Home খবর ডিজিটাল আসক্তির দায়ে অভিযুক্ত মেটা ও গুগল

ডিজিটাল আসক্তির দায়ে অভিযুক্ত মেটা ও গুগল

0 comments 2 views
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: লস অ্যাঞ্জেলেসের একটি জুরি বোর্ড সম্প্রতি প্রযুক্তি জায়ান্ট মেটা (Meta) এবং অ্যালফাবেটের মালিকানাধীন গুগল-কে (Google) “অবহেলাজনিত দায়” বা ‘Negligence’-এর জন্য দোষী সাব্যস্ত করেছে। আপাতদৃষ্টিতে এটি ৬ মিলিয়ন ডলারের একটি ক্ষতিপূরণ মামলা মনে হলেও, আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন এটি ডিজিটাল যুগের এক মৌলিক সত্যকে প্রথমবারের মতো আইনি স্বীকৃতি দিল। বহুদিন ধরে যে অভিযোগটি জনমনে, গবেষণাপত্রে, অভিভাবকদের উৎকণ্ঠায় এবং কিশোরদের নীরব মানসিক বিপর্যয়ে ঘুরপাক খাচ্ছিল—সোশ্যাল মিডিয়া কেবল একটি নিরপেক্ষ মাধ্যম নয়, বরং ইচ্ছাকৃতভাবে তৈরি করা একটি আসক্তিমূলক পরিবেশ—সেই অভিযোগই আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আইনি বৈধতা পেল।

মামলাটি দায়ের করেছিলেন এক তরুণী, যিনি দাবি করেন যে কৈশোরে ইনস্টাগ্রাম এবং ইউটিউবের অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে তিনি গুরুতর মানসিক বিপর্যয়ের শিকার হয়েছেন। তবে এই মামলার বিশেষত্ব ছিল এর আইনি কৌশলে। সাধারণত কোনো নির্দিষ্ট ভিডিও বা পোস্টের কনটেন্ট নিয়ে অভিযোগ করা হলেও, এখানে অভিযোগ তোলা হয়েছিল প্ল্যাটফর্ম দুটির ‘ডিজাইন’ বা কারিগরি কাঠামোর বিরুদ্ধে।

তিনি দাবি করেন, Infinite Scroll (অবিরাম স্ক্রল), Autoplay (স্বয়ংক্রিয় ভিডিও চালু হওয়া) এবং Algorithmic Recommendation-এর মতো প্রযুক্তিগুলো ব্যবহারকারীর মনোযোগ ধরে রাখতে এবং তাদের এক প্রকার মনস্তাত্ত্বিক নির্ভরতার দিকে ঠেলে দিতে ব্যবহৃত হয়। এতদিন এগুলো প্রযুক্তিগত শব্দ হিসেবে পরিচিত থাকলেও, আদালতে এগুলোকে ‘ক্ষতির যন্ত্র’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

আমেরিকার প্রচলিত ‘সেকশন ২৩০’ (Section 230) আইনের অধীনে সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলো সাধারণত ব্যবহারকারীদের তৈরি করা কনটেন্টের জন্য দায়মুক্তি পায়। এই আইনকে পাশ কাটাতে বাদীপক্ষ এক অভিনব যুক্তি তুলে ধরে। তারা বলে, সমস্যাটি ‘কী দেখানো হচ্ছে’ (Content) তা নিয়ে নয়, বরং ‘কীভাবে দেখানো হচ্ছে’ (Design) তা নিয়ে। অর্থাৎ, প্ল্যাটফর্মের পরিবেশনা পদ্ধতিই ব্যবহারকারীকে আসক্ত করে তুলছে।

জুরি বোর্ড এই যুক্তি গ্রহণ করে রায় দিয়েছে যে, মেটা এবং গুগল এমন একটি ডিজাইন তৈরি করেছে যা কিশোর-কিশোরীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। কোম্পানিগুলো এই ঝুঁকি সম্পর্কে পর্যাপ্ত সতর্কবার্তা দেয়নি এবং এই ত্রুটিপূর্ণ ডিজাইনের সঙ্গেই বাদীর মানসিক ক্ষতির সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে। রায়ের ফলে ধার্যকৃত ক্ষতিপূরণের বড় অংশ মেটা এবং একটি অংশ গুগলকে প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এই মামলাটিকে একটি “Bellwether” বা পথপ্রদর্শক মামলা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ক্যালিফোর্নিয়াতে বর্তমানে এই ধরনের হাজারেরও বেশি মামলা বিচারাধীন। এছাড়া আমেরিকাজুড়ে অসংখ্য পরিবার, স্কুল ডিস্ট্রিক্ট এবং রাজ্য সরকার প্রযুক্তি সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে আইনি লড়াই চালাচ্ছে। এই রায় সেই সব মামলার জন্য একটি শক্তিশালী আইনি নজির হিসেবে কাজ করবে।

এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হল, এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কী হতে পারে। প্রথমত, এটি Section 230-এর কার্যকারিতাকে পরোক্ষভাবে চ্যালেঞ্জ করছে। আইনটি এখনও বহাল থাকলেও, যদি আদালত বারবার এই ধরনের যুক্তি গ্রহণ করে, তাহলে কোম্পানিগুলি আর সহজে বলতে পারবে না যে তারা কেবল একটি প্ল্যাটফর্ম।

দ্বিতীয়ত, এটি ব্যবসায়িক মডেলের ওপর সরাসরি আঘাত। সোশ্যাল মিডিয়ার অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে ব্যবহারকারীর মনোযোগ ধরে রাখার ওপর; আর সেই মনোযোগ ধরে রাখার জন্যই এই সমস্ত বৈশিষ্ট্য তৈরি করা হয়েছে। এখন যদি সেই বৈশিষ্ট্যগুলিই আইনি ঝুঁকির উৎস হয়ে ওঠে, তাহলে কোম্পানিগুলিকে তাদের পুরো নকশা পুনর্বিবেচনা করতে হবে। এতে তাদের আয়ের মডেলও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।

তৃতীয়ত, এটি নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রেও একটি চাপ তৈরি করবে। এতদিন মার্কিন কংগ্রেস বড় কোনও আইন আনতে পারেনি, কিন্তু আদালতের এই ধরনের রায় রাজ্যগুলিকে আরও সক্রিয় করে তুলতে পারে। ইতিমধ্যেই বহু রাজ্য কিশোরদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের কথা ভাবছে। এই রায় সেই প্রবণতাকে ত্বরান্বিত করবে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও এর প্রতিফলন দেখা যেতে পারে—ইউরোপে Digital Services Act বা ভারতের ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত আলোচনায় এই ধরনের নজির গুরুত্ব পাবে।

অবশ্য লড়াই এখনই থামছে না। মেটা এবং গুগল উভয় প্রতিষ্ঠানই এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার ঘোষণা দিয়েছে। তাদের দাবি, ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত পছন্দ, পারিবারিক তদারকি এবং সামাজিক পরিবেশের প্রভাবকেও বিবেচনায় নেওয়া উচিত; সব দায় কেবল প্ল্যাটফর্মের ওপর চাপানো অযৌক্তিক।

লস অ্যাঞ্জেলেসের এই রায় একটি বড় প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে: প্রযুক্তি কি কেবল একটি নিরপেক্ষ সরঞ্জাম? আদালতের উত্তর—না। প্রযুক্তির নকশা, উদ্দেশ্য এবং প্রভাব সবই বিচারযোগ্য। ৬ মিলিয়ন ডলারের এই রায়টি হয়তো আর্থিক অঙ্কে বড় নয়, কিন্তু এটি একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল যেখানে ডিজিটাল জগতের ক্ষতির দায়ভার এখন আর কেবল ব্যবহারকারীর নয়, নির্মাতাদের কাঁধেও বর্তাবে।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles