন্তরীণ বিরোধই জোটকে দুর্বল করেছে।
আজও বিরোধীরা যদি সত্যিই ঐক্যবদ্ধ হতে চায়, তবে তাদের তিনটি কঠিন সত্য মেনে নিতে হবে।
প্রথমত, প্রতিটি রাজ্যে একই সমীকরণ হবে না। কোথাও কংগ্রেস বড় দল, কোথাও আঞ্চলিক দল। সেই বাস্তবতা মেনে নমনীয় সমঝোতা দরকার।
দ্বিতীয়ত, ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা কমাতে হবে। প্রধানমন্ত্রী কে হবেন, তা ভোটের আগে নয়, পরে ঠিক করার রাজনৈতিক পরিপক্বতা দরকার।
তৃতীয়ত, শুধু বিজেপি-বিরোধিতা যথেষ্ট নয়। মানুষ জানতে চায় বিকল্প কী। অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, প্রশাসন, দুর্নীতি, কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক—এসব নিয়ে স্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য রূপরেখা না থাকলে শুধু “মোদী-বিরোধিতা” দিয়ে দীর্ঘ লড়াই সম্ভব নয়।
এক মৌলিক প্রশ্নের সামনে বিরোধী শিবির
এই মুহূর্তে তাই বিজেপি-বিরোধী ঐক্যের সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না, কিন্তু তাকে দৃঢ় বলাও কঠিন। বাস্তবতা হল, বিরোধী শিবির এখনও একে অপরকে যতটা ভয় পায়, বিজেপিকে হয়তো তার চেয়েও কম ভয় পায়। আর সেই কারণেই দিল্লির মঞ্চে হাত ধরাধরি করলেও রাজ্যের মাটিতে তারা প্রায়শই পরস্পরের বিরুদ্ধে তলোয়ার তোলে।
ভারতের বিরোধী রাজনীতির সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই আজও একই রয়ে গেছে—তারা কি সত্যিই একসঙ্গে ক্ষমতা চায়, নাকি শুধু একসঙ্গে ছবি তুলতে চায়?