Home খবর মন্দিরে মিলন, মনে মনান্তর

মন্দিরে মিলন, মনে মনান্তর

0 comments 2 views
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ারঃ বেইজিংয়ের ‘টেম্পল অব হেভেন’ বহুদিন ধরেই মহাজাগতিক শৃঙ্খলা আর সম্রাটের ক্ষমতার প্রতীক। পঞ্চদশ শতকে তৈরি এই মন্দির-চত্বর এমনভাবে পরিকল্পনা করা হয়েছিল, যাতে মানবজগৎ ও দেবজগতের সম্পর্ক এবং সেই সম্পর্কে চীনা সম্রাটের বিশেষ ভূমিকা ফুটে ওঠে — তিনি ছিলেন “স্বর্গের পুত্র”। বছরে অন্তত একবার সম্রাটেরা বিশাল শোভাযাত্রা নিয়ে ফরবিডেন সিটি থেকে এই মন্দিরে আসতেন এবং ভালো ফসল, অনুকূল আবহাওয়া আর সাম্রাজ্যে শান্তির জন্য প্রার্থনা করতে।

স্থিতিশীলতা আর লাভজনক বাণিজ্যের চিন্তাই সম্ভবত শি জিনপিং এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের মাথায় ছিল, যখন তাঁরা ১৪ মে বেইজিং সফরের প্রথম দিনে এই মন্দির ঘুরে দেখেন। চীনের প্রেসিডেন্ট তাঁর মার্কিন সমকক্ষকে তিয়েনআনমেন স্কোয়ারে জাঁকজমকপূর্ণ অভ্যর্থনা জানান, তারপর গ্রেট হল অব দ্য পিপলে বৈঠক হয়। বিদেশি নেতাদের ক্ষেত্রে যা প্রায় অভূতপূর্ব — শি নিজে ট্রাম্পকে নিয়ে বিকেলে টেম্পল অব হেভেন ঘুরতে যান, এরপর রাষ্ট্রীয় নৈশভোজ। ১৫ মে চা-আড্ডা ও কার্যকরী মধ্যাহ্নভোজের পর ট্রাম্পের চীন ছাড়ার কথা ছিল।

দুই নেতার হিসাব আলাদা

এই মন্দির সফর দুই নেতার আলাদা আলাদা স্বার্থ পূরণ করেছে। ২০১৭ সালের পর এই প্রথম চীনে তাঁদের বৈঠক, এবং আলোচনার কেন্দ্রে ছিল বাণিজ্য, তাইওয়ান আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।

ট্রাম্প মন্দির সফরকে সম্মানের নিদর্শন হিসেবেই দেখাবেন।  তিনি আগেই বলেছিলেন, তাঁর আগের বেজিং সফরের চেয়েও বেশি আড়ম্বর তিনি দেখতে চান—যে সফরে শি তাঁকে ফরবিডেন সিটিতে নজিরবিহীন ব্যক্তিগত নৈশভোজে আপ্যায়ন করেছিলেন। সামগ্রিকভাবে এবারের সফর সেই উচ্চতায় পৌঁছয়নি। কিন্তু টেম্পল অব হেভেন ভ্রমণটি—১৯৭৫ সালের পর কোনও মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রথম—ট্রাম্পকে দেশে ফিরে এটিকে সফল সফর হিসেবে তুলে ধরতে সাহায্য করবে। বিশেষ করে যখন ইরানের বিরুদ্ধে তাঁর যুদ্ধনীতি জনপ্রিয়তার হারকে চাপে ফেলেছে।

শি-র জন্য এটি ছিল ব্যক্তিগত কর্তৃত্ব ও সভ্যতার মহিমা দেখানোর সুযোগ। অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যেও অনেক চীনা নাগরিক মনে করছেন, আমেরিকা যখন বিদেশে যুদ্ধে আটকে আছে, তখন আন্তর্জাতিক মঞ্চে চীনের মর্যাদা বাড়ছে। মন্দিরের পাশে একটি ফটোগ্রাফি স্টুডিওতে কাজ করেন গু ইয়েমিং। তিনি বলেন, “সত্যি বলতে আমি ওঁকে এখানে স্বাগত জানাই না। উনি ঝামেলা করতে ভালোবাসেন। কিন্তু অন্তত দুই দেশের মধ্যে কথা হওয়া দরকার, যাতে পৃথিবীটা একটু শান্তিপূর্ণ হয়।”

এই শীর্ষ বৈঠকের মঞ্চসজ্জা আরেকটি কাজও করছে—দুই পক্ষের গভীর কাঠামোগত মতপার্থক্যের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য অগ্রগতির ঘাটতি ঢেকে দেওয়া

সৌজন্যের আড়ালে মতপার্থক্য

প্রকাশ্যে দুই নেতাই মতভেদ ছোট করে দেখানোর চেষ্টা করেন। “আমাদের একসঙ্গে অসাধারণ ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে,” বলেন ট্রাম্প, শি-কে “মহান নেতা” বলে সম্বোধন করেন। মার্কিন প্রতিনিধিদলে ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। শি বলেন, মতভেদের চেয়ে অভিন্ন স্বার্থই বেশি গুরুত্বপূর্ণ এবং দুই দেশের সম্পর্কের স্থিতিশীলতা গোটা বিশ্বের জন্যই ভালো। “আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, অংশীদার হওয়া উচিত,” বলেন তিনি।

বৈঠকের সঙ্গে যুক্ত সূত্রগুলো জানাচ্ছে, দুই নেতার মূল লক্ষ্য ছিল সেই এক বছরের বাণিজ্যযুদ্ধ-বিরতি ধরে রাখা, যা তাঁরা গত অক্টোবরে দক্ষিণ কোরিয়ায় করমর্দনের সময় ঠিক করেছিলেন। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ গত বছর একসময় কিছু চীনা পণ্যে ট্রাম্পের শুল্ক ১৪৫ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল।

বাণিজ্যে কিছুটা আশা

মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ১৩ মে সিওলে চীনের উপ-প্রধানমন্ত্রী হে লিফেংয়ের সঙ্গে প্রস্তুতিমূলক বৈঠক করেন। সম্ভাব্য ফলাফলের মধ্যে রয়েছে একটি “বোর্ড অব ট্রেড” ও “বোর্ড অব ইনভেস্টমেন্ট” গঠন, যা দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যকে আরও সহজ করবে। যদিও এসবের খুঁটিনাটি এখনও অস্পষ্ট।

চীনের তরফে বেশি পরিমাণে মার্কিন গরুর মাংস, সয়াবিন ও বোয়িং বিমান কেনার সম্ভাবনাও আলোচনায় আছে।

ট্রাম্পের সঙ্গে এসেছেন এক ডজনেরও বেশি শীর্ষ মার্কিন ব্যবসায়ী — টেসলার ইলন মাস্ক, অ্যাপলের টিম কুক, ব্ল্যাকরকের ল্যারি ফিঙ্ক এবং বোয়িংয়ের কেলি অর্টবার্গ। এনভিডিয়ার জেনসেন হুয়াং শেষ মুহূর্তে যোগ দেন — আলাস্কায় যাত্রাবিরতিতে এয়ার ফোর্স ওয়ানে ওঠেন তিনি। এতে আশা জেগেছে, চীনের এআই কোম্পানিগুলোর বহু কাঙ্ক্ষিত এনভিডিয়া চিপ সরবরাহ নিয়েও কথা হতে পারে। বেইজিং রওনার আগে ট্রাম্প বলেন, শি-র কাছে তাঁর প্রথম অনুরোধ হবে চীন যেন মার্কিন ব্যবসার জন্য আরও “খুলে যায়”।

তাইওয়ান নিয়ে উত্তেজনা

শি-র সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার তাইওয়ান — স্বশাসিত দ্বীপটিকে চীন নিজেদের অংশ বলে দাবি করে। বৈঠকে তিনি ট্রাম্পকে সরাসরি সতর্ক করেন, এই প্রশ্ন ভুলভাবে সামলালে দুই দেশের মধ্যে সংঘর্ষ বেঁধে যেতে পারে।

চীন দীর্ঘদিন ধরে চাইছে, আমেরিকা তাইওয়ানে অস্ত্র বিক্রি কমাক এবং প্রকাশ্যে বলুক যে আমেরিকা তাইওয়ানের স্বাধীনতার “বিরোধী”। এই সপ্তাহে ট্রাম্প বলেন, তিনি শি-র সঙ্গে অস্ত্র বিক্রির প্রশ্ন আলোচনা করবেন — এতে তাইওয়ান সরকার উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। যদিও হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা বলছেন, আনুষ্ঠানিক নীতি বদলের সম্ভাবনা নেই।

চীনা সরকারি উপদেষ্টারা জানাচ্ছেন, তাঁরা এই একটি বৈঠকের চেয়ে বরং সারা বছরজুড়ে অগ্রগতির আশা করছেন কারণ দুই নেতার মধ্যে আরও তিনটি বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে।

ইরান ও ইউক্রেন নিয়ে মতের ফাঁক

ইউরোপ ও পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ নিয়েও দুই নেতার মধ্যে মিল হওয়া কঠিন। ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধে চীনের সহায়তা বন্ধের মার্কিন আহ্বান বেইজিং বারবার উড়িয়ে দিয়েছে। শীর্ষ বৈঠকের আগে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, ট্রাম্প চাইবেন চীন যেন ইরানি তেল কম কেনে, সামরিক প্রযুক্তি না দেয় এবং হরমুজ প্রণালী খুলে দিতে চাপ সৃষ্টি করে। কিন্তু বেইজিং রওনার আগেই ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন, ইরান প্রশ্ন আলোচনায় খুব বেশি জায়গা পাবে না।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় সীমিত সহযোগিতা

এআই নিয়ে মার্কিন কর্মকর্তারা চান দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত সংলাপ এবং একটি “হটলাইন”। বাইডেন আমলে শুরু হওয়া এই সংলাপের ফলে ২০২৪ সালে ঘোষণা হয়েছিল — পারমাণবিক অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ কেবল মানুষের হাতেই থাকবে। সাইবার জালিয়াতি বা জীবাণু তৈরিতে এআই-এর অপব্যবহার নিয়ে দুই পক্ষেরই উদ্বেগ আছে। তবে সংলাপ পুনরায় শুরু হলেও প্রকৃত সহযোগিতা বাধাগ্রস্ত হবে কারণ কৌশলগত অবিশ্বাস আর আরও শক্তিশালী এআই মডেল তৈরির তীব্র প্রতিযোগিতা দুই দেশকে কাছে আসতে দিচ্ছে না।

স্থিতিশীলতা আর লাভজনক বাণিজ্য হয়তো সত্যিই দুই পক্ষেরই চাওয়া। কিন্তু বাস্তবে দুই নেতা তাঁদের সম্পর্ককে এমন একটি খেলা হিসেবে দেখছেন, যেখানে একজনের লাভ মানেই অন্যজনের ক্ষতি। টেম্পল অব হেভেনে ঐক্যের এই প্রদর্শন কিংবা এই শীর্ষ বৈঠকের অন্য কোনও মুহূর্তও সেই দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে পারবে বলে মনে হয় না।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles