বাংলাস্ফিয়ার: ২০০৬ সালে তৃণমূল কংগ্রেস যখন মাত্র ৩০টি আসন নিয়ে বিধানসভায় বসল, তখন অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক জীবন শেষ। পাঁচ বছর পরে তিনি ৩৪ বছরের বামশাসনের অবসান ঘটিয়ে মুখ্যমন্ত্রী হলেন। সেই ইতিহাসটা এখন তাঁর সমর্থকদের আশার মূল ভিত্তি। কিন্তু ইতিহাসের উপমা মাঝে মাঝে বিপজ্জনক হয়, কারণ পরিস্থিতি কখনো হুবহু পুনরাবৃত্তি হয় না। ২০০৬ থেকে ২০১১-এর সেই প্রত্যাবর্তনকে সম্ভব করেছিল তিনটি নির্দিষ্ট শর্ত। তিনটির একটিও এবার নেই।
প্রথম শর্ত ছিল একটি বড় আন্দোলন, একটি নৈতিক ইস্যু যা জনমানসে আগুন ধরাতে পারে। সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামে কৃষিজমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে এক অপ্রতিরোধ্য আখ্যান তৈরি করেছিল — রাষ্ট্র বনাম সাধারণ মানুষ। মমতা সেই আখ্যানের মুখ হয়ে উঠলেন। তাঁর ২৫ দিনের অনশন, পুলিশি বাধা, কৃষকদের পাশে দাঁড়ানো — এগুলো মিলিয়ে একটা রাজনৈতিক পরিচয় তৈরি হল যা বিশ্বাসযোগ্য ছিল, কারণ সেটা সরকারের বাইরে থেকে তৈরি। এবার মমতার সামনে সেরকম কোনো ইস্যু নেই। বরং উল্টোটা আছে — আরজি কর ও সন্দেশখালি তাঁর বিরুদ্ধে সেই একই আখ্যান তৈরি করেছে। রাষ্ট্র বনাম সাধারণ মানুষের গল্পে এবার তিনি রাষ্ট্রের ভূমিকায়।
দ্বিতীয় শর্ত ছিল বিরোধী দলের নিজস্ব পতন। বামফ্রন্ট ২০০৬-এ ২৩৫ আসন পেয়েছিল, কিন্তু সেই জয়ের মধ্যেই পতনের বীজ ছিল। ক্ষমতার অহংকার, জনবিচ্ছিন্নতা এবং সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের নৈতিক বিপর্যয় তাদের ভেতর থেকে ফাঁপা করে দিয়েছিল। মমতাকে খুব বেশি পরিশ্রম করতে হয়নি, প্রতিপক্ষ নিজেই ভেঙে পড়েছিল। বিজেপির ক্ষেত্রে এই সম্ভাবনা কতটুকু? দলটি এই মুহূর্তে কেন্দ্র ও রাজ্য দুজায়গাতেই ক্ষমতায়, তাদের সাংগঠনিক শক্তি অক্ষুণ্ণ এবং তাদের পেছনে আদর্শগত একটি একনিষ্ঠ ভোটার ভিত্তি আছে যা সহজে নড়ে না। বামফ্রন্টের মতো আদর্শগত শূন্যতায় ভুগছে না তারা। শাসনে ব্যর্থতা আসতে পারে, কিন্তু বামফ্রন্টের মতো নৈতিক পতন ঘটবে কি না সেটা নিশ্চিত নয়।
তৃতীয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ছিল মমতার নিজের ভাবমূর্তির বিশ্বাসযোগ্যতা। ২০০৬-এ তিনি ছিলেন বাইরের মানুষ — ক্ষমতার বলয়ের বাইরে, দুর্নীতির অভিযোগের বাইরে, প্রতিষ্ঠানের বাইরে। সেই অবস্থান থেকে প্রতিবাদের ভাষা স্বাভাবিকভাবে বিশ্বাসযোগ্য হয়। এবার তিনি ১৫ বছরের শাসকদলের প্রধান। পার্থ চট্টোপাধ্যায়, জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক, শাহজাহান শেখ — এই নামগুলো তাঁর শাসনের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। তিনি এখন আর বাইরের মানুষ নন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বললে প্রশ্ন উঠবে — ১৫ বছর কোথায় ছিলেন? ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কথা বললে প্রশ্ন উঠবে — সিন্ডিকেট রাজ কে তৈরি করেছিল? এই প্রশ্নগুলোর কোনো সহজ উত্তর নেই।
কিন্তু পুরনো শর্তগুলো অনুপস্থিত থাকাটাই যদি একমাত্র সমস্যা হত, তাহলে হয়তো বলা যেত — পরিস্থিতি বদলাতে পারে, নতুন শর্ত তৈরি হতে পারে। আসল সমস্যা আরও গভীরে। এবার কিছু নতুন বাস্তবতা যোগ হয়েছে যেগুলো মমতার পক্ষে মোকাবিলা করা কার্যত অসম্ভব।
প্রথমটা হল প্রশাসনিক কাঠামোর সম্পূর্ণ হাতবদল। ২০০৬-এ বামফ্রন্ট রাজ্যে ছিল, কিন্তু কেন্দ্রে ছিল ইউপিএ। মমতা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ছিলেন, দিল্লিতে তাঁর একটা স্বাধীন অবস্থান ছিল। এবার কেন্দ্র ও রাজ্য দুজায়গাতেই বিজেপি। পুলিশ প্রশাসন বদলাবে, পঞ্চায়েত বদলাবে, সরকারি চুক্তি ও পৃষ্ঠপোষকতার নেটওয়ার্ক বদলাবে। তৃণমূলের সাংগঠনিক শক্তির বড় অংশ রাষ্ট্রযন্ত্রের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল। সেই যন্ত্রটা এখন প্রতিপক্ষের হাতে। বুথস্তরের কর্মীরা যারা দলের পতাকা ধরে রেখেছিলেন ভয়ে বা সুবিধার আশায়, তারা এখন অন্য হিসাব কষবেন।
দ্বিতীয় নতুন বাস্তবতা হল দলের ভেতরের কাঠামোগত শূন্যতা। তৃণমূল কংগ্রেস গণতান্ত্রিক অর্থে কোনো দল নয়, এটি একজন নেত্রীর ব্যক্তিগত যন্ত্র। ক্যাডার নেই, আদর্শ নেই, অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র নেই। বামফ্রন্ট ক্ষমতা হারিয়েও বছরের পর বছর টিকে ছিল কারণ দলটির একটি মতাদর্শগত ভিত্তি এবং ক্যাডার কাঠামো ছিল। তৃণমূলের সেটা নেই। মমতা থাকলে দল থাকে, মমতা না থাকলে দল থাকে না। আর মমতার পরে কে? অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলের বাইরে কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই এবং পরিবারতন্ত্রের অভিযোগ এমনিতেই তৃণমূলের গায়ে লেগে আছে।
তৃতীয় এবং সবচেয়ে নির্ণায়ক বাস্তবতা হল মেরুকরণের স্থায়িত্ব। ২০১১-এ মমতা জিতেছিলেন হিন্দু-মুসলমান উভয় ভোটারের সমর্থন নিয়ে। ধর্মনিরপেক্ষতার একটা সামাজিক ভিত্তি তখনও বাংলায় ছিল যেটা তাঁর রাজনীতিকে ধারণ করত। বিজেপি গত দশ বছর ধরে সেই ভিত্তিটাকে ক্রমাগত ক্ষয় করেছে। ২০২৬-এ সফলভাবে জাতপাতের বিভাজন পেরিয়ে হিন্দু ভোটকে একত্রিত করতে পেরেছে। এই মেরুকরণ একবার গেঁথে গেলে সহজে সরে না। তৃণমূলের যদি হিন্দু ভোট না থাকে আর মুসলমান ভোটের উপর নির্ভর করতে হয়, তাহলে বিজেপির সেই মেরুকরণের আখ্যান আরও শক্তিশালী হবে — একটি দুষ্টচক্র তৈরি হবে যা থেকে বেরোনো কার্যত অসম্ভব।
এই তিনটি নতুন বাস্তবতার মুখে দাঁড়িয়ে মমতা বলছেন তিনি লড়াই করবেন। সেটা তাঁর স্বভাব, এবং সেটা তাঁর কর্তব্যও বটে — দলকে ধরে রাখতে, কর্মীদের মনোবল বাঁচাতে। কিন্তু লড়াইয়ের ঘোষণা আর জয়ের সম্ভাবনা এক নয়। বাংলার মাটিতে তৃণমূলের প্রকৃত পুনর্গঠনের জন্য যা দরকার — বিশ্বাসযোগ্য ভাবমূর্তি, কাঠামোগত সংগঠন, নতুন আখ্যান এবং একটি অনুকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতি — এর কোনোটাই এই মুহূর্তে তাঁর হাতে নেই। এবং এই ঘাটতিগুলো পরিস্থিতিগত নয়, কাঠামোগত। পরিস্থিতি পাল্টায়, কাঠামো পাল্টাতে অনেক বেশি সময় লাগে — সেই সময়টা মমতার কাছে আছে কি না, সেটাই আসল প্রশ্ন।​​​​​​​​​​​​​​​​