Table of Contents
বাংলাস্ফিয়ার: ভারতের জাতীয় চম্বল ঘড়িয়াল অভয়ারণ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অবৈধ বালি খননের বিরুদ্ধে অবশেষে কঠোর পদক্ষেপ নিল দেশের সর্বোচ্চ আদালত। সুপ্রিম কোর্ট পরিস্থিতিকে “পরিবেশগত সংকট” বলে চিহ্নিত করেছে এবং বলেছে এই খনন অভয়ারণ্যের সূক্ষ্ম বাস্তুতন্ত্রে “ধ্বংসযজ্ঞ” চালাচ্ছে। এই রায় শুধু একটি বিচারিক নির্দেশনাই নয়, ভারতের পরিবেশ সংরক্ষণের ইতিহাসে এটি একটি মাইলফলক।
অভয়ারণ্য ও ঘড়িয়াল
জাতীয় চম্বল অভয়ারণ্য রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ ও উত্তরপ্রদেশের সংযোগস্থলে চম্বল নদীর তীরে অবস্থিত। পাঁচ হাজার চারশো বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত এই তিন রাজ্যের যৌথ সংরক্ষিত এলাকায় বিপন্ন ঘড়িয়াল ছাড়াও রয়েছে লাল-মুকুটযুক্ত ছাদযুক্ত কচ্ছপ এবং গাঙ্গেয় ডলফিন।
ঘড়িয়াল একটি সমালোচনামূলকভাবে বিপন্ন কুমির প্রজাতি, যার লম্বা ও সরু মুখাবয়ব মাছ ধরার জন্য বিবর্তিত হয়েছে। “ঘড়িয়াল” নামটি এসেছে হিন্দি শব্দ “ঘড়া” থেকে, যা পুরুষ ঘড়িয়ালের মুখের ডগায় থাকা গোলাকার বৃদ্ধিকে বোঝায়। চম্বল নদী উত্তর ভারতের অন্যতম অপেক্ষাকৃত মুক্তভাবে প্রবাহমান নদী এবং বিশ্বে ঘড়িয়ালের বৃহত্তম টিকে থাকা জনগোষ্ঠীর আবাসস্থল। IUCN এদের “সমালোচনামূলকভাবে বিপন্ন” (Critically Endangered) হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে।
জাতীয় চম্বল অভয়ারণ্য বিশ্বের মোট ঘড়িয়াল জনগোষ্ঠীর প্রায় ৮০ শতাংশ ধারণ করে। সাম্প্রতিক জরিপে ২০২৪-২৫ সালে এই অভয়ারণ্যে প্রায় দুই হাজার থেকে দুই হাজার একশোটি ঘড়িয়াল নথিভুক্ত হয়েছে, যা পদ্ধতিগত পর্যবেক্ষণ শুরুর পর থেকে সর্বোচ্চ। ২০২৫ সালেই জরিপ দলগুলো প্রায় এক হাজার একশো ছিয়াশিটি ঘড়িয়াল-শাবক নথিভুক্ত করেছে।
তবে এই ইতিবাচক সংখ্যার আড়ালেও বিপদ ঘনিয়ে আসছে। মোট প্রাপ্তবয়স্ক ঘড়িয়ালের সংখ্যা এখনও এক হাজারেরও কম বলে অনুমান করা হচ্ছে। এমনকি বাঘও ভারতে ঘড়িয়ালের মতো এতটা বিপন্ন নয়।
পতন ও পুনরুদ্ধারের ইতিহাস
বন্যপ্রাণী ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া ও IUCN-এর তথ্য অনুযায়ী, ১৯৪০-এর দশকে আনুমানিক পাঁচ হাজার থেকে দশ হাজার ঘড়িয়াল ছিল। ১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝিতে সেই সংখ্যা দু’শোরও নিচে নেমে আসে। শিকার, নদী পরিবর্তন, মৎস্যজীবীদের চাপ এবং বালি খনন এই বিপর্যয়ের মূল কারণ।
১৯৭৫ সালে ভারত সরকার জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির সহায়তায় “প্রজেক্ট ক্রোকোডাইল” চালু করে। এই কর্মসূচির আওতায় চার দশকেরও বেশি সময়ে ভারতের বারোটিরও বেশি নদীতে পাঁচ হাজারেরও বেশি ঘড়িয়াল ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে চম্বল ও গিরওয়া নদীতে সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি।
বালি খননে বিপন্ন ঘড়িয়ালের বাসস্থান
সুপ্রিম কোর্ট পর্যবেক্ষণ করেছে যে অবৈধ বালি খনন নদীর তলদেশ ক্ষয়, ভূগর্ভস্থ জলের হ্রাস, বন্যার ঝুঁকি বৃদ্ধি এবং জলজ জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের মতো সুদূরপ্রসারী পরিণতি বহন করছে। আদালত পরিবেশ সুরক্ষাকে সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদের অধীনে জীবনের অধিকারের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে পুনরায় নিশ্চিত করেছে।
অননুমোদিত বালি খনন ঘড়িয়ালদের বাসা বাঁধা ও প্রজননের জন্য অপরিহার্য নদীপ্রান্তের বাস্তুতন্ত্রকে ক্রমশ ধ্বংস করছে। চম্বল ও সোন নদী বরাবর সংরক্ষিত অঞ্চলেও ঘড়িয়াররা তাদের বাসা বাঁধার জায়গার বড় অংশ হারিয়েছে।
গবেষণা বলছে, ঘড়িয়ালরা বাসস্থান হিসেবে বালিযুক্ত নদীর তলদেশ বেছে নেয়। অর্থাৎ বালি খনন সরাসরি ঘড়িয়ালের সবচেয়ে পছন্দের বাসস্থান ধ্বংস করছে।
আদালতের হস্তক্ষেপ
১৩ মার্চ গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আদালত স্বপ্রণোদিতভাবে বিষয়টি আমলে নেয়। ১৩ এপ্রিল মধ্যপ্রদেশ ও রাজস্থানকে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করে আদালত এবং বালি মাফিয়া দমনে রাজ্য প্রশাসনের ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
বিচারপতি বিক্রম নাথ ও সন্দীপ মেহতার বেঞ্চ তিন রাজ্যকে অবৈধ খননে ব্যবহৃত সব রুটে সিসিটিভি ক্যামেরা বসানোর নির্দেশ দেয়। ক্যামেরার লাইভ ফিড সংশ্লিষ্ট জেলার পুলিশ সুপারিন্টেন্ডেন্টের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বলা হয়েছে।
আদালতের নির্দেশাবলি
আদালতের নির্দেশে রয়েছে — উঁচু মাস্তুলে সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো, প্রতিটি সংলগ্ন জেলায় কন্ট্রোল রুম স্থাপন, জিপিএস ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় নজরদারি, অবৈধ খননের ঘটনায় তাৎক্ষণিক আইনি ব্যবস্থা, জড়িত যানবাহন ও যন্ত্রপাতি বাজেয়াপ্ত এবং সংশ্লিষ্ট সকলের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা।
রাজ্যগুলো ব্যর্থ হলে চম্বলে বালি খননে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা এবং আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েনের হুঁশিয়ারি দিয়েছে আদালত।
রাজ্য প্রশাসনের ব্যর্থতা
সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, পরিস্থিতি রাজ্য কর্তৃপক্ষের “পদ্ধতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা”র প্রমাণ। আদালতের ভাষায়, রাজ্য প্রশাসন মাইনিং মাফিয়া সামলানোর ক্ষমতা রাখে, কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে নিষ্ক্রিয় থেকেছে।
এর আগের শুনানিতে আদালত রাজস্থান সরকারের একটি বিজ্ঞপ্তি স্থগিত করেছিল, যেখানে অনুমোদন ছাড়াই চম্বল অভয়ারণ্যের ৭৩২ হেক্টর এলাকার সংরক্ষণ বাতিলের চেষ্টা হয়েছিল।
রাজস্থানের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত
জানুয়ারি ২০২৬-এ রাজস্থান সরকার জাতীয় চম্বল ঘড়িয়াল অভয়ারণ্য থেকে প্রায় ৭৩২ হেক্টর জমির সংরক্ষণ বাতিলের অনুমোদন দেয়। কর্মকর্তারা বলেছেন এই পদক্ষেপের লক্ষ্য অভয়ারণ্যের সীমানা ও রাজস্ব জমির দীর্ঘস্থায়ী বিরোধ মেটানো। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, সংরক্ষণ বাতিল হওয়া এলাকাগুলো এখন বালি খনন ও অবকাঠামো উন্নয়নের উচ্চতর ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
পরিবেশগত গুরুত্ব
ঘড়িয়াল প্রবাহমান মিঠা জলের কীস্টোন প্রজাতি এবং বাস্তুতন্ত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ২০২২ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে ঘড়িয়াল কুমির প্রজাতির মধ্যে সবচেয়ে কার্যকরীভাবে স্বতন্ত্র, অর্থাৎ এদের বিলুপ্তি পরিবেশে একটি অপূরণীয় শূন্যতা তৈরি করবে। ঘড়িয়াল লক্ষ লক্ষ বছর আগের একটি প্রাচীন কুমির গোষ্ঠীর শেষ টিকে থাকা সদস্য।
গবেষণায় বলা হয়েছে, বর্তমান সংরক্ষণ কর্মসূচিগুলো পুনর্মূল্যায়ন ও শক্তিশালী করা জরুরি। এর মধ্যে রয়েছে আবাসস্থল-নির্দিষ্ট ব্যবস্থাপনা, প্রধান বাসা বাঁধার স্থানগুলোর সুরক্ষা বৃদ্ধি এবং নদীর সম্পদের টেকসই ব্যবহার।
পরবর্তী পদক্ষেপ
আদালত নির্দেশের বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনার জন্য পরবর্তী শুনানির তারিখ ১১ মে নির্ধারণ করেছে। রাজ্যগুলোকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পদক্ষেপ গ্রহণের প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।
বিশ্লেষণ
সংখ্যা বাড়লেই দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। দূষণ, জালে আটকে পড়া, নদীর প্রবাহ পরিবর্তন এবং বালুচর ধ্বংসের ঝুঁকি এখনও রয়েছে। তাই শুধু আদালতের নির্দেশই যথেষ্ট নয় — দরকার সামাজিক সচেতনতা, প্রশাসনিক সদিচ্ছা এবং দীর্ঘমেয়াদী বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ। চম্বলের ঘড়িয়ালদের বেঁচে থাকার লড়াই আসলে আমাদের নদী, আমাদের পরিবেশ এবং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বেঁচে থাকার লড়াই।