Table of Contents
বাংলাস্ফিয়ার: মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের উত্তপ্ত আবহে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে নতুন করে শান্তি আলোচনার সম্ভাবনা নিয়ে বিশ্বজুড়ে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিনের বৈরিতা কাটিয়ে দুই দেশ কি কোনো স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছাতে পারবে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে কূটনৈতিক বিশ্লেষক ও সংশ্লিষ্ট মহল একটি মৌলিক সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে—আর তা হলো ‘গভীর অবিশ্বাস’। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের নেতৃত্বের মধ্যে পারমাণবিক প্রযুক্তি, আঞ্চলিক প্রভাব কিংবা হরমুজ প্রণালীর (Strait of Hormuz) নিরাপত্তা নিয়ে চরম মতভেদ থাকলেও, শান্তি প্রক্রিয়ার প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে একে অপরের প্রতি আস্থার অভাব।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও জেসিপিওএ (JCPOA) বিতর্ক
ইরান দীর্ঘদিন ধরেই আমেরিকাকে সন্দেহের চোখে দেখে আসছে, তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষেত্রে এই অবিশ্বাস আরও প্রকট। এর মূল কারণ ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে নেওয়া একটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত। বারাক ওবামার আমলে দীর্ঘ দুই বছরের আলোচনার পর স্বাক্ষরিত ‘জয়েন্ট কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন’ (JCPOA) বা পারমাণবিক চুক্তি থেকে ট্রাম্প একতরফাভাবে বেরিয়ে যান।
উক্ত চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করতে রাজি হয়েছিল এবং বিনিময়ে পশ্চিমা বিশ্ব তাদের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। ট্রাম্প যখন এই চুক্তি বাতিল করেন, তখন তিনি একবারও বলেননি যে ইরান চুক্তি লঙ্ঘন করেছে; বরং তাঁর মূল আপত্তি ছিল চুক্তির কাঠামোগত দুর্বলতা নিয়ে। এই ঘটনা ইরানের মনে স্থায়ী ক্ষতের সৃষ্টি করেছে।
নিশ্চয়তার অভাব ও সামরিক পদক্ষেপ
জো বাইডেন প্রশাসন যখন এই চুক্তি পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নেয়, তখন ইরান একটি কঠিন শর্ত জুড়ে দেয়—ভবিষ্যতে কোনো মার্কিন প্রশাসন যেন পুনরায় এই চুক্তি ভেঙে না দেয়, তার আইনি নিশ্চয়তা দিতে হবে। কিন্তু মার্কিন রাজনৈতিক কাঠামোর কারণে ওয়াশিংটনের পক্ষে এমন দীর্ঘমেয়াদী গ্যারান্টি দেওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে সন্দেহের বীজ থেকেই যায়।
গত এক বছরে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়েছে। বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসনের দ্বিমুখী নীতি ইরানকে ক্ষুব্ধ করেছে। গত ফেব্রুয়ারির শেষে যখন জেনেভায় কূটনৈতিক বৈঠকের প্রস্তুতি চূড়ান্ত পর্যায়ে, ঠিক তার আগের দিনই ইরানের সর্বোচ্চ নেতার ওপর বিমান হামলা চালানো হয়। এর পরপরই শুরু হয় আমেরিকা ও ইজরায়েলের সম্মিলিত বোমাবর্ষণ। ইরানের দাবি, আলোচনার টেবিল সাজিয়ে আড়ালে যুদ্ধের নীল নকশা তৈরি করেছিল ট্রাম্প প্রশাসন। এটি তেহরানের কাছে পরিষ্কার বার্তা পৌঁছে দেয় যে আলোচনা চললেও সামরিক হামলার হুমকি কাটেনি।
জেডি ভ্যান্সের পাকিস্তান সফর ও ইরানের অবস্থান
সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স (JD Vance) দ্বিতীয় দফার আলোচনার জন্য পাকিস্তানে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে ইরান এবারও সতর্ক। দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ফোনালাপে সরাসরি অভিযোগ করেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র আবারও কূটনীতিকে নস্যাৎ করার চেষ্টা করছে।
ইরান এখন ‘ধীর ও ধাপভিত্তিক’ (Step-by-step) কৌশলে এগোতে চায়। তারা তাদের ইউরেনিয়াম ভাণ্ডারের ওপর আংশিক নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে বদ্ধপরিকর, যাতে দরকষাকষির ক্ষমতা হারিয়ে না যায়। কারণ, উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তর বা ধ্বংস করা একটি অপরিবর্তনীয় প্রক্রিয়া, যা একবার করলে আর ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়।
দুই পক্ষের পাল্টা অভিযোগ ও ইজরায়েল ফ্যাক্টর
অবিশ্বাস কেবল ইরানের দিক থেকে নয়, আমেরিকার পক্ষ থেকেও সমান। ওয়াশিংটনের দাবি, ইরান বছরের পর বছর ধরে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিশ্বকে বিভ্রান্ত করেছে। গোপনে স্থাপনা নির্মাণ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাকে ভুল তথ্য দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তেহরানের বিরুদ্ধে।
এই জটিল সমীকরণের আগুনে ঘি ঢালছে ইজরায়েলের ভূমিকা। ইজরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়া মাত্রই পুনরায় সামরিক অভিযান শুরু করতে মুখিয়ে আছেন। ইরানের আশঙ্কা, ট্রাম্প হয়তো নেতানিয়াহুর প্রভাবেই কূটনীতি ত্যাগ করে আবারও যুদ্ধের পথে হাঁটবেন। এমনকি ইরানের সংবাদমাধ্যমগুলোতে ট্রাম্পকে নেতানিয়াহুর ‘পুতুল’ হিসেবেও চিত্রায়িত করা হচ্ছে।
চুক্তির অসম প্রকৃতি ও বর্তমান বাস্তবতা
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের বড় মাপের চুক্তি সম্পন্ন হওয়া অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ। ট্রাম্প অতীতে আফগান তালেবানের সঙ্গে চুক্তি করলেও ইরানের বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে প্রধান সমস্যা হলো ‘ছাড় দেওয়ার ভারসাম্যহীনতা’।
-
ইরানের ছাড়: ইউরেনিয়াম মজুত কমানো বা পারমাণবিক কেন্দ্র বন্ধ করা—যা স্থায়ী এবং সহজে ফেরানো যায় না।
-
আমেরিকার ছাড়: নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার বা আটকে থাকা অর্থ (Frozen Assets) ছাড় দেওয়া—যা মার্কিন প্রেসিডেন্ট একটি কলমের খোঁচায় আবারও কার্যকর করতে পারেন।
এই বৈষম্যই ইরানকে যেকোনো তড়িঘড়ি চুক্তিতে সই করা থেকে বিরত রাখছে। অন্যদিকে, ট্রাম্পের দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা এবং ধৈর্যের অভাব এই দীর্ঘমেয়াদী কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে।
উপসংহার:
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই গভীর অবিশ্বাস ও ঐতিহাসিক তিক্ততা নিয়ে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে কোনো বড় সাফল্য আসা প্রায় অসম্ভব। অতীতের পারমাণবিক চুক্তি ভেঙে দেওয়ার স্মৃতি আজও তেহরানের প্রতিটি সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে। দীর্ঘদিনের শত্রুতা মিটিয়ে স্থায়ী সমাধানে পৌঁছাতে হলে কেবল আলোচনা নয়, বরং প্রতিটি ধাপে বিশ্বাসযোগ্যতা প্রমাণের মাধ্যমেই এগোতে হবে যা বর্তমান পরিস্থিতিতে অত্যন্ত কঠিন এক চ্যালেঞ্জ।