বাংলাস্ফিয়ারঃ পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই একটি অলিখিত নিয়ম চালু আছে—ক্ষমতা বদলালেই শুধু মন্ত্রী বদলায় না, বদলায় প্রশাসনিক নক্ষত্রমণ্ডলও। যে আমলা গতকাল পর্যন্ত ছিলেন “নিরপেক্ষ”, তিনি হঠাৎই নতুন সরকারের আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন। যে অফিসারকে আগে কেবল ফাইল-সই করা মানুষ বলে মনে হত, তিনি আচমকা রাজনৈতিক কাহিনির কেন্দ্রে উঠে আসেন। ফলে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর যখন ঘোষণা হল যে সুব্রত গুপ্ত মুখ্যমন্ত্রীর উপদেষ্টা হচ্ছেন, তখন অনেকে অবাক হলেও খুব বিস্মিত হননি। কিন্তু রাজ্য নির্বাচন কমিশনার মনোজ আগরওয়ালকে নতুন মুখ্যসচিব করার সম্ভাবনার খবর সামনে আসতেই বিষয়টি অন্য মাত্রা পেল। কারণ এখানে প্রশ্নটা কেবল প্রশাসনিক নয়; প্রশ্নটা গণতান্ত্রিক আস্থার।
ভারতের নির্বাচন ব্যবস্থা মূলত বিশ্বাসের উপর দাঁড়িয়ে। ভোটার বুথে যান এই ধারণা নিয়ে যে অন্তত ভোট গণনার মুহূর্ত পর্যন্ত রাষ্ট্র তাঁর সঙ্গে নিরপেক্ষ আচরণ করবে। রাজনৈতিক দলগুলি পরস্পরকে যতই দোষারোপ করুক, শেষ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের উপর এক ধরনের নৈতিক ঊর্ধ্বতা আরোপ করা হয়। কমিশনকে ভাবা হয় “রেফারি” হিসেবে। রেফারির সিদ্ধান্তে ভুল থাকতে পারে, সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে, কিন্তু তাঁর ব্যক্তিগত স্বার্থ থাকা চলবে না—এই ধারণাটাই গণতান্ত্রিক খেলার ভিত্তি।
সেই কারণেই নির্বাচন-পরবর্তী পুরস্কারের প্রশ্নটি এত সংবেদনশীল।
মনোজ আগরওয়াল যদি সত্যিই নির্বাচন কমিশনারের পদ থেকে সরে এসে নতুন সরকারের অধীনে মুখ্যসচিব হন, তাহলে অনেক সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন উঠবে—ভোটের সময় তিনি আদৌ সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ছিলেন তো? এই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। কারণ গণতন্ত্রে শুধু নিরপেক্ষ হওয়াই যথেষ্ট নয়; নিরপেক্ষ দেখানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ইংরেজিতে যাকে বলে appearance of neutrality। বিচারব্যবস্থায় যেমন বিচারপতির ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা ভবিষ্যৎ সুবিধা নিয়ে সামান্য সংশয়ও পুরো রায়ের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করে দিতে পারে, তেমনই নির্বাচনের ক্ষেত্রেও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পুরস্কারের সম্ভাবনা কমিশনের নৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করে দেয়।
এখানে একটি সূক্ষ্ম মনস্তত্ত্ব কাজ করে। সাধারণ ভোটার কখনও নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ নথি দেখেন না। তিনি জানেন না কোন ফাইলে কী সিদ্ধান্ত হয়েছে। তিনি কেবল ঘটনাগুলির ক্রম দেখেন। প্রথমে নির্বাচন। তারপর ক্ষমতার পালাবদল। তারপর গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক বা প্রশাসনিক পদে সেই ব্যক্তিদের নিয়োগ, যাঁরা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে ছিলেন। এই ধারাবাহিকতা থেকেই সন্দেহ জন্মায়। সন্দেহটি সত্য হোক বা না হোক, রাজনৈতিকভাবে সেটি অত্যন্ত শক্তিশালী।
আর এখানেই সমস্যার গভীরতা।
কারণ গণতন্ত্র শেষ পর্যন্ত কেবল প্রতিষ্ঠান দিয়ে টিকে থাকে না; টিকে থাকে প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের বিশ্বাস দিয়ে। মানুষ যদি মনে করতে শুরু করে যে নির্বাচন কমিশনার, রাজ্যপাল, পুলিশপ্রধান, তদন্তকারী সংস্থা—সবাই শেষ পর্যন্ত ভবিষ্যতের রাজনৈতিক পুরস্কারের দিকে তাকিয়ে কাজ করেন, তাহলে নির্বাচনের নৈতিক মর্যাদা ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যায়। তখন ভোট কেবল সংখ্যার লড়াই হয়ে দাঁড়ায়; প্রক্রিয়ার উপর আস্থা থাকে না।
পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাস এই সন্দেহকে আরও তীব্র করে তোলে। কারণ গত এক দশকে নির্বাচনকে ঘিরে অবিশ্বাস, হিংসা, প্রশাসনিক পক্ষপাত, কেন্দ্রীয় বাহিনীর ভূমিকা, ভোটার ভীতি প্রদর্শন—এসব নিয়ে লাগাতার বিতর্ক চলেছে। শাসকদল বিরোধীদের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনকে ব্যবহার করার অভিযোগ তুলেছে; বিরোধীরা আবার কমিশনকে শাসকদলের প্রতি নরম থাকার অভিযোগ করেছে। অর্থাৎ কমিশনের নিরপেক্ষতা বহুদিন ধরেই রাজনৈতিক যুদ্ধক্ষেত্রের অংশ।
এই প্রেক্ষাপটে নির্বাচন কমিশনারের দ্রুত প্রশাসনিক উন্নতি নিছক একটি ক্যারিয়ার মুভ হিসেবে দেখা কঠিন।
তবে অন্য দিকও আছে। প্রশাসনের ভিতরে দীর্ঘদিন কাজ করা অনেক আমলাই যুক্তি দেবেন যে দক্ষ অফিসারদের নতুন সরকার গুরুত্বপূর্ণ পদে আনতেই পারে। নতুন মুখ্যমন্ত্রী তাঁর বিশ্বাসভাজন এবং কার্যকর বলে মনে করা কাউকে মুখ্যসচিব করতে চাইতেই পারেন। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচিত সরকারের সেই অধিকার আছে। কোনও অফিসার নির্বাচন কমিশনে কাজ করেছেন বলেই তিনি পরবর্তী জীবনে আর কোনও সরকারি দায়িত্ব নিতে পারবেন না, এমন নিয়মও নেই।
সমস্যা তাই আইনের নয়; নীতির।
ভারতে “cooling-off period” নিয়ে বহুদিন ধরে আলোচনা চলছে। অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি, সেনা অফিসার, নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধান বা নির্বাচন কমিশনারদের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়ের আগে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক পুনর্নিয়োগ হওয়া উচিৎ কি না, তা নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। কারণ ক্ষমতার কেন্দ্রের খুব কাছে থাকা মানুষদের ভবিষ্যৎ নিয়োগ যদি অবিলম্বে রাজনৈতিক সরকারের হাতে নির্ভর করে, তাহলে তাঁদের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।
এই প্রশ্ন পশ্চিমবঙ্গে আরও স্পর্শকাতর কারণ রাজ্যের রাজনৈতিক সংস্কৃতি বরাবরই গভীরভাবে ব্যক্তিনির্ভর। এখানে প্রশাসনিক পদগুলি প্রায়ই রাজনৈতিক আনুগত্যের প্রতীক হয়ে ওঠে। ফলে মনোজ আগরওয়ালের সম্ভাব্য নিয়োগকে মানুষ নিছক “প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা” হিসেবে দেখবেন না; তাঁরা এর মধ্যে রাজনৈতিক বার্তা খুঁজবেন। বার্তাটি হবে—ক্ষমতা বদলেছে, এবং সেই বদলের সঙ্গে আমলাতন্ত্রের একটি অংশও নতুন শিবিরে স্থানান্তরিত হয়েছে।
এখানে আরও একটি মনস্তাত্ত্বিক মাত্রা রয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘ শাসনের সময়ে তৃণমূলের বিরোধীরা প্রায়শই অভিযোগ করত যে প্রশাসন দলীয় নিয়ন্ত্রণে চলে গিয়েছে। বিজেপি সেই অভিযোগকেই রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিল। এখন যদি নতুন সরকার ক্ষমতায় এসে একই ধরনের “বিশ্বাসভাজন আমলা”-কেন্দ্রিক প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলে, তাহলে তাদের নৈতিক উচ্চভূমি দ্রুত ক্ষয় হবে। কারণ তখন বিরোধীরা সহজেই বলতে পারবে—পরিবর্তন কেবল মুখের হয়েছে, সংস্কৃতির হয়নি।
এই কারণেই সুব্রত গুপ্ত বা মনোজ আগরওয়ালের মতো নামগুলি নিছক ব্যক্তিনিয়োগের খবর নয়। এগুলি আসলে রাষ্ট্র ও রাজনীতির সম্পর্কের সূচক। এগুলি বলে দেয়, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতার ধারণা আজ কতটা ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে।
আর সবচেয়ে বড় কথা, গণতন্ত্রে সন্দেহ নিজেই একটি রাজনৈতিক সত্য। মানুষ যদি বিশ্বাস করতে শুরু করে যে নির্বাচন পরিচালনাকারীরা ভবিষ্যতের পুরস্কারের আশায় কাজ করেন, তাহলে সেই বিশ্বাস গণতান্ত্রিক কাঠামোকে ভিতর থেকে ক্ষয় করে। এমনকি যদি বাস্তবে কোনও পক্ষপাত না-ও থেকে থাকে, তবু পরবর্তী নিয়োগের রাজনৈতিক অভিঘাত সেই ধারণাকে শক্তিশালী করে তোলে।
তাই এই প্রশ্ন তোলা অযৌক্তিক নয়। বরং গণতান্ত্রিক সমাজে এ ধরনের প্রশ্ন তোলাই স্বাভাবিক। কারণ সুস্থ গণতন্ত্রের লক্ষণ অন্ধ বিশ্বাস নয়; বরং ক্ষমতার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানের প্রতি নাগরিকের সতর্ক সংশয়।