Home সংবাদ ইরানের মেরুদন্ড ভেঙে পশ্চিম এশিয়ার একমাত্র দাদা হতে চায় ইজরায়েল

ইরানের মেরুদন্ড ভেঙে পশ্চিম এশিয়ার একমাত্র দাদা হতে চায় ইজরায়েল

0 comments 113 views
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: ১৯৭৭ সালের জুলাই মাস। ইরানের শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি তাঁর যুদ্ধ ও সমরাস্ত্র বিষয়ক উপমন্ত্রী লেফটেন্যান্ট জেনারেল হাসান তুফানিয়ানকে গোপন আলোচনার জন্য ইজরায়েলে পাঠালেন। সদ্য ক্ষমতায় এসেছে মেনাখেম বেগিনের লিকুদ সরকার। তার তিন মাস আগেই শাহ অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যনির্বাহী প্রধানমন্ত্রী শিমন পেরেসের সঙ্গে ছয়টি ‘তেল -বিনিময়ে অস্ত্র’ চুক্তিতে সই করেছিলেন। ওই চুক্তিগুলির একটির সাঙ্কেতিক নাম ছিল ‘ফ্লাওয়ার’। ইরান চেয়েছিল ইজরায়েল তাদের ‘সার্ফেস টু সার্ফেস’ ক্ষেপনাস্ত্র প্রযুক্তিতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন এনে তেহরানকে কা ব্রিক্রি করুক। জেনারেল তুফানিয়ানের সফরের উদ্দেশ্য ছিল এটা নিশ্চিত করা যে সরকার পরিবর্তন হলেও চুক্তির ভবিষ্যৎ বিপন্ন হবেনা। তিনি বৈঠক করেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী এজের ওয়েইৎসমানের সঙ্গে। আলোচনায় দু’পক্ষই একটি যৌথ সামরিক উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়ে একমত হয়-প্রযুক্তি দেবে ইজরায়েল, অর্থ ও পরীক্ষামূলক ক্ষেত্র দেবে ইরান। প্রতিশ্রুতি ছিল ৭০০ কিলোমিটার পাল্লার পারমাণবিক ওয়ারহেড বহনে সক্ষম ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহের।

কিন্তু দু’বছরের মধ্যেই দৃশ্যপট পাল্টে যায়। দেশজুড়ে বিক্ষোভে শাহের পতন ঘটে। ১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্যারিস থেকে নির্বাসন শেষে তেহরানে ফেরেন আয়াতোল্লা রুহোল্লা খোমেনি। শিয়া ইসলামপন্থীরা ক্ষমতা দখল করে ইরানকে ইসলামি প্রজাতন্ত্রে রূপান্তরিত করে-আংশিক গণতান্ত্রিক কিন্তু মূলত ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা। নতুন ইরান ‘জেরুসালেমের মুক্তি’কে প্রধান লক্ষ্য ঘোষণা করে। একই সময়ে তেহরানের আমেরিকান দূতাবাসে ৬৬ জন আমেরিকান পণবন্দী হন। বিপ্লবী ইরানের দৃষ্টিতে আমেরিকা ছিল ‘মহাশয়তান’-১৯৫৩ সালে মোহাম্মদ মোসাদ্দেককে উৎখাত করে শাহকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনার জন্য- আর ইজরায়েল ছিল ‘ক্ষুদ্র শয়তান’ কেননা তারা ফিলিস্তিনের দখলদার রাষ্ট্র। I

এই বিপ্লব শুধু শাসনব্যবস্থা বদলায়নি; তা ছিল এক ভূরাজনৈতিক ভূমিকম্প। শাহের ইরান যেখানে আমেরিকা-ইজরায়েল জোটের স্তম্ভ ছিল, খোমেনির ইরান সেখানে হয়ে উঠল সেই জোটের প্রধান শত্রু। এদিকে অঞ্চল রে ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিও বদলাচ্ছিল। ১৯৭৮ সালে মিশর প্রথম আরব দেশ হিসেবে ইজরায়েলকে স্বীকৃতি দেয়, সিনাই উপদ্বীপ ফেরত পাওয়ার বিনিময়ে। আরব বিশ্ব ফিলিস্তিনকে সমর্থন করলেও সরাসরি সংঘর্ষের রাজনীতি থেকে সরে আসছিল। শিয়া বিপ্লবী ইরানের কাছে ফিলিস্তিন প্রশ্ন ছিল ধর্মীয় কর্তব্য এবং একই সঙ্গে সুন্নি-শিয়া বিভাজন পেরিয়ে মুসলিম বিশ্বে প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার। ইজরায়েল বুঝতে পারে, আরব রাষ্ট্রগুলির পর এবার তার সামনে নতুন প্রতিপক্ষ ইরান। সেই থেকে ইজরায়েল-ইরান দ্বন্দ্ব পশ্চিম এশিয়ার ভূরাজনীতিকে নির্ধারণ করছে।

আমেরিকা ও পশ্চিমা সমর্থনে পারমাণবিক অস্ত্রসজ্জিত ইজরায়েল অঞ্চলের শক্তিশালী সামরিক শক্তিতে পরিণত হয়। বিপরীতে, বিপ্লবের পর আমেরিকান নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ে ইরান গড়ে তোলে মিলিশিয়া নেটওয়ার্ক। ১৯৮০-এর দশকে জন্ম নেয় হিজবুল্লাহ; ১৯৯০-এর দশকে ইরান জোরদার করে হামাস ও ইসলামিক জিহাদের প্রতি সমর্থন। অসলো প্রক্রিয়া ভেঙে পড়লে হামাস ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়, এবং ইরান-ইজরায়েলফিলিস্তিন সঙ্কটে কেন্দ্রীয় খেলোয়াড় হয়ে ওঠে। দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর প্রতিরোধে ইজরায়েল ২০০০ সালে ১৮ বছরের দখলদারি শেষে সরে যেতে বাধ্য হয়। ২০০৬ সালের যুদ্ধেও হিজবুল্লাহ টিকে থাকে।

২০০৩ সালে আমেরিকার ইরাক আক্রমণ নতুন সমীকরণ তৈরি করে। জর্জ ডব্লিউ বুশ ইরানকে ‘অ্যাক্সিস অব ইভিল’-এর অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন, কিন্তু সাদ্দাম হুসেনের পতন ইরানের জন্য কৌশলগত সুযোগ এনে দেয়। শিয়া-অধ্যুষিত ইরাকে তেহরানঘনিষ্ঠ শক্তি ক্ষমতায় আসে। ইরানের প্রভাব তেহরান থেকে বাগদাদ, দামাস্কাস হয়ে দক্ষিণ লেবানন পর্যন্ত বিস্তৃত হয়-শিয়া ক্রিসেন্ট’। একইসময়ে ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি এগিয়ে নিয়ে যায়।

আরব বসন্তে তিউনিসিয়া ও মিশরে শাসনপতন ঘটে, লিবিয়া ও ইয়েমেনে অস্থিরতা ছড়ায়। ইয়েমেনে হুথিদের উত্থান ইরানের প্রভাব বাড়ায়। কিন্তু সিরিয়ায় আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ইরানের আঞ্চলিক অক্ষের জন্য বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। ইরান ও হিজবুল্লাহ সরাসরি যুদ্ধে জড়ায়; ২০১৫ সালে রাশিয়ার হস্তক্ষেপে আসাদ সরকার টিকে যায়। ইসলামিক স্টেটের উত্থান ইরান ও আমেরিকাকে এক পর্যায়ে একই শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আংশিকভাবে একই পাশে দাঁড় করায়।

সবচেয়ে বিতর্কিত প্রশ্ন ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। ২০১৫ সালে জেসিপিওএ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়-পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা শিথিল। বিশ্ব স্বাগত জানালেও ইজরায়েল আপত্তি তোলে। ওবামা চুক্তি কার্যকর করেন কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প একে “সবচেয়ে খারাপ চুক্তি” আখ্যা দিয়ে ২০১৮ সালে চুক্তি বাতিল করে নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করেন। ইরান উচ্চমাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করা শুরু করে, ইজরায়েলু গোপন অভিযানে ইরানের পারমাণবিক বিজ্ঞানীদের টার্গেট করে।

ট্রাম্প ইরানের অস্ত্র কর্মসূচি ও আঞ্চলিক সক্রিয়তা বন্ধে চাপ বাড়ান। ইরান ‘ম্যাক্সিমাম রেজিস্ট্যান্স’-এর নীতি গ্রহন করতে বাঁধ্য হয়।। ২০২০ সালে কাসেম সোলেইমানি নিহত হন; ইরান ইরাকে আমেরিকান ঘাঁটিতে হামলা চালায়, কিন্তু পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ এড়ানো তখনও এড়ানো সম্ভব হয়। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের ইজরায়েল আক্রমণ নতুন অধ্যায় খুলে দেয়। ইজরায়েল ঘোষণা করে তাদের লক্ষ্য হামাস ধ্বংস ও ২৫১ বন্দীর মুক্তি। কিন্তু লক্ষ্য ছিল বৃহত্তর-ইরানের অক্ষ ভাঙা। নেতানিয়াহু চেয়েছিলেন আমেরিকার সমর্থনে এককেন্দ্রিক পশ্চিম এশিয়া, যেখানে ইজরায়েল হবে প্রধান নিরাপত্তা শক্তি।

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সিরিয়ায় আসাদের পতন ও নতুন জিহাদি নেতৃত্বের উত্থান ইরানের প্রতিরক্ষা বলয় দুর্বল করে। ইরান আলোচনায় আগ্রহ দেখালেও ১৩ জুন ইজরায়েল ইরানে বোমাবর্ষণ শুরু করে; পরে আমেরিকাও যোগ দেয়। বারো দিনের যুদ্ধের পর যুদ্ধবিরতি আসে। ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস হোল; নেতানিয়াহু বলেন, ঐতিহাসিক বিজয়। কিন্তু সঙ্কট শেষ হোল না।

ইজরায়েল চায় ইরানের সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ-পারমাণবিক কর্মসূচি, ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন, মিলিশিয়া সমর্থন সব বন্ধ। ইরান কেবল পারমাণবিক প্রশ্নে আলোচনা করতে রাজি। কূটনীতিতে অচলাবস্থা তৈরি হয়। এবছর জানুয়ার তি ইরানে মুদ্রাস্ফীতি ঘিরে বিক্ষোভে ট্রাম্প সমর্থন জানান। দমনপীড়নে অন্তত ৩,০০০ মানুষ নিহত হয়। উত্তেজনা বাড়তেই থাকে।

ফেব্রুয়ারি শেষে ওমান জানায় চুক্তি নাগালের মধ্যে। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ইজরায়েল ও আমেরিকা ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব ও সামরিক সকেন্দ্রগুলির ওপর হামলা শুরু করে। ট্রাম্প ইরানিদের বলেন, “তোমাদের স্বাধীনতার সময় এসে গেছে।” ইরান পাল্টা ইজরায়েল ও অঞ্চলের অন্তত পাঁচটি আমেরিকান ঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। তেহরানের ভাষ্য-এটি টিকে থাকার সংগ্রাম। আমেরিকা ও ইজরায়েল পশ্চিম এশিয়ার ক্ষমতার ভারসাম্য স্থায়ীভাবে বদলাতে চায়; ইসলামি প্রজাতন্ত্রের কাছে এটি অস্তিত্বের যুদ্ধ।

ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের কাছ থেকে ছাড় আদায় করতে চেয়েছিলেন-তার অস্ত্র কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক সক্রিয়তা, অর্থাৎ রাষ্ট্রবহির্ভূত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলিকে সমর্থন দেওয়া বন্ধ করার প্রশ্নে। কিন্তু ট্রাম্পের ‘ম্যাক্সিমাম প্রেসার’-এর জবাবে তেহরান গ্রহণ করল ‘ম্যাক্সিমাম রেজিস্ট্যান্স’-এর নীতি। সৌদি আরবে ও উপসাগরীয় জলসীমায় হামলা চালানো হল, ইয়েমেনে হুথিদের মতো মিত্র গোষ্ঠীগুলির প্রতি সমর্থন বাড়ানো হল। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে আমেরিকা হত্যা করে কাসেম সোলেইমানিকে-ইরানের ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর-এর (আইআরজিসি)-এর বহিরাগত অভিযানের তদারককারী এক ক্যারিশম্যাটিক জেনারেলকে। এটি ছিল ইরানের কাছে বিরাট আঘাত। তেহরান ইরাকে একটি আমেরিকান ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে জবাব দেয় কিন্তু পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে কেউই আগ্রহী না থাকায় সঙ্কট আপাতত প্রশমিতহয়ে যায়।

এই ভারসাম্য বদলে দেয় ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের ইজরায়েল আক্রমণ এবং তার পরবর্তী আঞ্চলিক ঘটনাপ্রবাহ। ইজরায়েল ঘোষণা করে তার দুটি প্রধান লক্ষ্য -হামাসকে ধ্বংস করা এবং ৭ অক্টোবর অপহৃত ২৫১ জন বন্দীকে মুক্ত করা। কিন্তু যুদ্ধ পরিচালনার ধরন ইঙ্গিত দেয়, লক্ষ্য আরও গভীর। ইজরায়েলের কাছে হামাস ছিল কেবল বরফশৈলের চূড়া; প্রকৃত শত্রু ইরান। ৭ অক্টোবরের পর ইজরায়েল একটি দ্বিমুখী যুদ্ধের সুযোগ দেখল-প্রথমত, ফিলিস্তিনি প্রতিরোধকে চিরতরে গুঁড়িয়ে দেওয়া; দ্বিতীয়ত, ইরানের ‘অক্ষ’ ভেঙে তার আঞ্চলিক প্রভাব দুর্বল করা। প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর কৌশল ছিল এককেন্দ্রিক পশ্চিম এশিয়া নির্মাণ যেখানে আমেরিকার সমর্থনে ইজরায়েল হবে কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা শক্তি; ইরানকে পিছু হটানো হবে; আরব দেশগুলিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা হবে; এবং ফিলিস্তিন প্রশ্নকে প্রান্তিক করে দেওয়া হবে।

সিরিয়ায় ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বাশার আল-আসাদ সরকারের পতন এবং প্রাক্তন আল-কায়েদা জিহাদি আবু মহম্মদ আল-গোলানি (আহমেদ আল-শারা)-র উত্থান ইজরায়েলের কাছে এক কৌশলগত সাফল্য হিসেবে দেখা দেয়। দুর্বল হিজবুল্লাহ আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, আর ইরানের ‘ফরওয়ার্ড ডিফেন্স’ কৌশল হঠাৎ করেই ছিদ্রযুক্ত বলে মনে হতে থাকে। ইরান যেন বহিরাগত আঘাতের মুখে উন্মুক্ত। প্রত্যক্ষ হামলা সময়ের অপেক্ষা মাত্র-এমন পরিস্থিতি তৈরি হোল।

বিপদের আভাস পেয়ে ইরান ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে পরোক্ষ আলোচনা শুরু করে। বার্তা ছিল পরিষ্কার-পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সমঝোতায় ইরান প্রস্তুত। রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা নেতৃত্ব বারবার জানায়, তারা পরমাণু বোমা তৈরি করতে চায় না। কিন্তু ১৩ জুন, ওয়াশিংটন ও তেহরানের ষষ্ঠ দফা আলোচনার দু’দিন আগে, ইজরায়েল ইরানে বোমাবর্ষণ শুরু করে। কয়েক দিনের মধ্যেই আমেরিকা যুদ্ধে যোগ দেয়, ইরানের প্রধান পারমাণবিক স্থাপনাগুলিতে হামলা চালায়। বারো দিনের লড়াইয়ের পর যুদ্ধবিরতিতে সম্মতি আসে। ট্রাম্প দাবি করেন, তিনি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি “সম্পূর্ণ ধ্বংস” করেছেন; নেতানিয়াহ্র ঘোষণা করেন “ঐতিহাসিক বিজয়”। কিন্তু সঙ্কটের মীমাংসা তখনও অনেক দূরে।

ইজরায়েল চায় ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি ছেড়ে দিক, ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন বন্ধ করুক, এবং অঞ্চলে রাষ্ট্রবহির্ভূত মিলিশিয়াদের সমর্থন বন্ধ করুক-অর্থাৎ কার্যত সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ। ইরান পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করতে রাজি ছিল, কিন্তু অন্য বিষয় স্পর্শ করতে নারাজ। ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা, যার মধ্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওও ছিলেন, ইজরায়েলের দাবিকেই সমর্থন করেন। তিনি বলেছিলেন, আলোচনার পরিধি পারমাণবিক প্রশ্নের বাইরে যেতে হবে। ফলে কূটনীতিতে মৌলিক মতভেদ তৈরি হয়। ইজরায়েলের লক্ষ্য পূরণের একমাত্র উপায় হয়ে দাঁড়ায় তেহরানে শাসনব্যবস্থা বদলানো এবং এক অনুগত নতুন সরকার প্রতিষ্ঠা করা।

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে অসহনীয় মুদ্রাস্ফীতিকে ঘিরে ইরানে বিক্ষোভ শুরু হলে ট্রাম্প দ্রুত প্রতিবাদীদের প্রতি সমর্থন জানান। তিনি বলেন, আমেরিকা “প্রস্তুত ও সজ্জিত”। জানুয়ারির প্রথমার্ধে বিভিন্ন প্রদেশে বিক্ষোভ ও দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। ইরানি কর্তৃপক্ষ অভিযোগ তোলে, বিদেশি এজেন্টরা “দাঙ্গা ও সন্ত্রাস” উসকে দিয়েছে। ইজরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদও দাবি করে, তাদের এজেন্টরা ইরানে “মাঠে সক্রিয়”। ৮-৯ জানুয়ারি ইরানি নিরাপত্তা বাহিনী কঠোর দমনপীড়নের মাধ্যমে বিদ্রোহ দমন করে। অন্তত ৩,০০০ মানুষ নিহত হোল।

দমনপীড়নের পর আপাত শান্তি ফিরে এলেও বহিরাগত হুমকি বাড়তেই থাকে।

ট্রাম্প ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের পর থেকে সবচেয়ে বড় আমেরিকান সামরিক উপস্থিতি গড়ে তুলতে শুরু করেন পশ্চিম এশিয়ায়। একইসময়ে কূটনীতিকরা অন্তত তিন দফা বৈঠক করেন। প্রতিবারই ইরান অগ্রগতির দাবি জানায়, কিন্তু আমেরিকা বলে ফাঁক রয়ে গেছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হামাদ আল-বুসাইদি জানান, একটি চুক্তি নাগালের মধ্যেই। তিনি বলেন, ইরান সম্মত হয়েছে পরমাণু অস্ত্র তৈরি না করতে এবং পারমাণবিক উপাদান মজুত না রাখতে।

কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইজরায়েল ও আমেরিকা ইরানে বোমাবর্ষণ শুরু করে-দেশটির শীর্ষ নেতৃত্ব, সরকারি ও সামরিক স্থাপনাগুলিকে লক্ষ্য করে। ইজরায়েল একে “প্রি-এম্পটিভ স্ট্রাইক” আখ্যা দেয় এবং জানায়, “যতদিন প্রয়োজন, ততদিন চলবে।” ট্রাম্প, যার বক্তব্যে শাসনপরিবর্তনের ইঙ্গিত স্পষ্ট, ইরানিদের উদ্দেশে বলেন, “তোমাদের স্বাধীনতার সময় এসে গেছে।” ইরান দ্রুত পাল্টা জবাব দেয়-ইজরায়েল এবং অঞ্চলে অন্তত পাঁচটি আমেরিকান ঘাঁটির দিকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। তেহরানের ভাষ্য, “এটি আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া এক জাতীয় সংগ্রাম।” ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রক সতর্ক করে জানায়, এই আক্রমণ “আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও বিধিব্যবস্থার অবসানের সূচনা” হতে পারে।

আমেরিকা ও ইজরায়েলের লক্ষ্য পশ্চিম এশিয়ায় ক্ষমতার ভারসাম্যে স্থায়ী পরিবর্তন এবং তেহরানে শাসন পরিবর্তন। ইসলামি প্রজাতন্ত্রের কাছে এটি অস্তিত্বের যুদ্ধ-টিকে থাকার সংগ্রাম।

 

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles