বাংলাস্ফিয়ারঃ নবান্নের করিডরে বহু বছর ধরে একটা অলিখিত নিয়ম চালু ছিল—কোনও বড় পুলিশকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হলে আগে দশবার ভাবতে হবে। বিশেষ করে তিনি যদি রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হন, যদি ক্ষমতার শীর্ষস্তরের কাছে গ্রহণযোগ্য হন, যদি তাঁর নাম নিয়ে প্রশাসনের ভিতরে চাপা ভয় কাজ করে। পশ্চিমবঙ্গের মানুষও ধীরে ধীরে এই বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছিলেন। তাঁদের ধারণা হয়েছিল, বড় পদে বসে থাকা মানুষদের বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত কিছুই হয় না। অভিযোগ ওঠে, বিতর্ক হয়, টেলিভিশনে উত্তপ্ত আলোচনা চলে, তারপর সব ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে যায়।

কিন্তু শুভেন্দু অধিকারী মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসার পর থেকে সেই পুরনো ছন্দটা যেন ভেঙে দিতে উঠেপড়ে লেগেছেন। তাঁর প্রশাসনিক স্টাইলের মধ্যে এমন এক ধরনের তাড়না রয়েছে, যা বাংলার মানুষ বহুদিন দেখেননি। তিনি সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন দ্রুত। অনেক সময় চমকে দেওয়ার মতো দ্রুত। আর ঠিক সেই কারণেই রাজনৈতিক মহলে এখন সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত তুলনাটা ক্রিকেট থেকে ধার করা—বীরেন্দ্র শেহবাগ।

শেহবাগ যেমন মাঠে নেমেই প্রথম বল থেকে বোলারকে চাপে ফেলে দিতেন, শুভেন্দুও যেন প্রশাসনের প্রথম সপ্তাহ থেকেই প্রতিপক্ষ, আমলাতন্ত্র এবং নিজের দলের মধ্যেকার সংশয়বাদীদের বুঝিয়ে দিতে চাইছেন যে তিনি সময় নষ্ট করতে আসেননি। তিনি ইনিংস “সেট” করার রাজনীতি করছেন না। তিনি আক্রমণাত্মক।

আর সেই ঝোড়ো ইনিংসের সবচেয়ে বড় শট নিঃসন্দেহে আর জি কর কাণ্ডে তিন পুলিশ কর্তা—বিনীত গোয়েল, ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় এবং অভিষেক গুপ্তকে সাসপেন্ড করার সিদ্ধান্ত।

এই পদক্ষেপের রাজনৈতিক অভিঘাত শুধুমাত্র প্রশাসনিক নয়; এটি প্রতীকী। কারণ আর জি কর কাণ্ড পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক ইতিহাসে শুধু একটি অপরাধের ঘটনা ছিল না। সেটি হয়ে উঠেছিল রাষ্ট্রীয় উদাসীনতা, তথ্য গোপন, প্রশাসনিক ধামাচাপা এবং ক্ষমতার উদ্ধত মানসিকতার এক ভয়ঙ্কর প্রতীক। কলকাতার রাস্তায় তখন ক্ষোভ জমেছিল। ডাক্তাররা আন্দোলনে নেমেছিলেন। সাধারণ মানুষ প্রশ্ন তুলেছিলেন—কেন এত অসঙ্গতি? কেন এত বিভ্রান্তি? কেন এত দেরি?

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল—কারা দায়ী?

সেই সময় বহু মানুষ মনে করেছিলেন, তদন্তের ফোকাস কখনওই উপরের স্তরে পৌঁছবে না। কারণ ভারতের প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে “চেইন অফ কমান্ড”-এর শীর্ষে থাকা মানুষদের প্রায়শই দায়মুক্তির অদৃশ্য সুরক্ষা দেওয়া হয়। নিচুতলার কর্মী বলির পাঁঠা হন, কিন্তু বড় মুখগুলো অক্ষত থাকে।

শুভেন্দু অধিকারী সেই সংস্কৃতির ওপর সরাসরি আঘাত করেছেন।

বিনীত গোয়েল কোনও সাধারণ অফিসার নন। প্রশাসনের ভিতরে তাঁর দীর্ঘ প্রভাব ছিল। ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় এবং অভিষেক গুপ্তও গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। এঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া মানে শুধু কয়েকজন অফিসারকে সাসপেন্ড করা নয়; এর অর্থ প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে একটি বার্তা দেওয়া—“পুরনো নিয়ম” বদলাচ্ছে।

রাজনীতিতে অনেক সময় বাস্তব পদক্ষেপের থেকেও তার প্রতীকী শক্তি বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। বাংলার বহু মানুষ, যারা দীর্ঘদিন ধরে মনে করছিলেন ক্ষমতাশালীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে, তারা হঠাৎ দেখলেন—অন্তত আপাতত—কেউ একজন সেই অদৃশ্য সুরক্ষাবলয় ভাঙার চেষ্টা করছেন।

শুভেন্দুর সমর্থকেরা বলছেন, এটাই তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি। তিনি জনরোষকে বুঝতে পারেন। এবং তিনি জানেন, আজকের রাজনৈতিক যুগে মানুষ শুধুমাত্র বক্তৃতা শুনতে চায় না; তারা “অ্যাকশন” দেখতে চায়।

এই জায়গাতেই তাঁর রাজনৈতিক ভাষা অন্যরকম। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশাসনের শেষ পর্যায়ে রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগগুলোর একটি ছিল—অতিরিক্ত প্রতিরক্ষামূলক মনোভাব। যে কোনও বিতর্কে সরকারের প্রথম প্রবৃত্তি হয়ে উঠেছিল অস্বীকার করা, বিরোধীদের আক্রমণ করা অথবা প্রশাসনিক দায় এড়িয়ে যাওয়া। শুভেন্দু সেই বিপরীত চিত্রটি নির্মাণ করতে চাইছেন। তিনি বোঝাতে চাইছেন, তাঁর সরকার অন্তত প্রাথমিকভাবে “অ্যাকশন-ওরিয়েন্টেড”।

তবে এই গল্পের আরেকটি স্তরও আছে।

কারণ দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া যেমন শক্তির লক্ষণ, তেমনই সেটি ঝুঁকিপূর্ণও। ক্রিকেটে শেহবাগের ব্যাটিং দর্শন রোমাঞ্চকর ছিল ঠিকই, কিন্তু তার মধ্যে বিপদের সম্ভাবনাও সবসময় থাকত। তিনি হয় ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতেন, নয়তো খুব দ্রুত আউট হয়ে যেতেন। শুভেন্দুর প্রশাসনিক স্টাইলও এখন সেই পরীক্ষার সামনে দাঁড়িয়ে।

কারণ মানুষ প্রথম কয়েকটি মাসে সাহসী সিদ্ধান্তে মুগ্ধ হয়। কিন্তু পরে তারা ফলাফল দেখতে চায়। সাসপেনশন হয়েছে—তারপর? তদন্ত কতদূর এগোবে? দায় নির্ধারণ হবে কীভাবে? বিচার প্রক্রিয়া কি সত্যিই নিরপেক্ষ হবে? নাকি এটিও শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক প্রতীকে সীমাবদ্ধ থাকবে?

এই প্রশ্নগুলির উত্তরই নির্ধারণ করবে শুভেন্দুর এই ঝোড়ো শুরু ইতিহাসে জায়গা পাবে, নাকি শুধুই রাজনৈতিক নাটকীয়তা হিসেবে মনে থাকবে।

তবু এটুকু অস্বীকার করার উপায় নেই যে বাংলার প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে এই সিদ্ধান্ত একটা মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন এনে দিয়েছে। নবান্ন, লালবাজার এবং রাজ্যের আমলাতান্ত্রিক মহলে এখন নতুন করে একটা শব্দ ঘুরছে—“অ্যাকাউন্টেবিলিটি”। শব্দটি বহুদিন পরে আবার প্রাসঙ্গিক হয়েছে।

আর সেখানেই শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক সাফল্য।

তিনি বুঝেছেন, পশ্চিমবঙ্গের মানুষ শুধুমাত্র সরকার পরিবর্তন চাননি; তারা আচরণের পরিবর্তনও চেয়েছিলেন। তাঁরা এমন এক প্রশাসনিক ভঙ্গি দেখতে চেয়েছিলেন, যেখানে ক্ষমতার কেন্দ্রে বসে থাকা মানুষদেরও প্রশ্ন করা যায়। যেখানে পুলিশ বা আমলা হওয়া মানে অদৃশ্য সুরক্ষা নয়।

শুভেন্দু সেই প্রত্যাশাকে রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করার চেষ্টা করছেন। কখনও তীব্র ভাষায়, কখনও নাটকীয় সিদ্ধান্তে, কখনও সরাসরি প্রশাসনিক পদক্ষেপে।

ক্রিকেটের ভাষায় বলতে গেলে, তিনি এখন “ফিয়ারলেস ক্রিকেট” খেলছেন।

আর বাংলার রাজনীতি বহুদিন পরে এমন একজন মুখ্যমন্ত্রী দেখছে, যিনি প্রথম দিন থেকেই ডিফেন্সিভ ব্যাটিং করতে রাজি নন।