বাংলাস্ফিয়ার: ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বভাবগত বিশৃঙ্খলার মধ্যেও, ইরানকে ঘিরে তাঁর সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলি অস্বাভাবিকভাবে অস্থির এবং বিপজ্জনক এক সপ্তাহের জন্ম দিয়েছে। তিনি প্রথমে হুমকি দিয়েছিলেন ইরানের বেসামরিক জ্বালানি পরিকাঠামোর ওপর শীঘ্রই বোমাবর্ষণ চালানো হবে। ইরান তাতে ভীত না হলেও, বিশ্ববাজার কেঁপে ওঠে। ফলত দ্রুত অবস্থান বদলাতে হয় ট্রাম্পকে। তিনি জানান, শান্তি আলোচনার কিছু গোপন প্রস্তাব তাঁর কাছে এসেছে, তাই আপাতত আক্রমণ স্থগিত রাখা হচ্ছে। কিন্তু একই সঙ্গে পেন্টাগন ঘোষণা করে, ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের একটি অংশ পাঠানো হবে যুদ্ধাঞ্চল অঞ্চলে যা ইঙ্গিত দেয়, উত্তেজনা কমেনি, বরং বাড়ার সম্ভাবনাই প্রবল। এই অনিশ্চয়তার মধ্যেও ইরানের শাসকগোষ্ঠী আশ্চর্য রকম স্থির ও নির্ভীক। বরং দেখা যাচ্ছে, কৌশলগত দিক থেকে এখন তারা প্রতিপক্ষের চেয়ে এগিয়ে।
নিশ্চয়ই ইরান বড় ধাক্কা খেয়েছে। তাদের বহু শীর্ষ নেতা এবং শত শত সাধারণ মানুষ নিহত হয়েছেন। আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত, নৌবাহিনী এবং ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চারও অনেকটাই নিশ্চিহ্ন। তবুও শাসনব্যবস্থা টিকে আছে। যুদ্ধের শুরুতেই যেমন সতর্ক করা হয়েছিল, এই টিকে থাকাটাই ইরানের কাছে একপ্রকার জয়ী হওয়ার মতোই।
দেশের ভেতরে শাসনের দখল শিথিল তো হয়ইনি, বরং আরও শক্ত হয়েছে। কট্টরপন্থী রেভলিউশনারি গার্ড এখন কার্যত পুরো নিয়ন্ত্রণে। অভ্যন্তরীণ বিরোধীরা—হোক তা জাতিগত বিচ্ছিন্নতাবাদী বা শহুরে আন্দোলনকারী—সম্পূর্ণ স্তব্ধ। প্রায় ৪০০ কেজি উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত এখনও অক্ষত, সম্ভবত ধ্বংসস্তূপের নিচে লুকিয়ে রাখা হয়েছে। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হল, ইরান হরমুজ প্রণালীর ওপর কার্যত একপ্রকার ‘শ্বাসরোধী নিয়ন্ত্রণ’ প্রতিষ্ঠা করেছে,যার মাধ্যমে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আটকে দেওয়া সম্ভব। বহু দশক ধরে আমেরিকার সামরিক পরিকল্পনায় এই ঝুঁকির কথা থাকলেও, এই যুদ্ধ দেখিয়ে দিল ইরান সত্যিই প্রণালীটি বন্ধ করতে পারে, এবং তা খুলে দেওয়া অত্যন্ত কঠিন। ক্ষেপণাস্ত্র, সস্তা ড্রোন, এমনকি মাইন ব্যবহার করে ইরানের অসম যুদ্ধ কৌশল এখন সুপারপাওয়ারকেও আটকে রেখেছে।
বিদেশের মাটিতেও, তাদের মিত্র শক্তি কিছুটা দুর্বল হলেও অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েনি।ইরানের হাতে এখনও বহু চাল বাকি। ইয়েমেনে হুথি বিদ্রোহীরা আপাতত লোহিত সাগরে ট্যাঙ্কারের ওপর হামলা বন্ধ রেখেছে, ফলে সৌদি আরব কিছু তেল বিকল্প পথে বাজারে পাঠাতে পারছে যা বিশ্ববাজারে তেলের দাম কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। যদিও তা এখনও প্রতি ব্যারেল প্রায় ১০০ ডলারের কাছাকাছি। কিন্তু হুথিরা এখন এই ‘নিরস্ত্র অবস্থান’-এর জন্য বড় রাজনৈতিক মূল্য চাইতে পারে। যেমন উত্তর ইয়েমেনে তাদের নিয়ন্ত্রণের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। ইরাকে ইরানপন্থী শিয়া গোষ্ঠীগুলি কুর্দদের (এবং আমেরিকানদের) বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে। আর লেবাননে হিজবুল্লাহ আবার ‘প্রতিরোধ শক্তি’ হিসেবে কিছুটা জনপ্রিয়তা ফিরে পেতে পারে, বিশেষত যদি ইজরায়েল আক্রমণ বাড়ায় বা দখলদারির চেষ্টা করে।
উপসাগরীয় অঞ্চলে আমেরিকার বন্ধুরা কেউ যুদ্ধ চায়নি, কিন্তু এখন তারা আরও উদ্বিগ্ন। কারণ আহত অথচ প্রতিরোধী ইরান ভবিষ্যতে আরও বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে। তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিখুঁত নয়, অর্থনীতি ইরানের হুমকির কাছে কম্পমান। তাই কেউ কেউ পুরোপুরি আমেরিকার পাশে দাঁড়ানোর কথা ভাবছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ইতিমধ্যেই ইরানকে “অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ”-এর অভিযোগে অভিযুক্ত করেছে এবং আলোচনার বিরোধিতা করেছে। সৌদি আরব নাকি আমেরিকার স্থলবাহিনী পাঠানোর দাবিও তুলেছে।
ইজরায়েলও পুরোপুরি নিরাপদ নয়। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানের ওপর লাগাতার আক্রমণে সন্তুষ্ট হলেও, ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ইতিমধ্যেই ইজরায়েলের আকাশসীমা ভেদ করে নাগরিকদের নাস্তানাবুদ করে ছাড়ছে। হতাহতের সংখ্যাও কম নয়।। ইরানের পারমাণবিক হুমকি এখনও পুরোপুরি নির্মূল হয়নি। যদি শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন না হয়, তাহলে এই ক্ষেপণাস্ত্র হুমকি বারবার ফিরে আসবে,যার ফলে ইজরায়েলকে নিয়মিত আক্রমণ চালাতে হতে পারে। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হল,আমেরিকার সঙ্গে ইজরায়েলের দীর্ঘদিনের সম্পর্কেও চাপ পড়তে পারে। এই যুদ্ধ আমেরিকার জনগণের কাছে জনপ্রিয় নয়। যদি হতাহতের সংখ্যা বাড়ে, তেলের দাম বেড়ে যায় এবং বাজার ধসে পড়ে তাহলে দোষ কার ওপর পড়বে? ইতিমধ্যেই রিপাবলিকান শিবিরের একাংশ ইজরায়েলের দিকে আঙুল তুলতে শুরু করেছে। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের মধ্যে ইজরায়েল-বিরোধী মনোভাব বাড়ছে।
সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, আমেরিকা ও ইজরায়েলের সামরিক শক্তি ও প্রযুক্তিগত আধিপত্য থাকা সত্ত্বেও, ইরান কৌশলগতভাবে এগিয়ে। ট্রাম্প এই যুদ্ধ শুরু করেছেন কোনও সুস্পষ্ট কৌশলগত লক্ষ্য ছাড়াই। কিছু সামরিক সাফল্য সত্ত্বে, তিনি বাস্তবে কিছুই অর্জন করতে পারেননি। বরং রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে। তাঁর সামনে দুটি পথ—আরও যুদ্ধ বাড়ানো, অথবা আলোচনা।
তিনি হয়তো আরও বড় আক্রমণের প্রলোভনে পড়তে পারেন—ইরানের জ্বালানি শিল্প ও বেসামরিক পরিকাঠামো ধ্বংস করে হরমুজ প্রণালী খুলতে বাধ্য করার চেষ্টা। মার্কিন মেরিন বাহিনী খার্গ দ্বীপ দখল করতে পারে, উপকূলের কিছু অংশ বা প্রণালীর দ্বীপগুলো দখল করতে পারে। কিন্তু এগুলির কোনওটিই নিশ্চিত জয় এনে দেবে না। ইরান দেশের ভেতর থেকেই ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাতে পারবে, কিংবা প্রণালীতে মাইন পেতে দিতে পারবে। সেখানে অবস্থানরত মার্কিন সেনারা সহজ লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠবে। ১৯৮০ সালে ইরানে জিমি কার্টারের ব্যর্থ সামরিক অভিযানের স্মৃতি মুছে ফেলতে গিয়ে ট্রাম্প হয়তো সেই ভুলেরই পুনরাবৃত্তি করবেন। তাছাড়া, এই অঞ্চলে অতিরিক্ত সেনা পাঠানো মানে অন্যত্র ,বিশেষ করে এশিয়ায়, আমেরিকার সামরিক শক্তি দুর্বল হয়ে পড়া।
তাই তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিকর পথ হল, সিরিয়াস আলোচনার দিকে এগোনো। পাকিস্তান ইতিমধ্যেই মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছে। ট্রাম্প দাবি করেছেন, তিনি ইরানের কাছে ১৫ দফা পরিকল্পনা দিয়েছেন যদিও তেহরান তা অস্বীকার করছে। অতীতে আমেরিকা আলোচনাকে আক্রমণের অজুহাত হিসেবে ব্যবহারসকরেছে।তাই ইরান সন্দিহান।
এই অবস্থায় ট্রাম্পকে প্রথমে পূর্ণ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হতে হবে এবং ইজরায়েলকেও তা মানতে বাধ্য করতে হবে। হরমুজ প্রণালী খোলা এবং ইরানকে পারমাণবিক কর্মসূচি থেকে সরিয়ে আনার আলোচনা অত্যন্ত কঠিন হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হোল যে কোনও চুক্তি এখন যুদ্ধের আগের তুলনায় আরও খারাপ শর্তে হবে কারণ এই যুদ্ধ ইরানের কট্টরপন্থীদের শক্তিশালী করেছে এবং তাদের হাতে থাকা চাপের উপায়গুলো স্পষ্ট করে দিয়েছে।
ফলে আপাতত বাস্তবটা অস্বীকারের কোনও রাস্তা নেই।এই সংঘাতে কৌশলগত সুবিধা ইরানের হাতেই।