রাজ্য

আগে ইউসিসি, পরে ‘লাভ–ল্যান্ড জিহাদ’ বিরোধী কঠোর আইন: ছয় মাস চাইলেন শুভেন্দু

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • পশ্চিমবঙ্গে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বা ইউসিসি কার্যকর করার পরে ‘লাভ জিহাদ’, ‘ল্যান্ড জিহাদ’ এবং ধর্মান্তরণের বিরুদ্ধে কঠোর আইন আনার প্রতিশ্রুতি দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
  • সেই কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য ছয় মাস সময় চেয়েছেন তিনি।
  • রবিবার, ৪ অক্টোবর কলকাতায় বিশ্ব হিন্দু পরিষদের প্রাক্তন সভাপতি অশোক সিঙ্ঘলের জন্মশতবর্ষের অনুষ্ঠানে তাঁর এই ঘোষণা।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

পশ্চিমবঙ্গে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বা ইউসিসি কার্যকর করার পরে ‘লাভ জিহাদ’, ‘ল্যান্ড জিহাদ’ এবং ধর্মান্তরণের বিরুদ্ধে কঠোর আইন আনার প্রতিশ্রুতি দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সেই কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য ছয় মাস সময় চেয়েছেন তিনি। রবিবার, ৪ অক্টোবর কলকাতায় বিশ্ব হিন্দু পরিষদের প্রাক্তন সভাপতি অশোক সিঙ্ঘলের জন্মশতবর্ষের অনুষ্ঠানে তাঁর এই ঘোষণা। একই সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর আশ্বাস, রাজ্যের বিজেপি সরকার সংবিধান মেনেই কাজ করবে।

শুভেন্দু বলেন, ইউসিসি কার্যকর করার ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ উত্তরাখণ্ড ও গুজরাতের পথ অনুসরণ করবে। তার পরে তাঁর উল্লিখিত বিষয়গুলিতে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সমবেত সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি দাবি করেন, দীর্ঘ পঞ্চাশ বছর পরে বহু প্রত্যাশা নিয়ে মানুষ একটি জাতীয়তাবাদী সরকারকে ক্ষমতায় এনেছেন। সেই প্রত্যাশা বিফলে যেতে দেওয়া হবে না। তাঁর আবেদন, “আমাকে আর ছয় মাস সময় দিন।”

ইউসিসি নিয়ে প্রশাসনিক প্রস্তুতি অবশ্য আগেই শুরু হয়েছে। জুলাই মাসে সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি রঞ্জনা প্রকাশ দেশাইয়ের নেতৃত্বে নয় সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছিল রাজ্য সরকার। ধর্ম, বিশ্বাস বা সম্প্রদায়নির্বিশেষে বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ ও উত্তরাধিকারের মতো বিষয়ে অভিন্ন বিধান তৈরির খসড়া প্রস্তুত করাই সেই উদ্যোগের উদ্দেশ্য। কমিটি গঠনের আগে ২ জুলাই রাজ্য মন্ত্রিসভায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছিল।

কমিটিতে প্রাক্তন রাজ্যপাল তথাগত রায়, প্রশাসনিক আধিকারিক, শিক্ষাবিদ এবং আইনজীবীদের রাখা হয়েছে। জুলাইয়ের বিজ্ঞপ্তি সংক্রান্ত প্রতিবেদনে তফসিলি জনজাতি ও প্রাচীন আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে প্রস্তাবিত বিধির আওতার বাইরে রাখার কথাও উল্লেখ ছিল। ফলে ‘অভিন্ন’ বিধি কোন কোন নাগরিকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে, তার ব্যতিক্রম কী থাকবে এবং বিভিন্ন ব্যক্তিগত আইনের সঙ্গে তার সম্পর্ক কী হবে, চূড়ান্ত খসড়া বোঝার ক্ষেত্রে সেগুলি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

এই উদ্যোগের সাংবিধানিক পটভূমিতে রয়েছে রাষ্ট্র পরিচালনার নির্দেশমূলক নীতির অন্তর্গত ৪৪ নম্বর অনুচ্ছেদ। সেখানে নাগরিকদের জন্য সারা দেশে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করার কথা বলা হয়েছে। আবার ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদ বিবেকের স্বাধীনতা এবং ধর্ম গ্রহণ, পালন ও প্রচারের অধিকার স্বীকার করে; জনশৃঙ্খলা, নৈতিকতা, স্বাস্থ্য এবং অন্যান্য মৌলিক অধিকারের শর্তও রয়েছে। তাই আইন প্রণয়নের আলোচনায় এই সাংবিধানিক দিকগুলিও প্রাসঙ্গিক।

রবিবারের বক্তৃতায় আইন আনার অঙ্গীকারের পাশাপাশি রাজনৈতিক বার্তাও স্পষ্ট ছিল। ভারতীয় সংস্কৃতি এবং উপাসনাস্থলের উপর আক্রমণ বরদাস্ত করা হবে না বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী। পূর্ববর্তী সরকার বিভাজনের রাজনীতি করত বলে অভিযোগ তুলে তিনি সমর্থকদের ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান। সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে সংবিধান মানার আশ্বাস এবং নিজের রাজনৈতিক সমর্থকদের প্রত্যাশা পূরণের প্রতিশ্রুতি একই বক্তৃতায় পাশাপাশি তুলে ধরেন শুভেন্দু।

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় প্রসঙ্গেও সরব হন তিনি। একটি সংবাদপত্রের প্রতিবেদনের উল্লেখ করে সেখানে তাঁর ভাষায় জাতীয়তাবাদী যুবকদের প্রতিবাদের কথা বলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনও কেউ কেউ ‘আজাদি’ স্লোগান তোলেন বলে দাবি করে তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দেন। রাজ্যে দেশবিরোধী কার্যকলাপ চলতে দেওয়া হবে না বলেও জানান। তবে এসব বক্তব্য মুখ্যমন্ত্রীর রাজনৈতিক অভিযোগ; কোনও নির্দিষ্ট ঘটনার বিচারিক সিদ্ধান্ত হিসেবে তিনি তা উপস্থাপন করেননি।

তৃণমূলের পরাজয়ের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে শুভেন্দুর অভিযোগ, হিন্দুদের ধর্মীয় অনুভূতি, সংগঠন ও ঐতিহ্যে বারবার আঘাত করা হয়েছিল। পাহাড়ের বিভিন্ন জনগোষ্ঠী, মতুয়া, আদিবাসী এবং বাঙালি ও অবাঙালিদের মধ্যে বিভেদ তৈরির চেষ্টাও হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, মানুষ দীর্ঘদিন সহ্য করার পরে আগের সরকারকে বিদায় দিয়েছেন। এই অভিযোগগুলির সূত্র ধরে বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক দিশাও ব্যাখ্যা করেন মুখ্যমন্ত্রী।

ধর্মীয় কর্মসূচির কথাও উঠে আসে অনুষ্ঠানে। নভেম্বরে নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে কুড়ি হাজার মানুষের হনুমান চালিশা পাঠ এবং ২৯ ডিসেম্বর দশ লক্ষ মানুষের গীতা পাঠের পরিকল্পনার কথা জানান শুভেন্দু। আগামী বছরের গঙ্গাসাগর মেলার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। সেখানে আন্তর্জাতিক মানের পরিষেবা দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে বলে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন।

পাশাপাশি ধর্মীয় পর্যটনকেন্দ্রগুলিকে ঘিরে এক হাজার কোটি টাকার একটি পর্যটন সার্কিট গড়ে তোলার ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। দু’বছরের মধ্যে প্রকল্পটি সম্পূর্ণ করার কথা বলেছেন তিনি। এই পরিকল্পনায় মানুষের পরামর্শ ও সহযোগিতাও চেয়েছেন শুভেন্দু। অর্থাৎ আইন প্রণয়নের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে ধর্মীয় পর্যটন ও বৃহৎ ধর্মীয় সমাবেশের কর্মসূচিকেও একই মঞ্চ থেকে সামনে আনল সরকার।

তবে ঘোষণার সঙ্গে বাস্তব আইনি ব্যবস্থার পার্থক্য রয়েছে। ‘লাভ জিহাদ’ ও ‘ল্যান্ড জিহাদ’ শব্দবন্ধ মুখ্যমন্ত্রীর বক্তৃতায় ব্যবহৃত হলেও প্রস্তাবিত আইনে ঠিক কোন কাজ অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত হবে, কী প্রমাণ প্রয়োজন হবে কিংবা শাস্তির মাত্রা কত হবে, আলোচিত সংবাদপ্রতিবেদনগুলিতে তার বিস্তারিত নেই। ধর্মান্তরণ সংক্রান্ত বিধানে স্বেচ্ছায় সিদ্ধান্ত এবং বলপ্রয়োগ বা প্রতারণার অভিযোগ কীভাবে পৃথক করা হবে, সেটিও খসড়ার বিষয়। আইনের ভাষা প্রকাশিত হলে তবেই বোঝা যাবে, ঘোষিত উদ্দেশ্যের সঙ্গে তার প্রয়োগের পরিধি এবং নাগরিকের অধিকার রক্ষার ব্যবস্থা কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকছে।

একইভাবে বিবাহ, উত্তরাধিকার বা জমির লেনদেনের মতো পৃথক ক্ষেত্রকে রাজনৈতিক বক্তৃতায় একসঙ্গে উল্লেখ করা হলেও প্রত্যেকটির আইনি পরিধি আলাদা করে স্পষ্ট করা প্রয়োজন। অভিযোগ দায়েরের অধিকার কার থাকবে, তদন্তের প্রক্রিয়া কী হবে এবং নাগরিকের আপত্তি জানানোর সুযোগ কোথায় থাকবে, আইনটির বাস্তব প্রভাব বুঝতে এসব প্রশ্নের উত্তর দরকার। কেবল কঠোরতার প্রতিশ্রুতি থেকে সেই উত্তর পাওয়া যায় না।

আপাতত রবিবারের ঘোষণায় সরকারের অগ্রাধিকারের ক্রম স্পষ্ট হয়েছে: প্রথমে ইউসিসি, তার পরে মুখ্যমন্ত্রীর উল্লিখিত বিষয়গুলিতে নতুন আইন। এখন নজর থাকবে কমিটির সুপারিশ, বিধানসভায় পেশ হওয়া খসড়া এবং কার্যকর করার সময়সূচির দিকে। ছয় মাসের আবেদনকে নির্দিষ্ট প্রশাসনিক পদক্ষেপে রূপ দেওয়া এবং প্রতিশ্রুত সাংবিধানিক সীমা বজায় রাখাই হবে এই ঘোষণার পরবর্তী পরীক্ষার বিষয়।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles