Table of Contents
বাংলাস্ফিয়ার: দেউচা-পাঁচামি প্রকল্পে “জমির বদলে চাকরি” নীতি প্রথম শুনতে মানবিক এবং রাজনৈতিকভাবে আকর্ষণীয় বলে মনে হতে পারে। বৃহৎ শিল্প বা খনি প্রকল্পে বহু মানুষ উচ্ছেদ হন, তাঁদের জীবিকা নষ্ট হয়। ফলে ক্ষতিপূরণ হিসেবে শুধু টাকা নয়, পরিবারের একজনকে চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দীর্ঘদিন ধরেই ভারতে রাজনৈতিকভাবে জনপ্রিয় একটি পদ্ধতি। কিন্তু ঠিক এখানেই কেলেঙ্কারির সম্ভাবনাও তৈরি হয়। কারণ “চাকরি” রাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক মুদ্রাগুলির একটি। আর সেই চাকরি যদি স্বচ্ছ নিয়ম, প্রতিযোগিতা ও আইনি কাঠামোর বাইরে বণ্টিত হয়, তবে তা দ্রুত রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, দুর্নীতি এবং পক্ষপাতের অভিযোগে জড়িয়ে পড়ে।
দেউচা-পাঁচামির ক্ষেত্রে বিজেপি এখন যে “land-for-job scam” বা “জমির বদলে চাকরি কেলেঙ্কারি”-র গন্ধ পাচ্ছে বলে দাবি করছে, তার কেন্দ্রে রয়েছে মূলত তিনটি প্রশ্ন।
কারা সত্যিকারের ক্ষতিগ্রস্ত?
বীরভূমের ওই অঞ্চলে জমির মালিকানা বহু ক্ষেত্রে জটিল। বহু জমি আদিবাসী সম্প্রদায়ের, কোথাও যৌথ মালিকানা, কোথাও আবার বহু বছর ধরে অনানুষ্ঠানিক দখল। এই পরিস্থিতিতে যদি সরকার বা স্থানীয় প্রশাসন রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে “বেনিফিশিয়ারি তালিকা” তৈরি করে, তবে অভিযোগ উঠতে পারে যে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের বাদ দিয়ে দলঘনিষ্ঠ ব্যক্তি বা মধ্যস্বত্বভোগীরা সুবিধা পেয়েছেন।
চাকরি কি প্রকল্পভিত্তিক, না রাজনৈতিক পুরস্কার?
এখানেই সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন। যদি দেখা যায় চাকরিগুলি নিয়মিত সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়া এড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, অথবা যোগ্যতার তুলনায় রাজনৈতিক আনুগত্য বেশি গুরুত্ব পেয়েছে, তবে বিরোধীরা এটিকে “চাকরি বেচাকেনা” বা “পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক রাষ্ট্রনীতি” বলে আক্রমণ করবে। পশ্চিমবঙ্গে শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি নিয়ে যে বিশাল রাজনৈতিক অভিঘাত তৈরি হয়েছিল, তার পরিপ্রেক্ষিতে “চাকরি” শব্দটাই এখন অত্যন্ত স্পর্শকাতর।
প্রতিশ্রুত চাকরি আদৌ বাস্তব কি না?
ভারতের বহু শিল্প প্রকল্পে দেখা গেছে, জমি নেওয়ার সময় হাজার হাজার চাকরির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও পরে প্রকল্প আংশিক বাস্তবায়িত হয়েছে, অথবা প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনের কারণে স্থানীয় মানুষের জন্য প্রকৃত কর্মসংস্থান খুব কম তৈরি হয়েছে। তখন অভিযোগ ওঠে — জমি চলে গেল, কিন্তু চাকরি এল না। দেউচা-পাঁচামির ক্ষেত্রেও সেই আশঙ্কা রয়েছে। কারণ এটি অত্যন্ত বৃহৎ কয়লা ও শিল্প প্রকল্প, যেখানে বাস্তব কর্মসংস্থানের সংখ্যা নিয়ে বহু প্রশ্ন আছে।
উন্নয়নের প্রতীক এখন দুর্নীতির অভিযোগে
দেউচা-পাঁচামি শুধু একটি শিল্প প্রকল্প নয়। এটি বহু বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গের শিল্পায়ন বিতর্কের প্রতীক। দীর্ঘকাল ধরে বিরোধীরা অভিযোগ করেছে, রাজ্যে শিল্প আসে না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার দেউচা-পাঁচামিকে সেই সমালোচনার জবাব হিসেবে তুলে ধরেছিল — “দেখুন, বড় শিল্প আসছে, কর্মসংস্থান তৈরি হবে।” অর্থাৎ প্রকল্পটি ছিল উন্নয়ন-রাজনীতির প্রদর্শনী।
কিন্তু বিজেপি এখন সেই একই প্রকল্পকে উল্টে “দুর্নীতি-রাজনীতি”-র প্রতীক বানাতে চাইছে। তাদের রাজনৈতিক কৌশল খুব স্পষ্ট — “শিল্পের নামে আবারও চাকরি বণ্টনের কারবার হয়েছে।” অর্থাৎ শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতির পর মানুষের মনে যে অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে, সেটিকে দেউচা-পাঁচামির সঙ্গে জুড়ে দেওয়াই এখন বিজেপির মূল কৌশল।
‘বেনিফিশিয়ারি তালিকা’ — রাজনৈতিক অস্ত্র না স্বচ্ছতার দাবি?
আরও গুরুত্বপূর্ণ হল, বিজেপি “beneficiary list” বা সুবিধাভোগীদের তালিকা চাইছে। এটি নিছক প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়, এটি রাজনৈতিক অস্ত্র। কারণ তালিকা প্রকাশিত হলে কয়েকটি বিষয় সামনে আসতে পারে –
- সুবিধাভোগীদের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিচয়
- একই পরিবারে একাধিক চাকরি হয়েছে কি না
- প্রকৃত জমিদাতারা বাদ পড়েছেন কি না
- স্থানীয় তৃণমূল নেতৃত্বের আত্মীয়স্বজন সুবিধা পেয়েছেন কি না
- চাকরির ধরন স্থায়ী না অস্থায়ী
এই সব তথ্য সামনে এলে বিরোধীরা “উন্নয়ন” কথাটিকে “দলীয় বণ্টনব্যবস্থা”-য় পরিণত করার চেষ্টা করবে।
অন্যদিকে সরকারের পক্ষেও বিষয়টি সম্পূর্ণ অস্বস্তিকর নয়। কারণ তারা পাল্টা যুক্তি দিতে পারে — শিল্পায়নের জন্য মানুষের জমি নেওয়া হলে পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থান দেওয়া নৈতিক দায়িত্ব। শুধু নগদ ক্ষতিপূরণ দিলে দীর্ঘমেয়াদে মানুষ নিঃস্ব হয়ে পড়ে। ফলে চাকরির প্রতিশ্রুতি সামাজিক ন্যায়বিচারের অংশ।
উন্নয়ন না দুর্নীতি — বাংলার সামনে বড় প্রশ্ন
সত্যি বলতে, ভারতের উন্নয়ন রাজনীতির এটাই সবচেয়ে বড় দ্বন্দ্ব। একদিকে শিল্পায়নের জন্য জমি প্রয়োজন, অন্যদিকে জমি হারানো মানুষের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হয়। “জমির বদলে চাকরি” নীতি সেই দ্বন্দ্ব মেটানোর চেষ্টা। কিন্তু রাষ্ট্র যদি স্বচ্ছতা, আইনি কাঠামো এবং নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে না পারে, তবে মানবিক পুনর্বাসনও খুব সহজে রাজনৈতিক কেলেঙ্কারির অভিযোগে পরিণত হয়।
দেউচা-পাঁচামির লড়াই তাই শুধু কয়লা প্রকল্পের লড়াই নয়। এটি পশ্চিমবঙ্গের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন মডেল, শিল্পায়নের রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা এবং “চাকরি” শব্দটির ওপর মানুষের আস্থার লড়াইও।