বাংলাস্ফিয়ার: কয়েক মাস আগেও দিল্লির অর্থ মন্ত্রক, রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক এবং সরকারঘনিষ্ঠ বহু অর্থনীতিবিদ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলছিলেন, ভারতীয় টাকা যথেষ্ট “স্থিতিশীল” আছে। বিশ্বের বহু মুদ্রা যখন ডলারের সামনে একের পর এক পিছিয়ে পড়ছে, তখন ভারতীয় টাকার পতন নাকি তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত। কথাটা পুরোপুরি মিথ্যা ছিল না। কিন্তু এখন সেই আত্মবিশ্বাসে স্পষ্ট ফাটল দেখা যাচ্ছে। ডলারের তুলনায় টাকার দাম দ্রুত নেমে আসছে। বাজারে আশঙ্কা ছড়িয়েছে, খুব শীঘ্রই এক ডলারের দাম একশো টাকা ছুঁয়ে ফেলতে পারে।

অর্থনীতির জটিল ভাষা বাদ দিলে বিষয়টা আসলে খুব সহজ। একটি দেশের মুদ্রা সেই দেশের অর্থনৈতিক শক্তি, আমদানি-রপ্তানির ভারসাম্য, বিদেশি বিনিয়োগ, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে বিশ্বের আস্থার প্রতীক। যত টাকার দাম পড়ে যাচ্ছে, ততই ভারতের অর্থনীতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

এই সাম্প্রতিক পতনের পিছনে সবচেয়ে বড় তাৎক্ষণিক কারণ অবশ্যই উপসাগরীয় যুদ্ধ। পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনা বাড়তেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম চড়তে শুরু করেছে। ভারত পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ তেল আমদানিকারক দেশ। আমরা যে পেট্রোল, ডিজ়েল, রান্নার গ্যাস ব্যবহার করি, তার বড় অংশ বিদেশ থেকে আসে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লেই ভারতের ডলার চাহিদা হু হু করে বাড়ে। কারণ তেল কিনতে টাকা নয়, ডলার লাগে।

চাহিদা বাড়লে যে কোনও জিনিসের দাম বাড়ে। ডলারের ক্ষেত্রেও তাই হয়। বাজারে যত বেশি ডলার কেনার হিড়িক পড়ে, ডলারের দাম তত বাড়ে এবং টাকার দাম তত কমে। উপসাগরীয় যুদ্ধ সেই প্রক্রিয়াকে হঠাৎ ত্বরান্বিত করেছে।

কিন্তু এখানেই গল্প শেষ নয়। বহু বিশেষজ্ঞ বলছেন, আজকের এই পতন কেবল যুদ্ধের ফল নয়। বরং যুদ্ধ শুধু একটি লুকোনো দুর্বলতাকে সামনে এনে দিয়েছে। গত কয়েক বছরে ভারতীয় টাকার প্রকৃত অবস্থাকে কৃত্রিমভাবে শক্তিশালী দেখানোর চেষ্টা হয়েছিল। এখন সেই জমে থাকা চাপ একসঙ্গে বেরিয়ে আসছে।

একটু ভেবে দেখলে বিষয়টা বোঝা যায়। সাধারণত যদি কোনও দেশের আমদানি দ্রুত বাড়ে, রপ্তানি দুর্বল হয়, বিদেশি বিনিয়োগ কমতে থাকে এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়ে, তাহলে সেই দেশের মুদ্রার দাম ধীরে ধীরে কমতে থাকে। এটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু সরকার অনেক সময় রাজনৈতিক কারণে এই পতন আটকে রাখতে চায়। কারণ দুর্বল মুদ্রা মানে জনগণের চোখে দুর্বল অর্থনীতি।

ভারতেও গত দু-তিন বছরে সেই কাজটাই হয়েছে বলে অভিযোগ। রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক বিপুল পরিমাণ ডলার বিক্রি করে বাজারে টাকার দাম ধরে রাখার চেষ্টা করেছে। অর্থাৎ বাজার যদি বলত এক ডলারের দাম হওয়া উচিত নব্বই টাকা, তখন কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক হস্তক্ষেপ করে সেটিকে হয়তো চুরাশি বা পঁচাশি টাকায় আটকে রাখত। এতে আপাতদৃষ্টিতে পরিস্থিতি স্থিতিশীল দেখাত। কিন্তু সমস্যাটা ভিতরে ভিতরে থেকেই যেত।

একে অনেক অর্থনীতিবিদ প্রেসার কুকারের সঙ্গে তুলনা করেন। ভেতরে চাপ বাড়ছে, কিন্তু বাইরে থেকে ঢাকনা চেপে রাখা হয়েছে। কিছুদিন তা সম্ভব। কিন্তু একসময় চাপ এত বেড়ে যায় যে ঢাকনা আর ধরে রাখা যায় না। তখন আচমকা বিস্ফোরণ ঘটে।

আজ টাকার ক্ষেত্রে অনেকটা সেই অবস্থাই তৈরি হয়েছে।

এই কৃত্রিম স্থিতিশীলতার আরও একটি রাজনৈতিক দিক ছিল। শক্তিশালী টাকা দেখাতে পারলে সরকার বলতে পারে—দেখুন, বিশ্ব অশান্ত হলেও ভারত স্থির আছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছেও এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক বার্তা দেয়। কিন্তু বাজারকে দীর্ঘদিন ধরে বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা যায় না।

সমস্যা হল, টাকা দুর্বল হলে তার অভিঘাত সমাজের প্রায় প্রতিটি স্তরে পৌঁছায়। সবচেয়ে আগে আঘাত লাগে আমদানিতে। ভারত বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল, ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ, শিল্প কাঁচামাল, সার, ভোজ্য তেল এবং নানা প্রযুক্তি বিদেশ থেকে কেনে। টাকার দাম কমে গেলে এই সব পণ্যের আমদানি ব্যয় হঠাৎ বেড়ে যায়।

ধরা যাক, গত বছর এক ব্যারেল তেল কিনতে লাগত আশি ডলার। যদি এক ডলারের দাম পঁচাশি টাকা হয়, তাহলে খরচ পড়ত ছয় হাজার আটশো টাকা। কিন্তু ডলার যদি একশো টাকায় পৌঁছে যায়, একই তেলের জন্য দিতে হবে আট হাজার টাকা। অর্থাৎ শুধু মুদ্রার অবমূল্যায়নের জন্যই বিপুল অতিরিক্ত খরচ।

এই অতিরিক্ত খরচ শেষ পর্যন্ত কে দেয়? সাধারণ মানুষ।

পেট্রোলের দাম বাড়ে। পরিবহণ খরচ বাড়ে। বাজারে সবজির দাম বাড়ে। কারখানার উৎপাদন ব্যয় বাড়ে। বিদ্যুতের খরচ বাড়ে। বিমান ভাড়া বাড়ে। মোবাইল ফোন থেকে শুরু করে কম্পিউটার—সব ইলেকট্রনিক পণ্য দামি হয়ে ওঠে। অর্থাৎ টাকার পতন শেষ পর্যন্ত মুদ্রাস্ফীতিকে উসকে দেয়।

এখানেই বিপদ আরও গভীর। কারণ সাধারণ মানুষের আয় সেই হারে বাড়ে না। ফলে প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। মানুষ বুঝতে শুরু করে, একই বেতনে আগের তুলনায় কম জিনিস কেনা যাচ্ছে। মধ্যবিত্তের সঞ্চয় ক্ষয়ে যেতে থাকে। দরিদ্র মানুষের জীবন আরও অনিশ্চিত হয়ে ওঠে।

ভারতের মতো দেশে এটি বিশেষ উদ্বেগের কারণ। কারণ এখানে বিপুল সংখ্যক মানুষ এখনও সীমিত আয়ের মধ্যে বেঁচে আছেন। সামান্য মূল্যবৃদ্ধিও তাদের সংসারে বড় ধাক্কা দেয়।

আরও একটি বড় সমস্যা হল বিদেশি ঋণ। ভারতের বহু সংস্থা বিদেশ থেকে ডলারে ঋণ নিয়েছে। টাকার দাম কমে গেলে সেই ঋণ শোধ করা অনেক বেশি ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে। ধরুন, কোনও সংস্থা একশো কোটি ডলার ঋণ নিয়েছে। ডলারের দাম যদি আশি টাকা থেকে একশো টাকায় ওঠে, তাহলে ভারতীয় মুদ্রায় তাদের দায় কয়েক হাজার কোটি টাকা বেড়ে যায়।

ফলে কর্পোরেট ব্যালান্সশিট দুর্বল হতে শুরু করে। বিনিয়োগ কমে। নতুন কর্মসংস্থান তৈরির গতি মন্থর হয়।

বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মনস্তত্ত্বও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা সাধারণত স্থিতিশীল মুদ্রা পছন্দ করেন। কারণ তারা যদি ভারতের শেয়ার বাজারে লাভও করেন, কিন্তু সেই লাভ টাকার অবমূল্যায়নে মুছে যায়, তাহলে তাদের আগ্রহ কমে যায়। ফলে বিদেশি পুঁজি বেরিয়ে যেতে শুরু করতে পারে।

এটি আবার নতুন করে টাকার ওপর চাপ সৃষ্টি করে। কারণ বিদেশি বিনিয়োগকারী টাকা বিক্রি করে ডলার নিয়ে দেশ ছাড়েন। ফলে ডলারের চাহিদা আরও বাড়ে।

এই পুরো প্রক্রিয়াটি অনেক সময় এক ভয়ঙ্কর চক্রে পরিণত হয়। টাকা পড়ে, বিনিয়োগ কমে, বাজার আতঙ্কিত হয়, আরও টাকা পড়ে।

অবশ্য কিছু অর্থনীতিবিদ বলবেন, দুর্বল টাকার কিছু সুবিধাও আছে। যেমন রপ্তানি প্রতিযোগিতামূলক হয়। বিদেশে ভারতীয় পণ্য তুলনামূলক সস্তা হয়ে যায়। তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থা বা বিদেশ থেকে আয় করা পরিষেবা খাত কিছু ক্ষেত্রে লাভবানও হয়।

কিন্তু ভারতের বাস্তবতা একটু জটিল। কারণ ভারত এখনও বিপুল আমদানিনির্ভর অর্থনীতি। বিশেষত জ্বালানি ক্ষেত্রে। ফলে দুর্বল টাকার নেতিবাচক প্রভাব সাধারণত ইতিবাচক দিকের চেয়ে অনেক দ্রুত এবং অনেক গভীরভাবে আঘাত করে।

সবচেয়ে উদ্বেগের জায়গা হল আস্থার প্রশ্ন। অর্থনীতি শেষ পর্যন্ত শুধু পরিসংখ্যান নয়, মানসিকতাও। মানুষ যদি বিশ্বাস করতে শুরু করে যে টাকা ক্রমাগত দুর্বল হবে, তাহলে তারা সোনা কিনতে শুরু করে, ডলার জমাতে চায়, বিদেশে অর্থ সরাতে চায়। ব্যবসায়ীরা দাম বাড়াতে শুরু করেন। বাজারে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়।

এই কারণেই মুদ্রার দ্রুত পতনকে অর্থনীতির “লাল সঙ্কেত” বলা হয়। এটি শুধু একটি সংখ্যার পরিবর্তন নয়। এটি অর্থনীতির ভিতরে জমে থাকা উদ্বেগ, দুর্বলতা এবং অনিশ্চয়তার বহিঃপ্রকাশ।

ভারতের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল, পরিস্থিতিকে আতঙ্কে পরিণত হতে না দেওয়া। রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক হয়তো আবার বাজারে হস্তক্ষেপ করবে। সরকার আমদানি নিয়ন্ত্রণ, তেল সরবরাহ বা বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয় নিয়ে আশ্বাস দেবে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে শুধুমাত্র প্রশাসনিক কৌশলে মুদ্রাকে শক্তিশালী রাখা যায় না।

তার জন্য প্রয়োজন বাস্তব অর্থনৈতিক শক্তি—উৎপাদন বৃদ্ধি, রপ্তানি সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, বিদেশি বিনিয়োগের আস্থা এবং নীতিগত স্বচ্ছতা।

অর্থনীতির ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, বাজারকে কিছুদিন বিভ্রান্ত করা সম্ভব, কিন্তু চিরকাল নয়। মুদ্রা শেষ পর্যন্ত দেশের প্রকৃত অবস্থার প্রতিফলন ঘটায়। আজ টাকার পতন সেই কঠিন সত্যটিকেই আবার সামনে এনে দিয়েছে।