বাংলাস্ফিয়ারঃ দিল্লির মানুষ বহুদিন ধরেই যানজট, দূষণ এবং জ্বালানির ক্রমবর্ধমান খরচের সঙ্গে বসবাস করতে অভ্যস্ত। কিন্তু এবারে পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে প্রশাসন বাধ্য হয়েছে কর্মসংস্কৃতিতেই বড়সড় পরিবর্তনের পথে হাঁটতে। মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্ত বৃহস্পতিবার ঘোষণা করেছেন, রাজধানীর সমস্ত সরকারি কর্মীদের জন্য সপ্তাহে অন্তত দু’দিন ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ বা বাড়ি থেকে কাজ করা বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বেসরকারি সংস্থাগুলিকেও একই পথে হাঁটার আহ্বান জানিয়েছে দিল্লি সরকার। এই সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এল, যখন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী কেন্দ্রীয় স্তরে এক নতুন মিতব্যয়িতা অভিযানের সূচনা করেছেন। সরকারি খরচ কমানো, জ্বালানির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়ানো— এই তিনটিকেই এখন একসূত্রে বাঁধার চেষ্টা চলছে।
দিল্লি সরকারের বক্তব্য, এই সিদ্ধান্ত কেবলমাত্র কর্মপদ্ধতির পরিবর্তন নয়; বরং এটি শহরের সামগ্রিক জীবনযাত্রাকে পুনর্বিন্যাস করার একটি প্রয়াস। প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ গাড়ি দিল্লির রাস্তায় নামে। অফিস টাইমে শহরের প্রধান সড়কগুলি কার্যত অচল হয়ে পড়ে। তার সঙ্গে যোগ হয় ভয়াবহ বায়ুদূষণ। প্রশাসনের হিসেব অনুযায়ী, সপ্তাহে দু’দিন যদি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কর্মী বাড়ি থেকে কাজ করেন, তাহলে জ্বালানি খরচ যেমন কমবে, তেমনি যানজটও অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আসবে।
এই সিদ্ধান্তের পিছনে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিরও প্রভাব রয়েছে। পশ্চিম এশিয়ায় অস্থিরতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ক্রমাগত ওঠানামা করছে। ভারতে ইতিমধ্যেই জ্বালানির খরচ সাধারণ মানুষের উপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। প্রধানমন্ত্রী মোদী গত কয়েক সপ্তাহ ধরে বারবার মানুষকে সংযমী জীবনযাত্রার বার্তা দিচ্ছেন। কোভিড আমলে যেসব অভ্যাস তৈরি হয়েছিল, যেমন কম ভ্রমণ, ডিজিটাল মিটিং, দূরবর্তী কাজ, সেগুলিকে ফের গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। দিল্লির এই সিদ্ধান্ত সেই বৃহত্তর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বার্তারই অংশ।
তবে এই উদ্যোগকে ঘিরে বিতর্কও শুরু হয়েছে। একাংশের মতে, এটি আসলে সরকারের ব্যর্থ নগর পরিকল্পনার ফল। বছরের পর বছর ধরে দিল্লিতে জনসংখ্যা বেড়েছে, গাড়ির সংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু পরিকাঠামো সেই হারে উন্নত হয়নি। ফলে এখন প্রশাসন সমস্যার স্থায়ী সমাধানের বদলে অস্থায়ী পথ বেছে নিচ্ছে। আবার অন্যদের মতে, ভবিষ্যতের শহরগুলিকে এমন নমনীয় কর্মসংস্কৃতির দিকেই এগোতে হবে। কারণ জলবায়ু পরিবর্তন, জ্বালানি সঙ্কট এবং নগর জীবনের চাপ— সব মিলিয়ে পুরনো ধাঁচের অফিস সংস্কৃতি আর দীর্ঘদিন টিকবে না।
বেসরকারি সংস্থাগুলির প্রতিক্রিয়াও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে চলেছে। আইটি এবং পরিষেবা ক্ষেত্রের বহু সংস্থা ইতিমধ্যেই হাইব্রিড মডেলে কাজ করছে। কিন্তু উৎপাদন, খুচরো ব্যবসা বা সরাসরি পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত ক্ষেত্রগুলিতে বাড়ি থেকে কাজ করা সহজ নয়। ফলে দিল্লি সরকারের আহ্বান কতটা বাস্তবায়িত হবে, তা এখনই স্পষ্ট নয়।
তবু রাজনৈতিক দিক থেকে এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কোভিড-পরবর্তী ভারতে প্রশাসন আবারও বুঝতে শুরু করেছে যে প্রযুক্তিনির্ভর নমনীয় কর্মব্যবস্থা কেবল জরুরি পরিস্থিতির সমাধান নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক কৌশলও হতে পারে। দিল্লি এখন সেই পরীক্ষাগারের ভূমিকা নিতে চলেছে, যেখানে নগর প্রশাসন, পরিবেশনীতি এবং অর্থনৈতিক সংযম— এই তিনটিকে একসঙ্গে মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করা হচ্ছে।