তেলের বাতি থেকে রাষ্ট্রপুঞ্জ

যা জানা জরুরি
- গায়ানার প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে রাষ্ট্রপুঞ্জের শীর্ষ পদের দৌড়ে ক্যারোলিন রদ্রিগেজ-বিরকেট; নির্বাচিত হলে প্রথম মহিলা ও প্রথম ক্যারিবীয় মহাসচিব রাষ্ট্রপুঞ্জ যখন কার্যকারিতা, বিশ্বাসযোগ্যতা এবং ভবিষ্যৎ…
- এই পদের জন্য মনোনয়ন পাওয়া তিনিই প্রথম ক্যারিবীয় প্রার্থী।
- নির্বাচিত হলে রাষ্ট্রপুঞ্জের আট দশকের ইতিহাসে প্রথম মহিলা মহাসচিবও হবেন তিনি।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
গায়ানার প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে রাষ্ট্রপুঞ্জের শীর্ষ পদের দৌড়ে ক্যারোলিন রদ্রিগেজ-বিরকেট; নির্বাচিত হলে প্রথম মহিলা ও প্রথম ক্যারিবীয় মহাসচিব
রাষ্ট্রপুঞ্জ যখন কার্যকারিতা, বিশ্বাসযোগ্যতা এবং ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে এক ‘গুরুতর সন্ধিক্ষণে’, তখন সংস্থাটির মহাসচিব হওয়ার দৌড়ে ইতিহাসের দরজায় কড়া নাড়ছেন গায়ানার কূটনীতিক ক্যারোলিন রদ্রিগেজ-বিরকেট। এই পদের জন্য মনোনয়ন পাওয়া তিনিই প্রথম ক্যারিবীয় প্রার্থী। নির্বাচিত হলে রাষ্ট্রপুঞ্জের আট দশকের ইতিহাসে প্রথম মহিলা মহাসচিবও হবেন তিনি।
রদ্রিগেজ-বিরকেটের উত্থানের গল্প যেন একেবারে সিনেমার চিত্রনাট্য। গায়ানার প্রত্যন্ত আদিবাসী গ্রাম সান্তা রোসায় একটি আরাওয়াক পরিবারে তাঁর জন্ম। শৈশবে গ্রামে ছিল না বিদ্যুৎ, কলের জল কিংবা ভালো সড়ক। তেলের বাতির আলোয় পড়াশোনা করতে হতো তাঁকে। কাছাকাছি মাধ্যমিক স্কুল না থাকায় উচ্চশিক্ষার জন্য অল্প বয়সেই বাড়ি ছাড়তে হয়।
কর্মজীবনের শুরু স্কুলশিক্ষক হিসেবে। কিন্তু সেখানেই থেমে থাকেননি। মাত্র ২৭ বছর বয়সে গায়ানার আদিবাসী-বিষয়ক মন্ত্রী হন রদ্রিগেজ-বিরকেট। পরে দায়িত্ব সামলেছেন বিদেশ এবং বৈদেশিক বাণিজ্য মন্ত্রকেরও। জাতীয় রাজনীতির পাশাপাশি একাধিক আন্তর্জাতিক দায়িত্ব পালন করে শেষ পর্যন্ত গায়ানার রাষ্ট্রপুঞ্জের স্থায়ী প্রতিনিধি হয়েছেন তিনি।
নিজের ক্যারিবীয় ও আদিবাসী পরিচয়কেই তিনি নিজের অন্যতম শক্তি বলে মনে করেন। ছোট রাষ্ট্রগুলির সীমাবদ্ধতা এবং প্রয়োজন তিনি কাছ থেকে দেখেছেন। তাঁর মতে, বাণিজ্য, জলবায়ু পরিবর্তন কিংবা উন্নয়নের মতো বড় সমস্যার সমাধান কোনও ছোট দেশ একা করতে পারে না। সহযোগিতা তাই তাদের কাছে নিছক কূটনৈতিক পছন্দ নয়, বরং অস্তিত্বের প্রয়োজন।
বহু জাতিগোষ্ঠী ও সংস্কৃতির দেশ গায়ানায় বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতাও তাঁকে ভিন্ন মত শুনতে এবং সমঝোতার পথ খুঁজতে শিখিয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। গায়ানায় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি আফ্রিকা, এশিয়া ও ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত মানুষের বসবাস রয়েছে। রদ্রিগেজ-বিরকেটের বক্তব্য, ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি বোঝা, সকলের কথা শোনা এবং একসঙ্গে সমাধানের পথ খোঁয়াই রাষ্ট্রপুঞ্জের মূল দর্শন।
তাঁর প্রার্থিতার সবচেয়ে বড় শক্তি অবশ্য ক্যারিবীয় অঞ্চলের সম্মিলিত সমর্থন। জুলাইয়ের সর্বশেষ শীর্ষ বৈঠকে ক্যারিবীয় সম্প্রদায়ের নেতারা তাঁর প্রতি সমর্থন নিশ্চিত করেছেন। এখনও পর্যন্ত মহাসচিব পদের দাবিদারদের মধ্যে তিনিই একমাত্র প্রার্থী, যাঁর পিছনে নিজের অঞ্চলের এমন ঐক্যবদ্ধ সমর্থন রয়েছে।
নির্বাচিত হলে জলবায়ু পরিবর্তন এবং তার মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় অর্থায়নকে অগ্রাধিকার দিতে চান রদ্রিগেজ-বিরকেট। ঘূর্ণিঝড়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং উপকূল ক্ষয়ের অভিঘাতে ক্যারিবীয় দেশগুলির অর্থনীতি ক্রমশ চাপের মুখে। একটি বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড়ের পর পুনর্গঠন করতেই ছোট দেশগুলিকে বহু বছরের উন্নয়নমূলক অর্থ ব্যয় করতে হয়। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য এই দেশগুলির ঐতিহাসিক দায় অত্যন্ত সামান্য।
জামাইকার পরিবেশমন্ত্রী ম্যাথু সামুদার অভিযোগ, বর্তমান আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন ব্যবস্থা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। গত বছরের অক্টোবরে ঘূর্ণিঝড় মেলিসায় জামাইকার প্রায় এক হাজার কোটি ডলারের ক্ষতি হলেও রাষ্ট্রপুঞ্জের ক্ষয়ক্ষতি তহবিল থেকে একটি দেশ সর্বোচ্চ দুই কোটি ডলার পেতে পারে। তহবিলটি চালু হওয়ার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও বাস্তবে বিতরণ হওয়া অর্থ প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য।
রদ্রিগেজ-বিরকেটের মতে, আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের অভাব নেই, ঘাটতি রয়েছে বাস্তবায়নে। অর্থ বরাদ্দ থাকলেও জটিল আবেদনপ্রক্রিয়া ও আমলাতান্ত্রিক বাধার কারণে বিপন্ন দেশগুলি সময়মতো তা হাতে পায় না। তাই শুধু তহবিল বাড়ানো নয়, অর্থ পাওয়ার পথও সহজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। তাঁর লক্ষ্য, দুর্যোগের পরে জরুরি সহায়তা যেন কাগজপত্রের গোলকধাঁধায় আটকে না থাকে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে আর একটি বিশ্বযুদ্ধ ঠেকানোর লক্ষ্যেই জন্ম হয়েছিল রাষ্ট্রপুঞ্জের। কিন্তু আজ ইউক্রেন থেকে মধ্যপ্রাচ্য—একাধিক সংঘাতের ক্ষেত্রে সংস্থাটির সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট। নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের ভেটো, বৃহৎ শক্তিগুলির প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং উন্নয়নমূলক প্রতিষ্ঠানের অর্থাভাব রাষ্ট্রপুঞ্জের কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে।
তবু রদ্রিগেজ-বিরকেটের অবস্থান স্পষ্ট—রাষ্ট্রপুঞ্জকে দুর্বল করা নয়, বরং আরও কার্যকর করে তোলা প্রয়োজন। কারণ ছোট ও উন্নয়নশীল দেশগুলির কাছে এমন একটি বহুপাক্ষিক মঞ্চের কোনও বিকল্প নেই। তাঁর প্রার্থিতা তাই শুধু ব্যক্তিগত রাজনৈতিক সাফল্যের লড়াই নয়; আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্র থেকে দীর্ঘদিন দূরে থাকা ক্যারিবীয় ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বের দাবিও।
শেষ পর্যন্ত তাঁর ভাগ্য নির্ধারণ করবে নিরাপত্তা পরিষদের বৃহৎ শক্তিগুলির সমীকরণ এবং সাধারণ পরিষদের সমর্থন। কিন্তু সান্তা রোসার তেলের বাতির আলো থেকে রাষ্ট্রপুঞ্জের সর্বোচ্চ পদের দোরগোড়ায় পৌঁছে রদ্রিগেজ-বিরকেট ইতিমধ্যেই একটি ঐতিহাসিক পথ পেরিয়ে এসেছেন। এখন প্রশ্ন একটাই—বিশ্বের সবচেয়ে বড় বহুপাক্ষিক সংস্থা কি প্রথম বার তার নেতৃত্ব এক মহিলা ক্যারিবীয় নেত্রীর হাতে তুলে দিতে প্রস্তুত?
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



