ঘটনাগুলো আলাদা আলাদা করে দেখলে হয়তো স্রেফ রাজনৈতিক চাপানউতোর বলে মনে হতে পারত। কিন্তু সবকটি ঘটনাকে এক সুতোয় গাঁথলে ছবিটা অন্যরকম। আরামবাগ থানায় তাঁর বিরুদ্ধে জামিন অযোগ্য ধারায় এফআইআর। নিজের রাজনৈতিক দুর্গ ডায়মন্ডহারবারে একের পর এক স্থানীয় নেতার বিদ্রোহ। গিয়াসউদ্দিন মোল্লার মতো পুরনো সংগঠক প্রকাশ্যে ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন। আর সবশেষে সবচেয়ে প্রতীকী ঘটনাটি—ফলতা উপনির্বাচনে তিনি কার্যত অনুপস্থিত। যে মানুষটি এতদিন দলের “ফিল্ড মার্শাল” বলে পরিচিত ছিলেন, তিনিই মাঠে নামার ঝুঁকি নিতে পারলেন না।
রাজনীতিতে কখনও কখনও অনুপস্থিতিই সবচেয়ে জোরালো উপস্থিতি হয়ে ওঠে।
একসময় তৃণমূলের অন্দরমহলে একটা কথা খুব চালু ছিল—“দিদি আবেগ, অভিষেক ব্যবস্থাপনা।” মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন জনতার সঙ্গে আবেগের সংযোগ। আর অভিষেক ছিলেন সেই আবেগকে নির্বাচনী যন্ত্রে রূপান্তরিত করার কারিগর। বুথ, ডেটা, সামাজিক মাধ্যম, সংগঠন, অর্থসংগ্রহ, জেলা নেতৃত্ব—সবকিছুর ওপর তাঁর নিয়ন্ত্রণ ছিল প্রায় সামরিক শৃঙ্খলার মতো। দলের বহু পুরনো নেতা তখন ঠাট্টা করে বলতেন, “তৃণমূল এখন আর দল নয়, স্টার্ট-আপ কোম্পানি।”
সমস্যা হল, রাজনৈতিক দল আর তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থা এক জিনিস নয়। কর্পোরেট দুনিয়ায় ভয় দেখিয়ে কর্মী নিয়ন্ত্রণ করা যায়। কিন্তু রাজনীতিতে ভয় কখনও চিরস্থায়ী আনুগত্য তৈরি করতে পারে না। বরং সুযোগ পেলেই জমে থাকা ক্ষোভ বিস্ফোরিত হয়। আজ ডায়মন্ডহারবারে যা দেখা যাচ্ছে, সেটাই সেই বিস্ফোরণের রাজনৈতিক ভূমিকম্প।
অভিষেকের উত্থান এত দ্রুত হয়েছিল যে অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন, তাঁর পতনও অসম্ভব। দলের ভেতরে তাঁর বিরোধিতা ছিল, কিন্তু প্রকাশ্যে কেউ মুখ খুলতেন না। কারণ তৃণমূলের অন্দরমহলে একটা ধারণা পাকাপাকি হয়েছিল—দলের ভবিষ্যৎ মানেই অভিষেক। ফলে বিরোধিতা মানে রাজনৈতিক আত্মহত্যা।
কিন্তু রাজনীতির সবচেয়ে নির্মম সত্য হল, ক্ষমতা থাকলে অনুগত লোকের অভাব হয় না, আর ক্ষমতা টলতে শুরু করলেই সেই অনুগতরাই সবচেয়ে আগে নিরাপদ দূরত্বে সরে যায়।
আজ সেটাই হচ্ছে।
ডায়মন্ডহারবার একসময় ছিল অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত সাম্রাজ্য। সেখানে তাঁর ছবি ছাড়া পোস্টার কল্পনা করা যেত না। স্থানীয় নেতারা তাঁর নাম উচ্চারণ করতেন প্রায় ভক্তিভরে। অথচ এখন সেই এলাকাতেই ছোট ছোট বিদ্রোহ মাথা তুলছে। কেউ প্রকাশ্যে অভিযোগ করছেন। কেউ সাংগঠনিক বৈঠক বয়কট করছেন। কেউ আবার গোপনে বিজেপির সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন বলে গুঞ্জন।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হল, এই বিদ্রোহগুলো আর নিছক বিরোধী দলের চক্রান্ত বলে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। কারণ অভিযোগকারীদের অনেকেই দীর্ঘদিনের তৃণমূল কর্মী। অর্থাৎ ফাটলটা বাইরে নয়, ভিতরে।
আর রাজনীতিতে ভিতরের ফাটলই সবচেয়ে ভয়ংকর।
গিয়াসউদ্দিন মোল্লার অভিযোগ সেই কারণেই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি শুধু একজন ব্যক্তি নন। তিনি সেই শ্রেণির প্রতিনিধি, যারা একসময় অভিষেককে দলের ভবিষ্যৎ বলে মেনে নিয়েছিলেন, কিন্তু এখন মনে করছেন তাঁদের ব্যবহার করে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হয়েছে। বাংলার জেলা রাজনীতিতে এই “ব্যবহৃত হওয়ার ক্ষোভ” অত্যন্ত শক্তিশালী আবেগ। বহু রাজনৈতিক উলটপুরাণের জন্ম এই অপমানবোধ থেকেই।
তৃণমূলের পুরনো নেতারা এখন চাপা গলায় একটা কথা বলছেন—অভিষেক খুব দ্রুত খুব বেশি ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করেছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন, সংগঠন মানেই নিয়ন্ত্রণ। কিন্তু সংগঠন আসলে সম্পর্কের জাল। সেখানে ভয়, অপমান আর একতরফা নির্দেশ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি আনুগত্য তৈরি করা যায় না।
অবশ্য অভিষেকের সমস্যাটা শুধু সাংগঠনিক নয়। তাঁর জন-ভাবমূর্তিও ক্রমশ জটিল হয়ে উঠছে।
কয়েক বছর আগে তিনি নিজেকে “নতুন প্রজন্মের স্বচ্ছ মুখ” হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। তাঁর ভাষণ, পোশাক, প্রচারের ধরন—সবকিছুতেই একটা আধুনিকতার ছাপ ছিল। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাস্তার লড়াইয়ের রাজনীতির পাশাপাশি শহুরে মধ্যবিত্তের কাছেও একটা গ্রহণযোগ্য মুখ প্রয়োজন। সেই জায়গাটা তিনি নিতে চেয়েছিলেন।
কিন্তু রাজনীতিতে ভাবমূর্তি কাচের মতো। একবার চিড় ধরলে সেটাকে আগের মতো চকচকে রাখা কঠিন।
আজ তাঁর বিরুদ্ধে যে সব অভিযোগ উঠছে—ক্ষমতার অপব্যবহার, সাংগঠনিক একনায়কতন্ত্র, গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব উসকে দেওয়া—এসব মিলিয়ে তাঁর “সংস্কারক” ভাবমূর্তির জায়গায় তৈরি হয়েছে “ক্ষমতাকেন্দ্রিক নিয়ন্ত্রক”-এর ছবি।
আরামবাগের এফআইআর সেই কারণেই শুধু আইনি ঘটনা নয়। এটা রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত হয়েছে। বিরোধীরা এখন এটাকে ব্যবহার করছে এই বার্তা দিতে যে একসময় যিনি প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণ করতেন, তিনিই এখন প্রশাসনিক চাপে।
রাজনীতিতে প্রতীকের গুরুত্ব অনেক। কখনও কখনও মামলার ফলাফলের থেকেও বেশি।
ফলতা উপনির্বাচনে তাঁর অনুপস্থিতি নিয়ে এখন কলকাতার রাজনৈতিক আড্ডায় নানা রসিকতা চলছে। কেউ বলছেন, “আগে অভিষেক যেখানে যেতেন, সেখানে বিরোধীরা ভয় পেত। এখন উনি ভয় পাচ্ছেন, কোথাও গেলে নিজের লোকেরাই কী বলবে।” কেউ আবার বলছেন, “ডায়মন্ডহারবারের রাজপুত্র এখন নিজের দুর্গেই নিরাপত্তা খুঁজছেন।”
বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ব্যঙ্গ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র। মানুষ যখন কাউকে নিয়ে ঠাট্টা শুরু করে, তখন বুঝতে হবে তাঁর অজেয় ভাবমূর্তিতে ফাটল ধরেছে।
সবচেয়ে মজার বিষয় হল, অভিষেককে ঘিরে এই সংকটের সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও অদ্ভুত নীরব। তিনি প্রকাশ্যে তাঁকে আক্রমণ করছেন না, আবার আগের মতো ঢাল হয়ে দাঁড়াচ্ছেনও না। এই নীরবতা নিয়েও জল্পনা তুঙ্গে। তৃণমূলের অনেকেই মনে করছেন, দিদি এখন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। কারণ তিনি জানেন, বাংলার রাজনীতিতে উত্তরাধিকার তৈরি করা সহজ নয়।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে এমন এক নেত্রী, যিনি লড়াই করে উঠে এসেছেন। তাঁর রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের কেন্দ্রে রয়েছে সংগ্রামের কাহিনি। কিন্তু অভিষেকের বিরুদ্ধে বিরোধীদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হল এই অভিযোগ যে তিনি সংগ্রাম নয়, উত্তরাধিকার সূত্রে ক্ষমতার কেন্দ্রে পৌঁছেছেন।
ভারতীয় রাজনীতিতে উত্তরাধিকার নতুন কিছু নয়। কিন্তু উত্তরাধিকার তখনই গ্রহণযোগ্য হয়, যখন সেই ব্যক্তি নিজস্ব রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে পারেন। অভিষেক সেই পরীক্ষা এখনও পুরোপুরি উতরে যেতে পারেননি।
বরং এখন তাঁর চারপাশে এমন একটা আবহ তৈরি হচ্ছে, যেখানে তিনি যেন ক্রমশ একা হয়ে পড়ছেন। দলের পুরনো গোষ্ঠী তাঁকে পুরোপুরি বিশ্বাস করে না। নতুন প্রজন্মের নেতারা তাঁর কর্তৃত্বে বিরক্ত। সাধারণ কর্মীদের একাংশ মনে করেন, তাঁর রাজনীতি অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণমূলক। আর বিরোধীরা তো তাঁকে নিশানা করেই এগোচ্ছে।
এটাই সেই “অভিমন্যু দশা”।
চক্রব্যূহের প্রতিটি স্তরে নতুন নতুন আক্রমণ।
একদিকে আইনি চাপ। অন্যদিকে সাংগঠনিক বিদ্রোহ। তার ওপর জন-ভাবমূর্তির অবক্ষয়। আর সবশেষে রাজনৈতিক নিঃসঙ্গতা।
তবে বাংলার রাজনীতির ইতিহাস বলছে, সংকট কখনও কখনও নেতাকে আরও বিপজ্জনক করেও তোলে। কোণঠাসা নেতা অনেক সময় সবচেয়ে আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন। ফলে অভিষেকের ভবিষ্যৎ এখনো পুরোপুরি লেখা হয়ে যায়নি। তিনি পাল্টা আক্রমণে যেতে পারেন। দলের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করতে পারেন। নতুন আনুগত্যের বলয় তৈরি করার চেষ্টা করতে পারেন।
কিন্তু সমস্যা হল, সময় এখন তাঁর বিরুদ্ধে।
রাজনীতিতে ভয়ঙ্কর একটা মুহূর্ত আসে, যখন নেতার অনুগতরাও মনে মনে হিসেব কষতে শুরু করেন,“এরপর কী?” তৃণমূলের অন্দরমহলে সেই হিসেব এখন শুরু হয়ে গেছে বলেই মনে হচ্ছে।
আর সেই কারণেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বর্তমান পরিস্থিতি শুধু একজন নেতার ব্যক্তিগত সংকট নয়। এটা বাংলার ক্ষমতার অন্দরের পরিবর্তিত রসায়নের ইঙ্গিত। বহুদিন ধরে যাঁকে ভবিষ্যতের অবধারিত উত্তরসূরি বলে মনে করা হচ্ছিল, তিনি হঠাৎ দেখছেন ভবিষ্যৎ আর এতটা নিশ্চিত নয়।
রাজনীতিতে এর চেয়ে বড় ট্র্যাজেডি খুব কমই আছে।
কারণ ক্ষমতা হারানো যত না কষ্টের, তার থেকেও বেশি কষ্টের হল ক্ষমতা যে ফসকে যাচ্ছে, সেটা ধীরে ধীরে বুঝতে পারা।
তৃণমূলের পুরনো নেতাদের একটা অদ্ভুত অভ্যাস আছে। তাঁরা প্রকাশ্যে যতই আনুগত্যের ভাষণ দিন না কেন, আড্ডায় বসলে রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করতে ভীষণ ভালবাসেন। কালীঘাটের করিডর থেকে শুরু করে দক্ষিণ কলকাতার ক্লাবঘর সব জায়গাতেই এখন একটা প্রশ্ন ঘুরছে: “অভিষেক কি খুব তাড়াতাড়ি খুব বেশি কিছু পেয়ে গেছিলেন?”
প্রশ্নটা নিষ্ঠুর। কিন্তু রাজনীতি নিজেই নিষ্ঠুর বিদ্যা।
একসময় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের চারপাশে এমন এক আবহ তৈরি হয়েছিল যেন তিনি আর পাঁচজন নেতার মতো নন। তিনি “প্রজেক্ট”। তাঁকে ঘিরে দল, প্রশাসন, প্রচারযন্ত্র, সবকিছু নতুনভাবে সাজানো হচ্ছিল। তৃণমূলের অনেক পুরনো সৈনিক তখন নিজেদের মধ্যেই ঠাট্টা করে বলতেন, “এখন আর নেতা হওয়ার দরকার নেই, সঠিক শিবিরে থাকলেই হবে।”
এই “শিবির রাজনীতি”ই আজ তৃণমূলের সবচেয়ে বড় অভিশাপে পরিণত হয়েছে।
কারণ যখন কোনও দলে আদর্শের বদলে শিবির বড় হয়ে যায়, তখন আনুগত্যও হয়ে ওঠে অস্থায়ী। সবাই শক্তির কাছে থাকে, ব্যক্তির কাছে নয়। ফলে শক্তির কেন্দ্র দুর্বল হলেই সেই আনুগত্য বরফের মতো গলতে শুরু করে। আজ ডায়মন্ডহারবারে যা হচ্ছে, সেটা আসলে সেই গলনের শব্দ।
অভিষেকের রাজনৈতিক কৌশল ছিল স্পষ্ট। তিনি পুরনো তৃণমূলকে সরিয়ে এক নতুন প্রজন্মের দল গড়তে চেয়েছিলেন। যেখানে স্থানীয় প্রবীণ নেতাদের বদলে উঠতি মুখ, তথ্যভিত্তিক নির্বাচন কৌশল, সামাজিক মাধ্যম নির্ভর প্রচার এবং অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত সিদ্ধান্ত গ্রহণ থাকবে। কিছুদিনের জন্য এই মডেল দারুণ কাজও করেছিল। নির্বাচনে ফল এসেছিল। বিরোধীরা কোণঠাসা হয়েছিল। দলের মধ্যে তাঁর কর্তৃত্ব প্রায় প্রশ্নাতীত হয়ে উঠেছিল।
সমস্যা হল, বাংলার গ্রামীণ রাজনীতি দিল্লির টেলিভিশন স্টুডিও নয়। এখানে এখনও সম্পর্ক, অপমান, ব্যক্তিগত সম্মান, পাড়ার দাদাগিরি, সব মিলিয়েই সংগঠন দাঁড়িয়ে থাকে। সেখানে একের পর এক পুরনো নেতাকে সরিয়ে দিলে তাঁরা চুপচাপ বাড়ি গিয়ে বসে থাকেন না। বাইরে হাসিমুখে থাকলেও ভিতরে ভিতরে প্রতিশোধের দিন গোনেন।
আজ সেই প্রতিশোধের রাজনীতি শুরু হয়েছে।
ডায়মন্ডহারবারের সাম্প্রতিক বিদ্রোহগুলোকে যদি মন দিয়ে দেখা যায়, তাহলে বোঝা যাবে এগুলো নিছক রাজনৈতিক মতভেদ নয়। এগুলো মূলত সম্মানবোধের বিদ্রোহ। বহু স্থানীয় নেতা মনে করছেন, তাঁদের ব্যবহার করা হয়েছে, অপমান করা হয়েছে, তারপর নতুন “কোর টিম”-এর লোকেদের জন্য জায়গা খালি করতে বলা হয়েছে।
বাংলার রাজনীতিতে অপমান খুব বিপজ্জনক জিনিস। মতাদর্শ মানুষ ভুলে যায়, কিন্তু অপমান ভুলে যায় না।
একসময় যাঁরা অভিষেকের সভায় মঞ্চের সামনে দাঁড়িয়ে হাততালি দিতেন, তাঁরাই এখন চায়ের দোকানে বসে বলছেন, “বেশি উড়ছিল।” এই একটি বাক্যই বাংলার রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানের সারাংশ। বাঙালি ক্ষমতাকে সম্মান করে, কিন্তু অহংকারকে ক্ষমা করে না।
আর এখানেই অভিষেকের সবচেয়ে বড় সংকট।
তাঁর বিরুদ্ধে বিরোধীরা যত না আক্রমণ করছে, তার থেকেও বেশি ক্ষতি করছে তাঁর ভাবমূর্তিকে ঘিরে তৈরি হওয়া এই জন-মনস্তত্ত্ব। তিনি এখন অনেকের চোখে “অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী উত্তরাধিকারী”, যিনি ভেবেছিলেন ক্ষমতা স্থায়ী।
রাজনীতিতে স্থায়ী কিছু নেই। বিশেষ করে বাংলায় তো নয়ই।
বামফ্রন্ট একসময় ভাবত তাদের পতন অসম্ভব। কংগ্রেস একসময় ভাবত বাংলায় তাদের জায়গা কেউ নিতে পারবে না। তারপর একদিন দেখা গেল, যে মানুষগুলোকে তারা তুচ্ছ ভাবত, তারাই ইতিহাস লিখছে।
এই কারণেই এখন তৃণমূলের অন্দরেও একটা চাপা আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। কারণ অভিষেকের সংকট ব্যক্তিগত থাকছে না। সেটা দলের অভ্যন্তরীণ শক্তিসাম্যের প্রশ্ন হয়ে উঠছে।
অনেকেই এখন লক্ষ্য করছেন, দলের বহু নেতা প্রকাশ্যে অভিষেকের পাশে দাঁড়ালেও আগের মতো আগুনঝরা ভাষা ব্যবহার করছেন না। যেন সবাই অপেক্ষা করছে পরিস্থিতি কোনদিকে যায়।
রাজনীতিতে অপেক্ষমাণ আনুগত্য সবচেয়ে বিপজ্জনক।
কারণ সেটা আসলে আনুগত্য নয়, বীমা পলিসি।
ফলতা উপনির্বাচন এই কারণেই এত প্রতীকী হয়ে উঠেছে। তৃণমূলের নেতারা বাইরে যতই বলুন “দল ঐক্যবদ্ধ”, বাস্তবে সবাই জানে এই নির্বাচন শুধু ভোটের লড়াই নয়। এটা শক্তিপরীক্ষা। কে মাঠে নামছেন, কে দূরে থাকছেন, কে কাকে এড়িয়ে যাচ্ছেন, সবকিছুর মধ্যেই সংকেত লুকিয়ে আছে।
আর এই জায়গাতেই অভিষেকের অনুপস্থিতি রাজনৈতিক মহলে তীব্র আলোচনার বিষয়।
একসময় তিনি ছিলেন দলের সবচেয়ে আক্রমণাত্মক মুখ। বিরোধীদের সভাস্থলে পাল্টা মিছিল, সামাজিক মাধ্যমে তীব্র প্রচার, জেলা সফর, সব জায়গাতেই তাঁর উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। সেই মানুষটাই এখন হিসেব করে পা ফেলছেন।
অনেকেই বলছেন, তিনি বুঝতে পেরেছেন জনতার মেজাজ বদলাচ্ছে। আগে তাঁর সভায় ভিড় মানেই শক্তির প্রদর্শন ছিল। এখন সেই ভিড়ের মধ্যেই অস্বস্তিকর স্লোগান উঠে যেতে পারে। আগে স্থানীয় নেতা তাঁর সঙ্গে ছবি তুলতে মরিয়া থাকতেন। এখন কেউ কেউ দূরত্ব বজায় রাখছেন।
রাজনীতিতে এই দূরত্বই সবচেয়ে ভয়ংকর সংকেত।
কারণ ক্ষমতার কেন্দ্র ভাঙে প্রথমে মানসিকভাবে, তারপর সাংগঠনিকভাবে।
কলকাতার রাজনৈতিক মহলে এখন একটা নতুন ব্যঙ্গ খুব জনপ্রিয় হয়েছে। অনেকে বলছেন, “একসময় তৃণমূলে সবাই অভিষেকের ফোন ধরত। এখন অভিষেক নাকি অনেকের ফোন ধরার অপেক্ষায় থাকেন।”
ব্যঙ্গের ভিতরে অর্ধসত্য থাকে। আর অর্ধসত্যই সবচেয়ে বেশি আঘাত করে।
তবে এই পুরো ঘটনার সবচেয়ে নাটকীয় দিক সম্ভবত অন্যত্র। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এতদিন যে রাজনৈতিক ভাষা ব্যবহার করতেন, সেটাই এখন তাঁর বিরুদ্ধে ফিরে আসছে। তিনি একসময় “শুদ্ধিকরণ”, “নতুন রাজনীতি”, “দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা”—এই সব শব্দ ব্যবহার করে দলের ভেতরে নিজের অবস্থান শক্ত করেছিলেন। এখন বিরোধীরা সেই একই ভাষা ব্যবহার করে তাঁকেই ঘিরে ফেলছে।
রাজনীতিতে ভাষা বুমেরাংয়ের মতো। একদিন সেটা ফিরে আসে।
তৃণমূলের ভেতরে এখন অনেকে ফিসফিস করে বলছেন, “দলের মধ্যে এত শত্রু তৈরি করা ঠিক হয়নি।” এই উপলব্ধি হয়তো দেরিতে এসেছে। কারণ ক্ষমতার শীর্ষে থাকলে মানুষ সাধারণত ভাবে ভয়ই যথেষ্ট। কিন্তু ভয় খুব অস্থায়ী মুদ্রা। সুযোগ এলেই তার দাম পড়ে যায়।
আজ সেই দাম পড়ছে।
আর সবচেয়ে বড় কথা, অভিষেকের বিরুদ্ধে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, সেটা আর শুধুই বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরে সীমাবদ্ধ নেই। সেটার একটা সামাজিক মাত্রাও তৈরি হয়েছে। বহু সাধারণ মানুষ এখন তাঁকে “ক্ষমতার প্রতীক” হিসেবে দেখতে শুরু করেছেন। আর বাংলার জনমনস্তত্ত্বে ক্ষমতার প্রতীকের বিরুদ্ধে হঠাৎ করেই তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে।
ইতিহাসে এর উদাহরণ অনেক।
যে মানুষকে একদিন অপরিহার্য মনে হয়েছিল, কয়েক বছরের মধ্যে তাকেই জনতা অস্বীকার করেছে। কারণ রাজনীতিতে জনপ্রিয়তা নদীর জলের মতো, একই জায়গায় চিরকাল থাকে না।
আজ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সেই স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছেন।
একদিকে মামলা। অন্যদিকে দলের ভাঙন। তার ওপর জনমানসে বদলে যাওয়া প্রতিচ্ছবি। সব মিলিয়ে তিনি যেন এমন এক রাজনৈতিক গোলকধাঁধায় ঢুকে পড়েছেন, যেখানে প্রতিটি মোড়ে অপেক্ষা করছে নতুন অনিশ্চয়তা।
আর কলকাতার রাজনৈতিক আড্ডাগুলো এখন সেই অনিশ্চয়তাকেই উপভোগ করছে।
কারণ বাংলার রাজনীতি নাটক ভালবাসে। উত্থানের থেকেও বেশি ভালবাসে পতনের কাহিনি।