বাংলাস্ফিয়ার: ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন এমন এক সিদ্ধান্তের মুখোমুখি, যার ঝুঁকি ও পরিণতি আধুনিক সামরিক ইতিহাসে বিরল। প্রশ্নটি সরল, কিন্তু তার অন্তর্নিহিত বিপদ অসীম: ইরানের পারমাণবিক জ্বালানি কি আমেরিকা উদ্ধার করবে, নাকি ধ্বংস করবে?
গত কয়েক দিনে বারবার ট্রাম্প তার অবস্থান স্পষ্ট করার চেষ্টা করেছেন। তার বক্তব্য, তেহরান প্রায় পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করে ফেলেছিল, এবং তা প্রথমে ইজরায়েল, পরে আমেরিকার বিরুদ্ধে ব্যবহার করত। “এক ঘণ্টার মধ্যে, অথবা এক দিনের মধ্যে” — এই ভাষাতেই তিনি সম্ভাব্য বিপদের তীব্রতা বোঝাতে চেয়েছেন।
কিন্তু এই বক্তব্যের আড়ালে ঘুরপাক খাচ্ছে আরও বড় এক প্রশ্ন: পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির উপযোগী ইরানের ইউরেনিয়াম মজুত দখল বা ধ্বংস করতে যুক্তরাষ্ট্র কি আদৌ পূর্ণাঙ্গ সামরিক অভিযানে নামবে?
ওসামা অভিযানের চেয়েও জটিল
এই সম্ভাব্য অভিযানের পরিধি ও ঝুঁকি এতটাই ব্যাপক যে, তা ২৬ বছর আগের ওসামা বিন লাদেন অভিযানের চেয়েও জটিল বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ এখানে শুধু একটি লক্ষ্যবস্তু নয় বরং একটি ছায়ার মতো ছড়িয়ে থাকা, আংশিকভাবে অজানা, ভূগর্ভস্থ নেটওয়ার্ক, যার প্রতিটি স্তরেই লুকিয়ে আছে বিপদ।
ইরানের অধিকাংশ পারমাণবিক জ্বালানি সম্ভবত ইসফাহানের একটি পাহাড়ের গভীরে সংরক্ষিত। কিন্তু নিশ্চিত করে কেউই বলতে পারছে না সব উপাদান ঠিক কোথায় আছে। এই অনিশ্চয়তাই সবচেয়ে বড় ঝুঁকি।
যদি কন্টেইনারগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে বেরিয়ে আসতে পারে বিষাক্ত ও তেজস্ক্রিয় গ্যাস। আর যদি সেগুলি একে অপরের খুব কাছে চলে আসে, তবে ত্বরান্বিত পারমাণবিক বিক্রিয়ার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে যা মুহূর্তে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
এই কারণেই মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও কংগ্রেসে বলেছিলেন, এই ধরনের অভিযান কেবলমাত্র তখনই সম্ভব, যখন একটি বিশেষ প্রশিক্ষিত কমান্ডো দল “ভেতরে ঢুকে সেটি উদ্ধার করবে।”
ট্রাম্প অবশ্য এই ঝুঁকি নিয়ে প্রকাশ্যে উদ্বিগ্ন নন। সাংবাদিকদের তিনি বলেছেন, “আমি কোনও কিছুতেই ভয় পাই না।”
থামলেও বিপদ, এগোলেও বিপদ
এই আত্মবিশ্বাসের আড়ালে রয়েছে এক গভীর কৌশলগত দ্বিধা। যুদ্ধ থামিয়ে দিলে সমস্যা শেষ হবে না, বরং একটি দুর্বল কিন্তু প্রতিশোধপরায়ণ ইরান হয়তো আরও দ্রুত পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে এগোবে। হার্ভার্ডের পারমাণবিক বিশেষজ্ঞ ম্যাথিউ বান সতর্ক করেছেন, এখন থেমে গেলে “একটি ক্ষতবিক্ষত কিন্তু আরও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ শাসনব্যবস্থা” থেকে যাবে, যাদের কাছে এখনও প্রয়োজনীয় উপাদান, জ্ঞান ও প্রযুক্তি রয়েছে।
ট্রাম্প দাবি করেছেন, পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে ইরান মাত্র এক মাস পিছিয়ে ছিল। তবে বিশেষজ্ঞরা ভিন্নমত পোষণ করছেন — তাদের হিসাবে, এক মাসে ইউরেনিয়াম অস্ত্র তৈরির উপযোগী করা গেলেও, একটি কার্যকর বোমা হাতে পেতে ইরানের আরও কমপক্ষে কয়েক মাস, এমনকি এক বছরও লেগে যেত।
ফেব্রুয়ারির ২৮ তারিখে আমেরিকা-ইজরায়েলের যৌথ হামলা শুরুর আগে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলির অবস্থান ছিল স্পষ্ট — ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি তাৎক্ষণিক কোনো হুমকি তৈরি করছে না। সেই মূল্যায়নের প্রতিধ্বনি পাওয়া যায় জো কেন্টের পদত্যাগপত্রেও, যেখানে তিনি সরাসরি লিখেছেন — “ইরান আমাদের দেশের জন্য কোনো তাৎক্ষণিক হুমকি ছিল না।”
তবে টানা ১৮ দিনের বোমাবর্ষণে সেই সমীকরণ পাল্টে গেছে। ইরানের প্রচলিত সামরিক সক্ষমতা এখন অনেকটাই ভেঙে পড়েছে আর সেই শূন্যস্থান পূরণ করছে পারমাণবিক জ্বালানি, যা এখন তেহরানের হাতে থাকা অন্যতম প্রধান প্রতিরক্ষা হাতিয়ার।
গোলকধাঁধার মধ্যে অভিযান
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান খুব সম্ভবত এই জ্বালানি রক্ষার জন্য আগেই প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। কার্নেগি এন্ডাউমেন্টের জর্জ পারকোভিচের মতে, সেখানে হয়তো প্রকৃত কন্টেইনারের পাশাপাশি অসংখ্য ভুয়ো কন্টেইনারও রাখা হয়েছে, যাতে অভিযান চালাতে গিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়।
“২০টি কন্টেইনারের জায়গায় হয়তো শত শত, এমনকি হাজারও থাকতে পারে” — বলেন তিনি। অর্থাৎ বিশেষ বাহিনী সেখানে ঢুকলে কার্যত এক গোলকধাঁধার মধ্যে পড়ে যাবে।
এই ধরনের অভিযানের জন্য আমেরিকা বহু বছর ধরেই বিশেষ প্রশিক্ষিত ইউনিট তৈরি করেছে যারা পারমাণবিক অস্ত্র নিষ্ক্রিয় করা, সেন্ট্রিফিউজ ধ্বংস করা বা তেজস্ক্রিয় উপাদান সামলানোর মতো কাজের অনুশীলন করে।
তবু মূল প্রশ্নগুলো রয়ে গেছে – এই জ্বালানি কি ধ্বংস করা হবে, নাকি গোপনে দেশ থেকে বের করে আনা হবে? অভিযান কি হবে সীমিত ও গোপন, নাকি বিশাল সামরিক উপস্থিতির সঙ্গে? আরও জটিল বিষয় — সব উপাদান ইসফাহানে নেই। কিছু থাকতে পারে ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’-এর মতো অন্য কোনো টানেলে, কিংবা ফোর্দো ও নাতানজের ধ্বংসপ্রাপ্ত স্থাপনাতেও।
কূটনীতির দরজা বন্ধ
এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই সামনে এসেছিল একটি কূটনৈতিক প্রস্তাব। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি প্রস্তাব দিয়েছিলেন — ইরান তার সমস্ত পারমাণবিক জ্বালানিকে কম সমৃদ্ধ মাত্রায় নামিয়ে আনবে, আন্তর্জাতিক তদারকির অধীনে। তবে শর্ত ছিল যে এই জ্বালানি ইরানের ভেতরেই থাকবে।
আমেরিকা সেই প্রস্তাব নাকচ করে দেয়। তাদের পাল্টা প্রস্তাব ছিল — ইরানকে চিরকাল বিনামূল্যে কম-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরবরাহ করা হবে, কিন্তু ইরানের নিজস্ব মজুত থাকবে না। এই মতপার্থক্যের মধ্যেই শুরু হয় যুদ্ধ।
যুদ্ধের শেষ একদিন না একদিন হবেই। তখন হয়তো আবার আলোচনার টেবিলে ফিরতে হবে এই পারমাণবিক জ্বালানির ভবিষ্যৎ নিয়ে। কিন্তু এই মুহূর্তে কোনো কূটনৈতিক ‘এক্সিট র্যাম্প’-এর ইঙ্গিত নেই। ফলে ট্রাম্পের সামনে যে সিদ্ধান্ত তা শুধু সামরিক নয়, ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে এমন এক জটিল, বিপজ্জনক এবং অনিশ্চিত পথের নির্বাচন।