বরফ গলাতে বাণিজ্য

যা জানা জরুরি
- রাজনৈতিক টানাপড়েনের মধ্যেই বাণিজ্য ও ভিসা নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ শুরু হয়েছে।
- তিন বছর পর ফের বসছে দুই দেশের বাণিজ্যবিষয়ক যৌথ কর্মীগোষ্ঠী।
- পাশাপাশি কনস্যুলার বিষয়ক যৌথ কর্মীগোষ্ঠীর বৈঠকের দিনক্ষণও ঠিক করার চেষ্টা চলছে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
রাজনৈতিক টানাপড়েনের মধ্যেই বাণিজ্য ও ভিসা নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ শুরু হয়েছে। তিন বছর পর ফের বসছে দুই দেশের বাণিজ্যবিষয়ক যৌথ কর্মীগোষ্ঠী। পাশাপাশি কনস্যুলার বিষয়ক যৌথ কর্মীগোষ্ঠীর বৈঠকের দিনক্ষণও ঠিক করার চেষ্টা চলছে। তবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নয়াদিল্লি সফর নিয়ে অনিশ্চয়তা এখনও কাটেনি। ফলে বড় রাজনৈতিক মতপার্থক্য মেটানোর পাশাপাশি আপাতত দৈনন্দিন সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলি সচল রাখার পথেই এগোতে চাইছে দু’পক্ষ।
বুধবার, ৭ অক্টোবর, নয়াদিল্লির উদ্দেশে রওনা হচ্ছে বাংলাদেশের ১০ সদস্যের প্রতিনিধিদল। ৮ ও ৯ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হবে দুই দেশের বাণিজ্যবিষয়ক যৌথ কর্মীগোষ্ঠীর ১৬তম বৈঠক। বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন বাণিজ্য মন্ত্রকের এফটিএ শাখার অতিরিক্ত সচিব আয়েশা আক্তার। দলে থাকছেন বাণিজ্য, বিদেশ ও রেল মন্ত্রকের আধিকারিকদের পাশাপাশি রাজস্ব, স্থলবন্দর, শুল্ক এবং পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে যুক্ত সংস্থার প্রতিনিধিরাও। ১০ অক্টোবর তাঁদের দেশে ফেরার কথা।
তিন বছরের ব্যবধানে হতে চলা এই বৈঠকের আলোচনায় বাংলাদেশের অন্যতম অগ্রাধিকার হবে শুল্ক ও অশুল্ক বাধা কমানো, স্থলবন্দর দিয়ে পণ্য চলাচল স্বাভাবিক করা এবং ভারতীয় বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রবেশে থাকা প্রতিবন্ধকতা দূর করা। বাংলাদেশের পাটপণ্যের উপর ভারতের অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক পর্যালোচনার দাবিও উঠতে পারে। একই সঙ্গে ভারতীয় সুতো আমদানিতে বাংলাদেশের বিধিনিষেধ, বাণিজ্যঘাটতি কমানো এবং আমদানি-রফতানির অন্যান্য বাধা নিয়েও আলোচনা হওয়ার কথা।
দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কেও গত কয়েক বছরে একাধিক বাধা তৈরি হয়েছে। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ স্থলপথে ভারতের সুতো আমদানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করে। পরে ভারতও স্থলপথে বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, প্লাস্টিক-সহ একাধিক পণ্যের আমদানিতে বিধিনিষেধ জারি করে। পাট ও কিছু বস্ত্রপণ্যের ক্ষেত্রেও পরে বিধিনিষেধ বাড়ে। এর প্রভাব পড়েছে সীমান্তবাণিজ্যে।
তবে আলোচনার পরিধি শুধু পণ্যেই আটকে থাকছে না। কনস্যুলার বিষয়ক যৌথ কর্মীগোষ্ঠীর বৈঠকের দিনক্ষণও ঠিক করার কাজ চলছে। বৈঠকটি হওয়ার কথা ঢাকায়। চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যবসা কিংবা পারিবারিক প্রয়োজনে দুই দেশের নাগরিকদের যাতায়াতে ভিসা পরিষেবা গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায়, এই বৈঠককে ভিসা-সংক্রান্ত সমস্যাগুলি নিয়ে সরাসরি আলোচনার একটি মঞ্চ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে বৈঠকের প্রস্তুতিকে এখনই ভিসানীতিতে কোনও বড় ছাড় বা পরিষেবা পুরোপুরি স্বাভাবিক হওয়ার ঘোষণা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
এই প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগের উদ্যোগের পিছনে রয়েছে দীর্ঘ রাজনৈতিক টানাপড়েন। ২০২৪ সালের অগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি হয় এবং নিয়মিত বাণিজ্য আলোচনাও থমকে যায়। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকায় হয়েছিল বাণিজ্যবিষয়ক যৌথ কর্মীগোষ্ঠীর ১৫তম বৈঠক। তার পর এবারই ফের সেই আলোচনা শুরু হচ্ছে।
তবে দিল্লি–ঢাকা সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রশ্নটি এখনও অমীমাংসিত—তারেক রহমানের নয়াদিল্লি সফর। ভারত ও বাংলাদেশ সফরের তারিখ নিয়ে এখনও একমত হতে পারেনি। ব্যস্ত কূটনৈতিক সূচি এবং কিছু অমীমাংসিত বিষয় এই সফর পিছিয়ে দেওয়ার অন্যতম কারণ বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
ফলে বাণিজ্য ও কনস্যুলার বৈঠককে সম্পর্কের সব সমস্যার সমাধান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এগুলি নিয়মিত যোগাযোগ ফেরানোর প্রাথমিক ধাপ। কোন সমস্যা আধিকারিক পর্যায়ে মেটানো সম্ভব, আর কোনটির জন্য রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রয়োজন—আলোচনার মাধ্যমে সেই সীমারেখাও স্পষ্ট হতে পারে।
এখন নজর থাকবে দিল্লির বাণিজ্য বৈঠক থেকে কোনও বাস্তব সিদ্ধান্ত বেরিয়ে আসে কি না এবং ঢাকায় কনস্যুলার বৈঠকের দিনক্ষণ চূড়ান্ত হয় কি না, তার দিকে। সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আসল পরীক্ষা অবশ্য বৈঠকের ঘোষণায় নয়—স্থলবন্দরে পণ্য চলাচল, বাণিজ্যে বাধা এবং সাধারণ মানুষের ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রে বাস্তবে কতটা পরিবর্তন আসে, তাতেই।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



