Home সুমন নামা দিল্লি চায় তাই করবনা (১)

দিল্লি চায় তাই করবনা (১)

0 comments 9 views
A+A-
Reset

সুমন চট্টোপাধ‍্যায়: ( মমতা বন্দ‍্যোপাধ‍্যায়ের দেড় দশকের দীর্ঘ শাসনকালে দিল্লির সঙ্গে মতবিরোধ হোত প্রায় প্রতিটি বিষয়েই। এমন অসহযোগিতার নীতির কারণে পশ্চিমবঙ্গের প্রভূত ক্ষতি হয়েছে বিভিন্ন ক্ষেত্রে। সেই ক্ষতের পোস্ট-মর্টেম করার চেষ্টা হয়েছে এই দীর্ঘ প্রতিবেদনে। আজ প্রথম কিস্তি)

 

গঙ্গার পশ্চিম পাড়ের নবান্ন ভবনের করিডরে একসময় একটি কথা প্রায় প্রবাদে পরিণত হয়েছিল—“দিল্লি চাইছে, তাই করব না।” কথাটা সবসময় প্রকাশ্যে বলা হোতনা কিন্তু প্রশাসনিক আচরণের ভিতরে তার ছাপ ছিল স্পষ্ট। কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে সঙ্ঘাত ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয়  রাজনীতিতে নতুন কিছু নয়। কেরল, তামিলনাড়ু, পাঞ্জাব সব রাজ্যই কখনও না কখনও কেন্দ্রের সঙ্গে সঙ্ঘাতে জড়িয়েছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘ শাসনকালে সংঘাত ধীরে ধীরে এক ধরনের প্রশাসনিক দর্শনে পরিণত হয়েছিল। এমন এক দর্শন, যেখানে বিরোধিতা কখনও কখনও নীতিগত অবস্থানের সীমা ছাড়িয়ে গিয়ে প্রশাসনিক অসহযোগিতায় পৌঁছেছিল। আর সেই অসহযোগিতার সবচেয়ে বড় মূল্য দিয়েছে সাধারণ মানুষ।

 

এই কাহিনির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, পশ্চিমবঙ্গের বহু মানুষ দীর্ঘদিন ধরে বুঝতেই পারেননি যে রাজনৈতিক সঙ্ঘাত আর প্রশাসনিক বাধাদান এক জিনিস নয়। একটি গণতান্ত্রিক রাজ্যে মুখ্যমন্ত্রী কেন্দ্রের নীতির সমালোচনা করতেই পারেন। কিন্তু যখন সেই সমালোচনা বাস্তব উন্নয়ন প্রকল্প আটকে দেয়, তখন তার অভিঘাত পড়ে গ্রামে, সীমান্তে, হাসপাতালে, রাস্তার উপর, কর্মসংস্থানে। বলতে গেলে সর্বত্র।

 

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের বেড়া নির্মাণের প্রশ্নটি তার সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণগুলির একটি। পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ২,২০০ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে বাংলাদেশের সঙ্গে। এই সীমান্ত ভারতের সবচেয়ে সংবেদনশীল সীমান্তগুলির মধ্যে একটি। বছরের পর বছর ধরে অনুপ্রবেশ, গবাদি পশু পাচার, জাল নোট, মাদক চোরাচালান, এমনকি মানবপাচারের অভিযোগ উঠেছে এই অঞ্চলগুলি ঘিরে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক বহুবার জানিয়েছিল, সীমান্ত সুরক্ষার জন্য দ্রুত জমি হস্তান্তর প্রয়োজন। কিন্তু রাজ্য প্রশাসনের তরফে নানা পর্যায়ে আপত্তি, জমি অধিগ্রহণে ধীরগতি, স্থানীয় স্তরে ফাইল আটকে থাকা,এসব কারণে বহু অংশে কাঁটাতারের কাজ বছরের পর বছর ঝুলে ছিল। নতুন রাজ‍্য সরকার মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে জমি হস্তান্তর প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া আসলে ডবল ইঞ্জিন সরকারের প্রথম শুভ লক্ষণ।

 

সমস্যাটা শুধু জাতীয় নিরাপত্তার ছিল না। সীমান্ত অরক্ষিত থাকার অর্থ স্থানীয় সমাজের ক্রমাগত অপরাধীকরণ। উত্তর ২৪ পরগনা, নদিয়া, মালদা, মুর্শিদাবাদ এই অঞ্চলগুলিতে সীমান্ত-অর্থনীতি ধীরে ধীরে বৈধ অর্থনীতির জায়গা দখল করতে শুরু করেছিল। সীমান্তের গ্রামগুলিতে যুবকদের একাংশ কৃষিকাজ বা ছোট ব্যবসা ছেড়ে পাচারচক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছিল। স্কুলছুট বাড়ছিল। স্থানীয় পুলিশ ও প্রশাসনের একাংশের বিরুদ্ধে মদতের অভিযোগ উঠছিল। অর্থাৎ, একটি প্রশাসনিক গড়িমসি শেষ পর্যন্ত সীমান্ত অঞ্চলের সামাজিক কাঠামোকেই বদলে দিচ্ছিল।

 

কেন্দ্রীয় প্রকল্পগুলির ক্ষেত্রেও একই ধরনের এক অদ্ভুত দ্বৈততা দেখা গিয়েছিল। রাজ্য সরকার প্রায়শই বলত, কেন্দ্র পশ্চিমবঙ্গকে বঞ্চনা করছে। কিন্তু একই সঙ্গে বহু কেন্দ্রীয় প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেই অনীহা বা বাধা তৈরি হচ্ছিল। আয়ুষ্মান ভারত তার অন্যতম বড় উদাহরণ। দেশের বহু গরিব পরিবার যখন এই প্রকল্পের আওতায় বছরে পাঁচ লক্ষ টাকা পর্যন্ত স্বাস্থ্যবিমার সুবিধা পাচ্ছিল, তখন পশ্চিমবঙ্গ সরকার তা চালু করতে অস্বীকার করে। যুক্তি ছিল, রাজ্যের “স্বাস্থ্যসাথী” প্রকল্পই যথেষ্ট।

 

রাজনৈতিকভাবে যুক্তিটা আকর্ষণীয় শোনাতে পারে। কিন্তু বাস্তবে সমস্যাটা ছিল অন্য জায়গায়। আয়ুষ্মান ভারত একটি জাতীয় পোর্টেবিলিটি ব্যবস্থা তৈরি করেছিল। অর্থাৎ, বিহারের শ্রমিক দিল্লিতে চিকিৎসা করাতে পারছেন, ঝাড়খণ্ডের রোগী মুম্বইয়ে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের বহু পরিযায়ী শ্রমিক সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছিলেন। বিশেষ করে কোভিড-পরবর্তী সময়ে যখন বিপুল সংখ্যক বাঙালি শ্রমিক দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কাজ করতে যাচ্ছিলেন, তখন এই স্বাস্থ্য-অসামঞ্জস্য ভয়াবহ সমস্যার জন্ম দেয়। অসংখ্য পরিবারকে নিজের পকেট থেকে বিপুল টাকা খরচ করতে হয়েছে। অনেকেই চিকিৎসা মাঝপথে ছেড়ে দিয়েছেন।

 

একই ছবি দেখা গিয়েছিল প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার ক্ষেত্রেও। প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য ছিল গরিবদের পাকা বাড়ি তৈরি। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে বারবার অভিযোগ ওঠে যে প্রকৃত উপভোক্তাদের বাদ দিয়ে দলীয় ঘনিষ্ঠদের নাম তালিকাভুক্ত করা হচ্ছে। বহু জায়গায় কেন্দ্রীয় দল তদন্তে গিয়ে দেখতে পায়, যাদের ইতিমধ্যেই পাকা বাড়ি রয়েছে তারাও টাকা পেয়েছেন অথচ প্রকৃত গরিব বঞ্চিত। কেন্দ্র টাকা আটকে দেয়। রাজ্য বলে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চলছে। আর মাঝখানে পড়ে হাজার হাজার গ্রামীণ পরিবার আধা-তৈরি বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকে।

 

এই গল্পের একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক দিকও আছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনীতির ভিত গড়ে উঠেছিল “দিল্লির বিরুদ্ধে বাংলার লড়াই” এই আবেগের উপর। বামফ্রন্ট আমলে কেন্দ্রীয় অবহেলার ইতিহাস বাস্তব ছিল। শিল্প, পরিকাঠামো , বিনিয়োগ—সব ক্ষেত্রেই বাংলার ক্ষোভের ভিত্তি ছিল। মমতা সেই ঐতিহাসিক ক্ষোভকে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত করেছিলেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে “অধিকার আদায়” আর “অসহযোগিতা” এই দুটির মধ্যে সীমারেখা মুছে যেতে শুরু করে।

 

মানরেগা নিয়ে সংঘাত সেই পরিবর্তনের সবচেয়ে নাটকীয় অধ্যায়গুলির একটি। গ্রামীণ কর্মসংস্থানের এই প্রকল্প বহু দরিদ্র পরিবারের বেঁচে থাকার প্রধান ভরসা। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে ভুয়ো জব কার্ড, অস্তিত্বহীন কাজ, দলীয় নিয়ন্ত্রণ, কাটমানি, এসব নিয়ে অভিযোগ জমা হচ্ছিল। কেন্দ্র বারবার হিসেব চায়। অডিট চায়। রাজ্য অভিযোগ অস্বীকার করে। অবশেষে কেন্দ্র টাকা আটকে দেয়।

 

এখানে সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, দুর্নীতির দায় যাদের ছিল তারা নয়, ভুগেছে গ্রামের গরিব শ্রমিক। বীরভূম, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, জলপাইগুড়ির অসংখ্য পরিবার কয়েক মাস ধরে কাজের মজুরি পায়নি। অনেকেই ফের মহারাষ্ট্র, গুজরাত, কেরলে শ্রমিক হিসেবে চলে যেতে বাধ্য হয়। অর্থাৎ, কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত শেষ পর্যন্ত গ্রামীণ অর্থনীতির উপর সরাসরি আঘাত হয়ে নেমে আসে।

 

প্রধানমন্ত্রী গ্রাম সড়ক যোজনার ক্ষেত্রেও একই সমস্যা দেখা যায়। এই প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের বহু প্রত্যন্ত গ্রাম প্রথমবার পাকা রাস্তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে বহু প্রকল্প ধীরগতির শিকার হয়। কোথাও জমি সমস্যা, কোথাও ঠিকাদারি দুর্নীতি, কোথাও প্রশাসনিক শৈথিল্য। ফলত, বহু গ্রাম বর্ষাকালে কার্যত বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থেকে যায়। একটি রাস্তা না হওয়ার অর্থ শুধু যাতায়াতের অসুবিধা নয়। তার মানে গর্ভবতী মহিলাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে দেরি হওয়া, কৃষকের ফসল বাজারে পৌঁছতে না পারা, ছাত্রছাত্রীর স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যাওয়া।

 

একসময় পশ্চিমবঙ্গ নিজেকে ভারতের রাজনৈতিক বুদ্ধিবৃত্তির রাজধানী বলে ভাবত। সেই রাজ্যে প্রশাসনিক দক্ষতা নিয়ে গর্বেরও একটি ঐতিহ্য ছিল। ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে স্বাধীনতার প্রথম কয়েক দশক পর্যন্ত বাংলা ক্যাডারের আমলাদের সুনাম ছিল গোটা দেশে। কিন্তু মমতা আমলে প্রশাসনের ক্রমবর্ধমান দলীয়করণ সেই কাঠামোকে ক্রমাগত আঘাত করতে শুরু করে। বহু আমলা বুঝে গিয়েছিলেন, দিল্লির সঙ্গে সহযোগিতা দেখানো রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় যুক্তির বদলে রাজনৈতিক সঙ্কেত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

 

এই সংস্কৃতির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ভয়াবহ। কারণ একটি প্রশাসন যখন “সহযোগিতা না করাই নীতি” হিসেবে গ্রহণ করে, তখন তার দক্ষতা ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যায়। ফাইল এগোয় না, তথ্য জমা পড়ে না, প্রকল্পের অগ্রগতি থেমে থাকে। রাজনীতি শেষ পর্যন্ত আমলাতন্ত্রের ভিতরেও এক ধরনের নিষ্ক্রিয়তা তৈরি করে।

 

পশ্চিমবঙ্গের শিল্প ও বিনিয়োগ পরিবেশও এই মানসিকতার শিকার হয়েছিল। কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলির সঙ্গে সংঘাত, বারবার রাজনৈতিক উত্তেজনা, তদন্তকারী সংস্থার বিরুদ্ধে প্রকাশ্য যুদ্ধংদেহী অবস্থান, এসব মিলিয়ে বিনিয়োগকারীদের একাংশের কাছে বাংলার প্রশাসনিক পরিবেশ অনিশ্চিত হয়ে ওঠে। শিল্পপতিরা সাধারণত রাজনৈতিক মতাদর্শের চেয়ে স্থিতিশীলতা চান। তাঁরা জানতে চান, প্রকল্প শুরু হলে তা প্রশাসনিক সহযোগিতা পাবে কি না। বাংলার ক্ষেত্রে সেই আস্থার সঙ্কট ক্রমশ বাড়ছিল।

 

সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, এই অসহযোগিতার রাজনীতি প্রায়শই আত্মঘাতী হয়ে ওঠে। কারণ কেন্দ্রীয় প্রকল্পের টাকা শেষ পর্যন্ত “দিল্লির টাকা” নয়; সেটি ভারতীয় করদাতাদের টাকা, যার মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের মানুষও রয়েছেন। অর্থাৎ কেন্দ্রীয় প্রকল্প আটকে যাওয়া মানে বাংলার মানুষ নিজেদের প্রাপ্য সুবিধা থেকেই বঞ্চিত হচ্ছিলেন।

 

এই রাজনৈতিক সংস্কৃতির আরেকটি বিপজ্জনক দিক ছিল স্থায়ী সংঘাতের আবহ তৈরি করা। প্রশাসনের প্রায় প্রতিটি বিষয়—বিশ্ববিদ্যালয়, নির্বাচন কমিশন, রাজ্যপাল, কেন্দ্রীয় বাহিনী, তদন্তকারী সংস্থা—সবকিছুই রাজনৈতিক যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হচ্ছিল। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যেও ধীরে ধীরে একটি ক্লান্তি তৈরি হয়। তারা বুঝতে শুরু করে, ক্রমাগত সংঘাত উন্নয়নের বিকল্প নয়।

 

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিঃসন্দেহে এক অসাধারণ রাজনৈতিক সংগ্রামী। তিনি শূন্য থেকে উঠে এসে তিন দশকের বাম শাসন ভেঙেছিলেন। কিন্তু দীর্ঘ ক্ষমতা প্রায়শই নেতাদের একটি বিপজ্জনক বিশ্বাসে আচ্ছন্ন করে—রাষ্ট্র মানেই দল, আর দলের স্বার্থ মানেই রাজ্যের স্বার্থ। পশ্চিমবঙ্গে সেই বিভ্রান্তি ক্রমশ প্রকট হয়েছিল।

 

ফলে শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতার ছিল না। প্রশ্নটা ছিল রাজনৈতিক সংস্কৃতির। একটি রাজ্য কি শুধুই বিরোধিতার উপর দাঁড়িয়ে ভবিষ্যৎ গড়তে পারে? নাকি তাকে শেষ পর্যন্ত সহযোগিতা, সমন্বয় এবং বাস্তববাদী প্রশাসনের পথেই ফিরতে হয়?

 

পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক ইতিহাস সেই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে নির্মমভাবে। (চলবে)

 

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles