Home খবর ডায়মন্ড হার্বার মডেলে কামান দাগল কমিশন

ডায়মন্ড হার্বার মডেলে কামান দাগল কমিশন

0 comments 5 views
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: নির্বাচন কমিশনের শনিবারের নির্দেশটি নিছক একটি প্রশাসনিক আদেশ নয় — এটি একটি কঠোর সত্যের স্বীকৃতি। ডায়মন্ড হার্বারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সন্দীপ গড়াই, এসডিপিও সাজাল মণ্ডল, ডায়মন্ড হার্বার থানার ওসি মৌসম চক্রবর্তী, ফলতা থানার ওসি অজয় বাগ এবং উস্তি থানার ওসি শুভেচ্ছা বাগকে “গুরুতর অসদাচরণ এবং নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে ব্যর্থতা”র অভিযোগে বরখাস্ত করার নির্দেশ দিয়েছে কমিশন। একইসঙ্গে পুলিশ সুপার ইশানী পালকে সতর্ক করা হয়েছে অধীনস্থদের মধ্যে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে না পারার জন্য। একটি গোটা জেলার পুলিশ কাঠামো — শীর্ষ থেকে থানার ওসি স্তর পর্যন্ত — একযোগে এই ব্যবস্থার মুখে পড়েছে। এটি বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিগত বিচ্যুতি নয়, এটি একটি সম্পূর্ণ প্রশাসনিক সংস্কৃতির উন্মোচন।

আর সেই সংস্কৃতির কেন্দ্রে যে নামটি, তিনি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক, মুখ্যমন্ত্রীর ভাইপো এবং ডায়মন্ড হার্বার লোকসভা কেন্দ্রের তিনবারের সাংসদ। যে রাজনৈতিক মডেলের জন্ম তাঁর এই কেন্দ্রে, তা আজ “ডায়মন্ড হার্বার মডেল” নামে পরিচিত — এবং শনিবারের ঘটনা সেই মডেলের মেরুদণ্ডটিকে আরও স্পষ্ট করে দিয়েছে।

সংখ্যার আড়ালে অন্য গল্প

২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে ডায়মন্ড হার্বারের মায়াপুরের ১২৬ নম্বর বুথে মোট ১,০৪৭টি ভোট পড়েছিল। তার মধ্যে ১,০৪৬টি গিয়েছিল অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষে, মাত্র একটি অন্যত্র। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ওই নির্বাচনে আরও আটটি বুথে তিনি ৯৯ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছিলেন, ১৭৮টি বুথে ৯০ শতাংশের বেশি এবং ৫২৭টি বুথে তৃণমূলের ভোট শেয়ার ৭৫ শতাংশ ছাড়িয়ে গিয়েছিল। ২০২৪ সালে তৃতীয়বার জয়ী হন অভিষেক, পান ৭ লক্ষ ১০ হাজার ৯৩০ ভোট।

সমর্থকরা বলেন এটি উন্নয়নের ফসল। তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী কুণাল ঘোষের ব্যাখ্যা, ডায়মন্ড হার্বার মডেল মানে ধারাবাহিক উন্নয়ন এবং সমস্ত সরকারি পরিষেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া। কিন্তু যাঁরা সেখানে থাকেন বা থাকতেন, তাঁরা অন্য গল্প বলেন।

তাপস হালদার নামে এক কাপড় ব্যবসায়ী দীর্ঘদিন ডায়মন্ড হার্বারে থাকার পর ক্রমশ অস্বস্তি বোধ করতে শুরু করেন। তাঁর কথায়, “বাইরের লোকেরা বুঝতে পারবেন না এখানে কী হচ্ছে। এমন কোনো স্পষ্ট অন্যায় নেই যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা যায়।” শেষপর্যন্ত তিনি পরিবারের নিরাপত্তার কথা ভেবে সোনারপুরে ঘর ভাড়া নিয়ে তাদের সেখানে পাঠিয়ে দিয়েছেন।

উর্দি পরা আনুগত্য

ডায়মন্ড হার্বার মডেলের প্রকৃত কাঠামো বুঝতে হলে পুলিশের ভূমিকাটিকে কেন্দ্রে রাখতে হবে। অভিযোগ অনুযায়ী, এই মডেলে পুলিশ রাষ্ট্রের নিরপেক্ষ প্রতিনিধি নয়—বরং শাসকদলের স্থানীয় শাখার সম্প্রসারণ হিসেবে কাজ করে। বিরোধী নেতা ও কর্মীদের দাবি, পুলিশ এখানে সর্বদা বিরোধীদের বিরুদ্ধে মামলা করতে প্রস্তুত থাকে, বিশেষত নির্বাচনের আগে। যে থানার ওসিরা এখন বরখাস্ত হলেন—ফলতা, উস্তি, ডায়মন্ড হার্বার—তাঁরা প্রত্যেকেই সেই ভৌগোলিক এলাকার দায়িত্বে ছিলেন যেখানে অভিষেকের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ সবচেয়ে গভীর।

এই নিয়ন্ত্রণ কাজ করে দুটি পথে। প্রথমত, ভয় তৈরির মাধ্যমে। দ্য ওয়্যার-এর এক সাংবাদিক ডায়মন্ড হার্বারে রিপোর্টিং করতে গিয়ে দেখেন, একজন নারকেল বিক্রেতা তাঁকে সাংবাদিক হিসেবে চিনতে পেরেই ফোন করে দেন কাউকে। কয়েক মিনিটের মধ্যে তিনটি মোটরসাইকেলে লোক এসে হাজির। এই নজরদারি নেটওয়ার্ক পুলিশ ও দলীয় কর্মীদের মিলিত উপস্থিতিতে সচল থাকে। বিরোধীরা বুথে এজেন্ট দিতে পারেন না, কারণ তাঁরা জানেন থানা তাঁদের পাশে নেই। প্রিসাইডিং অফিসাররা জানেন কার সামনে মাথা নত করতে হবে, কারণ বদলির ভয় সর্বদা মাথার উপর ঝুলছে।

দ্বিতীয়ত, কাজ করে নীরব সম্মতির বাতাবরণ। ওই সাংবাদিককে একের পর এক প্রশ্ন করা হয়, পরিচয়পত্র চাওয়া হয় এবং বলা হয় “সাংবাদিকতার নামে হয়রানি করলে পুলিশ গ্রেফতার করতে পারে।” আশপাশে অনেক মানুষ দাঁড়িয়ে ছিলেন, কিন্তু কেউ একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি। এই নীরবতাই মডেলের সবচেয়ে বড় সাফল্য — যখন ভয় এতটাই স্বাভাবিক হয়ে যায় যে প্রতিবাদের ভাষাটুকুও মুছে যায়।

রেশন থেকে রায়, সবই দলের হাতে

পুলিশের বাইরে ব্লক ও পঞ্চায়েত প্রশাসনও এই মডেলের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সরকারি প্রকল্পের সুবিধা — আবাস যোজনা থেকে রেশন পর্যন্ত — বণ্টনের নিয়ন্ত্রণ যখন দলীয় কর্মীদের হাতে থাকে এবং প্রশাসনিক আধিকারিকরা সেই প্রক্রিয়ায় নীরব দর্শক হয়ে বসে থাকেন, তখন ভোটারের কাছে একটাই বার্তা পৌঁছায় — এই দলকে ভোট না দিলে পরের বার সুবিধা মিলবে না। এই কল্যাণ-নির্ভর আনুগত্য তৈরি করতে অনুগত প্রশাসন অপরিহার্য।

নির্বাচন কমিশন এই পদক্ষেপের মাধ্যমে স্পষ্ট বার্তা দিতে চেয়েছে যে সংবেদনশীল কেন্দ্রে নিরপেক্ষতার লঙ্ঘন সহ্য করা হবে না। কিন্তু এই পদক্ষেপের একটি কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা আছে। পাঁচজন আধিকারিক বরখাস্ত হলেই ডায়মন্ড হার্বার মডেলের অবসান ঘটে না। কারণ মডেলটি কোনো ব্যক্তির উপর নির্ভরশীল নয়, এটি একটি রাজনৈতিক-প্রশাসনিক সংস্কৃতির উপর দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে আধিকারিকরা শিখে নিয়েছেন যে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকাটাই কর্মজীবনের সবচেয়ে নিরাপদ পথ।

বরখাস্ত আধিকারিকদের জায়গায় নতুন কেউ আসবেন। প্রশ্ন হলো, তাঁরা কি নিরপেক্ষতার শিক্ষা নেবেন, নাকি পরের বার আরও সতর্কতার সঙ্গে পক্ষপাত করার কৌশল খুঁজবেন?

উপসংহার: একটি আয়নার কথা

ডায়মন্ড হার্বার মডেলের আসল বিপদ হলো এটি শুধু একটি কেন্দ্রের সমস্যা নয়। এটি একটি ‘টেমপ্লেট’, যা বাংলার অন্যান্য জেলাতেও বিভিন্ন রূপে অনুসরণ করা হচ্ছে। বিরোধী পক্ষের এক কর্মীর মতে, এখানকার রাজনৈতিক নেতারা যেন প্রত্যেকেই সন্দেশখালির সেই শেখ শাহজাহানের প্রতিচ্ছবি, যিনি রেশন কেলেঙ্কারিতে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন এবং যাঁর বিরুদ্ধে মাফিয়া রাজ চালানোর অভিযোগ ছিল।

নির্বাচন কমিশন এই ব্যবস্থার আয়নায় একটি ফাটল ধরিয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেই কাঠামোটি এখনও অমলিন রয়ে গিয়েছে।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles