বাংলাস্ফিয়ারঃ তামিল রাজনীতিতে জ্যোতিষশাস্ত্রের প্রভাব নতুন কিছু নয়। এম জি আর থেকে জয়ললিতা, শুভক্ষণ দেখে শপথ, রাহুকাল এড়িয়ে ফাইল সই, মন্দিরে বিশেষ যজ্ঞ— সবই এই রাজনীতির দীর্ঘ ঐতিহ্যের অংশ। কিন্তু সেই ঐতিহ্যও মাঝে মাঝে এমন জায়গায় পৌঁছে যায়, যেখানে বাস্তবতা নিজেই ব্যঙ্গচিত্র হয়ে ওঠে। ঠিক যেমনটা ঘটল সি জোসেফ বিজয়ের সরকারে।
মাত্র একদিন! হ্যাঁ, ঘড়ির কাঁটায় ঠিক ২৪ ঘণ্টা। পুরো রাজনৈতিক জীবনের বিচারে যা কেবল একটা পলক ফেলার সময়। আর এতটুকু সময়ের মধ্যেই মুখ্যমন্ত্রীর “অফিসার অন স্পেশাল ডিউটি(পলিটিক্যাল)” বা রাজনৈতিক ওএসডি-র পদ থেকে বিদায় নিতে হল জ্যোতিষী রিকি রাধন পণ্ডিত ভেট্রিভেলকে। তামিলনাড়ু সরকার তাঁকে নিয়োগ দিয়েছিল একরকম ধুমধাম করেই। কিন্তু নিয়োগের ২৪ ঘণ্টা কাটতে না কাটতেই সরকার বুঝে গেল— নক্ষত্রের অবস্থান হয়তো অনুকূলে ছিল না।
ঘটনাটি এমন এক নাটকীয় মোড় নেয় যে চেন্নাইয়ের রাজনৈতিক মহলে এখন সবচেয়ে জনপ্রিয় কৌতুক: “ভেট্রিভেল নিজের কুন্ডলীটা আগে দেখে নিলেন না কেন?”
সমস্যাটা শুরু হয়েছিল নিয়োগ ঘোষণার পর থেকেই। বিরোধীরা তো বটেই, সরকারের শরিকদের একাংশও অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। রাজনৈতিক পরামর্শদাতার পদে একজন জ্যোতিষী! তাও আবার এমন একটি পদ, যার সঙ্গে প্রশাসনিক গুরুত্ব, কৌশলগত সিদ্ধান্ত এবং রাজনৈতিক যোগাযোগ জড়িত। অনেকের কাছেই বিষয়টি ছিল যেন বাস্তবের মধ্যে হঠাৎ কোনও তামিল ব্যঙ্গাত্মক সিনেমার দৃশ্য ঢুকে পড়েছে।
বিধানসভায় এই নিয়ে সরব হন প্রেমলতা বিজয়কান্ত। তাঁর আপত্তি ছিল সরাসরি এবং তীক্ষ্ণ। তিনি প্রশ্ন তোলেন, সরকার কি এখন থেকে নীতি নির্ধারণ করবে গ্রহ-নক্ষত্র দেখে? মন্ত্রিসভার বৈঠকের আগে কি তবে মন্ত্রীদের জন্মপত্রিকা মিলিয়ে দেখা হবে? বিরোধী বেঞ্চ থেকে হাসির রোল উঠলেও সরকারের অস্বস্তি তখন স্পষ্ট।
আসলে এই নিয়োগটি এমন এক সময়ে হয়েছিল, যখন দক্ষিণ ভারতের রাজনীতিতে ব্যক্তিপূজা, ইমেজ ম্যানেজমেন্ট এবং “অলৌকিক আভা” তৈরির প্রতিযোগিতা চরমে। চলচ্চিত্র থেকে উঠে আসা নেতাদের ঘিরে প্রায় দেবত্বের আবহ তৈরি করা তামিল রাজনীতির পুরনো প্রবণতা। সেই জায়গায় একজন জ্যোতিষীকে রাজনৈতিক ওএসডি করা অনেকের কাছেই মনে হয়েছিল— প্রশাসন নয়, যেন কোনও রাজদরবার চলছে।
সবচেয়ে বড় থাপ্পড়টা এল সোশ্যাল মিডিয়া থেকে। নেটপাড়ার বাসিন্দারা ট্রোলিংয়ে কোনও দয়া দেখালেন না।
-
কেউ লিখলেন, “পরের বার হয়তো আবহাওয়া দফতরের বদলে মুখ্যমন্ত্রী রাশিফল দেখে বৃষ্টি ঘোষণা করবেন!”
-
আবার কারও পোস্ট, “রাজ্যে রাষ্ট্রপতির শাসন নয়, এবার পুরো গ্রহের শাসন চলছে!”
সরকার প্রথমে পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করেছিল। শোনা যাচ্ছিল, ভেট্রিভেল নাকি শুধুই “বিশেষ পরামর্শদাতা”, তাঁর রোলটাকে মিডিয়া ভুল ব্যাখ্যা করছে। কিন্তু রাজনৈতিক চাপ এত দ্রুত বাড়তে থাকে যে শেষ পর্যন্ত সরকার পিছিয়ে আসতে বাধ্য হয়। নিয়োগের একদিনের মধ্যেই বাতিল করা হল নিয়োগপত্র।
এই দ্রুত ইউ-টার্ন তামিল রাজনীতির এক গভীর বাস্তবতাও সামনে এনে দিল। আজকের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে জনমত অনেক বেশি তাৎক্ষণিক এবং নির্মম। আগে এমন বিতর্ক হয়তো কয়েকদিন সংবাদপত্রের সম্পাদকীয়তে সীমাবদ্ধ থাকত। এখন কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তা মিম, ভিডিও, টক শো এবং বিধানসভা বিতর্ক হয়ে সরকারের ঘাড়ে চেপে বসে।
আরও মজার বিষয় হল, সরকার যে ব্যাখ্যাই দিক না কেন, এই ঘটনার পর একটি প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে— নিয়োগের আগে কি সত্যিই কেউ ভাবেননি এর প্রতিক্রিয়া কী হবে? নাকি ভেবেছিলেন জনতা বিষয়টিকে সহজেই মেনে নেবে?
সম্ভবত এখানেই সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ভুলটা হয়েছে। কারণ ভারতের ভোটার অনেক কিছু মেনে নিতে পারেন, কিন্তু ক্ষমতার প্রকাশ্য হাস্যকর ব্যবহার খুব কম সময়েই ক্ষমা করেন। বিশেষ করে যখন বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি, অবকাঠামো বা প্রশাসনিক অদক্ষতার মতো বাস্তব সমস্যাগুলি সামনে থাকে, তখন একজন জ্যোতিষীকে রাজনৈতিক ওএসডি করা মানুষের কাছে প্রায় অপমানজনক ঠেকে।
তবু ঘটনাটির মধ্যে এক ধরনের তামিলীয় নাটকীয়তা আছে। নিয়োগ, বিতর্ক, বিধানসভায় আক্রমণ, সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যঙ্গ, তারপর দ্রুত প্রত্যাহার— সব মিলিয়ে যেন একটি রাজনৈতিক ফার্স। শুধু পার্থক্য এই যে, এখানে সিনেমার পরিচালক নেই। আছে বাস্তব রাজনীতি, যেখানে কখনও কখনও কল্পনাও হার মেনে যায়।
এখন চেন্নাইয়ে অনেকে মজা করে বলছেন, ভেট্রিভেলের সবচেয়ে বড় ভবিষ্যদ্বাণী সম্ভবত নিজের চাকরির আয়ু নিয়েই ভুল হয়েছিল।