গরুচোর সন্দেহে গাড়ি ধাওয়া, শিলিগুড়িতে গণপিটুনিতে নিহত দুই

যা জানা জরুরি
- গরুচোর সন্দেহে গাড়ি ধাওয়া করে দু’জনকে পিটিয়ে খুনের অভিযোগ উঠল শিলিগুড়ি সংলগ্ন মাটিগাড়া ও বাগডোগরা এলাকায়।
- একটি পিকআপ ভ্যানে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়, ভাঙচুর চলে অন্য একটি গাড়িতেও।
- নিহতের পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
গরুচোর সন্দেহে গাড়ি ধাওয়া করে দু’জনকে পিটিয়ে খুনের অভিযোগ উঠল শিলিগুড়ি সংলগ্ন মাটিগাড়া ও বাগডোগরা এলাকায়। হামলায় আরও তিন জন আহত হয়েছেন। একটি পিকআপ ভ্যানে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়, ভাঙচুর চলে অন্য একটি গাড়িতেও। নিহতের পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। রবিবার পর্যন্ত গণপিটুনিতে জড়িত কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি বলে পুলিশ জানিয়েছে।
নিহতদের মধ্যে রয়েছেন উত্তর দিনাজপুরের চোপড়ার বাসিন্দা মহম্মদ শহিদ আখতার, বয়স ৪৫। তিনি পিকআপ ভ্যানটি চালাচ্ছিলেন। অন্য জন হরিয়ানার বাসিন্দা, ২৮ বছরের শাদ মহম্মদ ওরফে সাজ্জাদ মহম্মদ। পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, শহিদ ঘটনাস্থলেই মারা যান। গুরুতর আহত অবস্থায় উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরে মৃত্যু হয় সাজ্জাদের। আহতদের চিকিৎসা চলছে।
প্রকাশিত বিবরণ অনুযায়ী, গভীর রাত আড়াইটে থেকে তিনটের মধ্যে ঘটনাটির সূত্রপাত। একটি পিকআপ ভ্যান ও একটি ছোট গাড়ি মাটিগাড়ার তারাবাড়ি এলাকায় পৌঁছলে স্থানীয়দের একাংশের সন্দেহ হয়। গরুচুরির উদ্দেশ্যে ওই ব্যক্তিরা এলাকায় এসেছেন বলে অভিযোগ তুলে তাঁদের ধাওয়া করা হয়। তারাবাড়ি থেকে বাগডোগরার ধিমাল বস্তি পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে হামলা। বালাসন নদীর কাছে পিকআপ ভ্যানটিকে আটকানো হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শিলিগুড়ি ও আশপাশের গ্রামীণ এলাকায় কিছু দিন ধরে রাতে গবাদিপশু চুরির ঘটনা ঘটছিল। পশুপালনের উপর নির্ভরশীল পরিবারগুলির মধ্যে তা নিয়ে উদ্বেগ ছিল। কয়েক জন বাসিন্দার দাবি, রাতের অন্ধকারে গাড়ি নিয়ে এসে গরু তুলে নিয়ে যেত একটি চক্র। সেই সন্দেহ থেকেই ওই রাতে গাড়ির পিছু নেওয়া হয়। তবে এলাকার আগের চুরির অভিযোগের সঙ্গে আক্রান্ত ব্যক্তিদের যোগসূত্র তদন্তে যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযোগ, গাড়ি ঘিরে ফেলার পরে সওয়ারিদের উপর চড়াও হয় জনতা। মারধরের পাশাপাশি চলে ভাঙচুর। পিকআপ ভ্যানে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। অন্য গাড়িটিও হামলার মুখে পড়ে। খবর পেয়ে মাটিগাড়া ও বাগডোগরা থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছয়। শিলিগুড়ি পুলিশের পদস্থ আধিকারিকেরাও যান। আহতদের উদ্ধার করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। হামলার পরে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
আহত তিন জনের নাম আমির সাত্তার, আক্রম খান এবং আরিফ খান। তাঁরা প্রত্যেকেই হরিয়ানার বাসিন্দা। পুলিশের দেওয়া পরিচয় অনুযায়ী, নিহত ও আহতদের মধ্যে চার জনই হরিয়ানার। চোপড়ার বাসিন্দা শহিদ ছিলেন ভ্যানের চালক। গাড়িতে আসা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ওঠা গরুচুরির অভিযোগও খতিয়ে দেখছে পুলিশ; তদন্ত চলছে হামলা ও ভাঙচুরের।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, হামলার মুখে চার জন পালিয়ে বাগডোগরার ব্যাঙডুবি সংলগ্ন সেনাছাউনিতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। সেখানে প্রবেশের ঘটনায় তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানায় সেনা এবং পুলিশের হাতে তুলে দেয়। পুলিশ তাঁদের হাসপাতালে পাঠায়। তাঁদের মধ্যে এক জনের মৃত্যু হয়। বাকি তিন জন চিকিৎসাধীন। এই বিবরণে হামলা থেকে বাঁচতে আক্রান্তদের একাধিক জায়গায় পালানোর কথা উঠে এসেছে।
শহিদের স্ত্রী জানিয়েছেন, তাঁর স্বামী প্রায় দশ বছর ধরে গরু ও মহিষের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। অন্য দিনের মতোই ওই রাতেও পিকআপ ভ্যান নিয়ে বেরিয়েছিলেন। পরদিন সকালে ফোনে তাঁর মৃত্যুর খবর পান পরিবারের সদস্যেরা। দুই মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে এখন স্বামীহারা তিনি। তাঁর প্রশ্ন, সন্দেহ হয়ে থাকলে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হল না কেন? স্বামীর হত্যার বিচার চেয়ে থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন তিনি।
শিলিগুড়ির পুলিশ কমিশনার সৈয়দ ওয়াকার রেজা সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, হামলাকারীদের খোঁজ চলছে। নিহতের স্ত্রীর অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা দায়ের হয়েছে। গণপিটুনিতে হত্যা, গুরুতর আঘাত, সম্পত্তির ক্ষতিসাধন এবং অগ্নিসংযোগের অভিযোগ রাখা হয়েছে মামলায়। পুলিশ জানিয়েছে, বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে ঘটনাটি ঘটায় গোটা ঘটনাক্রম খতিয়ে দেখা হচ্ছে। গরুচুরি বা পাচারের অভিযোগ এবং প্রাণঘাতী গণহামলা—উভয় বিষয়েই তদন্ত চলছে। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ ও হত্যায় জড়িতদের শনাক্ত করার দায়িত্ব এখন তদন্তকারীদের।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



