Home খবর হরমুজ খোলা অত সহজ নয়

হরমুজ খোলা অত সহজ নয়

0 comments 5 views
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করছেন, তিনি ইরানের নেতাদের সঙ্গে কথা বলছেন। ইরান বলছে, এমন কোনও কথাই হচ্ছে না। কিন্তু একটি বিষয় নিশ্চিত—যদি আলোচনার মাধ্যমে সংঘাতের ইতি টানা সম্ভব না হয়, তবে বিকল্প পরিকল্পনার প্রস্তুতি তিনি নিচ্ছেন। মার্কিন মেরিন বাহিনীর দুটি অ্যাম্ফিবিয়াস ইউনিট ইতিমধ্যেই উপসাগরের দিকে রওনা দিয়েছে—একটি জাপান থেকে, অন্যটি ক্যালিফোর্নিয়া থেকে। পাশাপাশি একটি অভিজাত পদাতিক ডিভিশন, যারা প্যারাশুট আক্রমণে বিশেষ দক্ষ, শিগগিরই তাদের অনুসরণ করবে বলে জানা যাচ্ছে। এই প্রস্তুতির বহর থেকে স্পষ্ট, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জোর করে হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার একটি সামরিক উদ্যোগের কথা ভাবছেন। কিন্তু সেই কাজ অত্যন্ত কঠিন।

 

“অপারেশন এপিক ফিউরি” শুরু হওয়ার পর থেকেই ইরান এই প্রণালীকে কার্যত অবরুদ্ধ করে রেখেছে।বিশ্বের মোট তেল ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) রপ্তানির প্রায় ২০% এই পথ দিয়ে যায়, সেই প্রবাহ প্রায় থমকে গেছে। উপসাগরের ভিতরে, প্রণালীর মধ্যে এবং এর আশেপাশে মোট ১৯টি বাণিজ্যিক জাহাজ আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে। ফলে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধের মুখে, কেবলমাত্র ইরানের সঙ্গে যুক্ত কিছু জাহাজই চলছে। এর ফলে পণ্যবাজার থেকে শুরু করে বিশ্ব আর্থিক বাজার সবই অস্থির ।

 

পেন্টাগনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রণালী খোলার তিনটি ধাপ তাঁরা ইতিমধ‍্যেই ছকে রেখেছেন । প্রথম ধাপে ইরানের সেই সব সামরিক সম্পদকে ধ্বংস করা হবে যেমন স্পিডবোট, ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও সমুদ্র-মাইন। এর জন‍্যই জাহাজগুলি এগোতে সাহস করছেনা।যদিও ইরানের যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিনগুলি সম্ভবত ইতিমধ্যেই ধ্বংস হয়ে গেছে।এই শিকার অভিযানে মূলত বিমান ব্যবহার করা হচ্ছে, তবে শিগগিরই স্থলবাহিনীও যুক্ত হতে পারে। দ্বিতীয় ধাপে প্রণালী জুড়ে মাইন খোঁজা ও সরানোর কাজ । শেষ ধাপে, যখন ইরানের আক্রমণক্ষমতা যথেষ্ট কমে আসবে, তখন মার্কিন নৌবাহিনী ট্যাঙ্কারগুলিকে নিরাপত্তা দিয়ে প্রণালী পার করাবে। প্রতিটি ধাপই কয়েক সপ্তাহ সময় নিতে পারে এবং সবটাই মার্কিন বাহিনীর কাছে ঝুঁকিপূর্ণ।

 

ইরানের হাতে জাহাজ আক্রমণের নানা উপায় রয়েছে। আকাশ থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা হতে পারে। বিস্ফোরক ও ক্ষেপণাস্ত্রে বোঝাই স্পিডবোট দল বেঁধে আক্রমণ করতে পারে কিংবা সরাসরি জাহাজে ধাক্কা মারতে পারে। জলের নিচে বিভিন্ন ধরনের মাইন লুকিয়ে থাকতে পারে। আর এই সব হামলার জন্য ব্যবহৃত সৈন্য ও অস্ত্রশস্ত্র উপকূলের শত শত কিলোমিটার জুড়ে ছড়িয়ে থাকা গুহা, খাঁড়ি ও ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গে লুকিয়ে রাখা হয়েছে। ফলে কেবল আকাশপথে এই সব লক্ষ্যবস্তু চিহ্নিত ও ধ্বংস করা অত্যন্ত কঠিন।

 

সাম্প্রতিক দিনগুলিতে মার্কিন যুদ্ধবিমান ইরানের উপকূলে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে। ১৯ মার্চ আমেরিকার সর্বোচ্চ সেনা কর্মকর্তা জেনারেল ড্যান কেইন জানান, যুদ্ধবিমানগুলি ৫,০০০ পাউন্ড ওজনের বোমা ব্যবহার করেছে যা পাথর ও কংক্রিট ভেদ করে ভূগর্ভস্থ বাঙ্কার ধ্বংস করতে সক্ষম। কারণ তাঁরা আশঙ্কা করছেন এখানে অ্যান্টি-শিপ ক্ষেপণাস্ত্র মজুত ছিল। পাশাপাশি হেলিকপ্টার ও নিচু দিয়ে উড়া আক্রমণাত্মক বিমান—যেমন A-10 “ওয়ারথগ”—ব্যবহার করে ইরানের স্পিডবোটে গুলি চালানো হয়েছে। মার্কিন বাহিনীর দাবি, তারা ইতিমধ্যেই ১২০টির বেশি ইরানি নৌযান এবং ৪৪টি মাইন বসানোর জাহাজ হয় ক্ষতিগ্রস্ত করেছে  বা ডুবিয়েছে। ওয়াশিংটনের হাডসন ইনস্টিটিউটের ব্রায়ান ক্লার্কের কথায়, “আমেরিকা এখন এমন সব গুহা, ভবন আর গ্যারেজে হামলা চালাচ্ছে যেখানে এই অস্ত্র থাকতে পারে। কিন্তু সব সম্ভাব্য হুমকি পুরোপুরি নির্মূল করা খুব কঠিন।”

 

এখন একটি নতুন ধারণা গুরুত্ব পাচ্ছে—নিকটবর্তী দ্বীপগুলিতে বিশেষ বাহিনী বা মেরিন মোতায়েন করে দুর্গম অঞ্চলে লুকিয়ে থাকা লক্ষ্যবস্তু চিহ্নিত ও ধ্বংস করা। সামরিক মহলে ইরানের প্রধান তেল রফতানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপ দখল করা বা প্রণালীর ভিতরে অবস্থিত, ইরানের নিয়ন্ত্রণে থাকা কিন্তু সংযুক্ত আরব আমিরশাহির দাবি করা তিনটি দ্বীপ দখলের কথাও ভাবা হচ্ছে। এই বাহিনী শুধু প্রতিরোধের যুদ্ধ সরঞ্জাম খোঁজার কাজই করবে না, বরং আকাশেও নজরদারির ব‍্যবস্থা করে জাহাজ চলাচলকে সুরক্ষিত করতেও সাহায্য করতে পারে।

 

তবে স্থলবাহিনী মোতায়েনের ঝুঁকিও কম নয়।  প্রথমেই তারাতারা ইরানের কামান ও ড্রোন হামলার আওতায় থাকবে। উপরন্তু তাদের নিয়মিত রসদ সরবরাহ করতে হবে যার ফলে আরও বিমান ও জাহাজ বিপদের মুখে পড়বে। আর এত কিছু করেও হয়তো লাভ তেমন একটা হবেনা।কারণ ইরানের শাহেদ-১৩৬ ড্রোন ১,৫০০ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বে উড়তে পার।অর্থাৎ ইরানের প্রায় যেকোনও স্থান থেকেই প্রণালী বা উপসাগরের যে কোনও জায়গায় আঘাত হানা সম্ভব।

 

মাইন সরানোর কাজও সমান বিপজ্জনক। ইরান আদৌ মাইন পেতে রেখেছে কি না, সে বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য রয়েছে, কিন্তু শিপিং সংস্থাগুলি স্বাভাবিকভাবেই ঝুঁকি নিতে চাইছে না। যুদ্ধ শুরুর আগে ধারণা করা হয়েছিল, ইরানের কাছে প্রায় ৬,০০০ মাইন মজুত রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জলের নীচে  নিচে ভাসমান মাইন যা দিয়ে জাহাজকে ধাক্কা মেরে বিস্ফোরণ ঘটানো সম্ভব। এছাড়াও আছে  আরও উন্নত ধরনের মাইন যা সমুদ্রের তলায় থেকে জাহাজের চৌম্বক বা শব্দ সংকেত শনাক্ত করে বিস্ফোরণ ঘটায় । একথা ঠিক,মার্কিন বাহিনী ইরানের বহু মাইন বসানোর জাহাজ ধ্বংস করেছে। কিন্তু মুশকিল হোল সাধারণ বাণিজ্যিক বা মাছ ধরার নৌকাও এই কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে।

 

মার্কিন নৌবাহিনী দীর্ঘদিন ধরেই মাইন যুদ্ধের বিষয়টিকে অবহেলা করেছে। জানুয়ারিতে, অত্যন্ত খারাপ সময়ে, তারা এই অঞ্চলে থাকা তাদের শেষ অ্যাভেঞ্জার-শ্রেণির মাইন অপসারণকারী জাহাজগুলিকেও তুলে নেয়। যে তিনটি নতুন জাহাজ এই কাজের জন্য আনার কথা—লিটারাল কমব্যাট শিপ—তার মধ্যে দুটি এখনও উপসাগরে পৌঁছয়নি, এশিয়া থেকে আসতে সময় লাগবে। পৌঁছনোর পর তারা হেলিকপ্টার, আকাশভিত্তিক শনাক্তকরণ ব্যবস্থা ও জলের নিচের ড্রোন ব্যবহার করে মাইন খোঁজা ও নিষ্ক্রিয় করার কাজ করবে। তবে এই প্রযুক্তিগুলি এখনও বাস্তব যুদ্ধে ব্যবহৃত হয়নি এবং পরীক্ষায় একাধিক প্রযুক্তিগত সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে। এরপরেও পুরো প্রণালী পরিষ্কার করতে এক থেকে তিন সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।

সবচেয়ে কঠিন ও বিপজ্জনক ধাপ হবে ট্যাঙ্কারগুলিকে এই সঙ্কীর্ণ প্রণালী  নিরাপত্তা দিয়ে পার করানো এবং তা অনির্দিষ্টকাল ধরে চলতে পারে। এই কাজে ডজন ডজন ড্রোন, আক্রমণাত্মক হেলিকপ্টার ও যুদ্ধবিমানকে আকাশে চক্কর দিতে হবে, সঙ্গে থাকবে আগাম সতর্কীকরণ বিমান, যা আসন্ন ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন শনাক্ত করবে। যুদ্ধজাহাজগুলি স্বল্প-পাল্লার অস্ত্র বা ইলেকট্রনিক যুদ্ধ প্রযুক্তি ব্যবহার করে ড্রোন প্রতিহত করবে, আর ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে ব্যবহার করবে আরও ব্যয়বহুল ও সীমিত সংখ্যক ইন্টারসেপ্টর। সামুদ্রিক বিশেষজ্ঞদের মতে, গড়ে প্রতি ট্যাঙ্কারের জন্য একটি ডেস্ট্রয়ার প্রয়োজন হবে, কারণ তারা খুব কাছাকাছি থেকে চলবে।

 

এই অঞ্চলে বর্তমানে মার্কিন নৌবাহিনীর ১৪টি ডেস্ট্রয়ার রয়েছে, যার মধ্যে ৬টি বিমানবাহী রণতরীর নিরাপত্তায় ব্যস্ত। আরও ডেস্ট্রয়ার আনতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে এবং তা করলে এশিয়ার মতো অন্য অঞ্চল থেকে বাহিনী সরাতে হবে। আমেরিকার মিত্ররা সাহায্য করতে পারে, কিন্তু যুদ্ধ চলাকালীন তারা অনেকেই জাহাজ পাঠাতে অনিচ্ছুক। যেই এই দায়িত্ব নিক না কেন, এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল হবে এবং আমেরিকা ও তার মিত্রদের সীমিত অ্যান্টি-মিসাইল অস্ত্রভাণ্ডার আরও কমিয়ে দেবে।

 

প্রণালীর ভৌগোলিক অবস্থানও সমস্যা বাড়ায়। সবচেয়ে সরু জায়গায় এটি মাত্র ৫০ কিলোমিটার চওড়া, চারদিকে পাহাড় ঘেরা। ফলে মার্কিন যুদ্ধজাহাজের কাছে আসন্ন হামলা শনাক্ত ও প্রতিহত করার সময় খুবই কম থাকবে। পাশাপাশি শক্ত স্রোতের মধ্যে জাহাজগুলিকে একসঙ্গে রেখে চলা কঠিন হবে। আর শেষ পর্যন্ত সবকিছুই নির্ভর করছে এই প্রশ্নের ওপর—আদৌ কি কোনও বাণিজ্যিক জাহাজ এই বিপজ্জনক পথ দিয়ে যেতে রাজি হবে?

 

সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লড়াই করে মার্কিন নৌবাহিনী কিছু অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। কিন্তু ইরানের অস্ত্রভাণ্ডার অনেক বেশি উন্নত—এবং তাদের লড়াইয়ের ইচ্ছাশক্তিও সম্ভবত আরও বেশি, কারণ এই যুদ্ধ তাদের অস্তিত্বের প্রশ্ন।  তারাবহু দশক ধরে এই উদ্দেশ্যের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করেছে। আমেরিকা যতদিন এই লড়াই চালিয়ে যেতে প্রস্তুত থাকবে তারা ততদিনই এর মোকাবিলা করতে পারবে।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles