পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রাম বিধানসভা উপনির্বাচনের আগে সংখ্যালঘু ভোটারদের কাছে বিজেপির সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার আহ্বান জানালেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। শুক্রবার, ২ অক্টোবর, নন্দীগ্রামের বিরুলিয়া বাজারে প্রচারে গিয়ে তিনি ভোটের দিন ৬ অক্টোবরকে বন্ধুত্ব পাতানোর ‘শুভ দিন’ বলে উল্লেখ করেন। বিজেপি প্রার্থী হাসিরানি রথের সমর্থনে তাঁর আবেদন, সংখ্যালঘুরা যেন আর দলের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে না থাকেন।

শুভেন্দু বলেন, বিজেপির দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়ানোর এটাই উপযুক্ত সময়। ধর্মীয় স্লোগান নিয়েও সংখ্যালঘুদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, বিজেপির কর্মীসমর্থকেরা ‘জয় শ্রীরাম’ বললেও অন্য কাউকে তা বলতে বাধ্য করা হচ্ছে না। কেউ চাইলে সেই স্লোগান না দিয়ে ‘ভারতমাতা কি জয়’ বলতে পারেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সকলের জন্য কাজ করেন এবং মুখ্যমন্ত্রীও সকলের জন্য কাজ করবেন বলে তিনি দাবি করেন।

নন্দীগ্রামের সঙ্গে নিজের সম্পর্কের কথা তুলে ধরে শুভেন্দু আশ্বাস দেন, বিধায়ক থাকাকালীন যে কাজ করেছেন, মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তার তিন গুণ কাজ করবেন। নন্দীগ্রামের স্থানীয় সাধারণ মানুষ আগে যে পরিষেবা পেতেন, তা বজায় থাকবে। হাসিরানি নির্বাচিত হলে তাঁর মাধ্যমেও এলাকার মানুষ সহায়তা পাবেন। নন্দীগ্রামকে নিজের সম্মানের আসন হিসেবে তুলে ধরে ভোটারদের ফের পদ্মফুলে সমর্থন দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

তবে শুক্রবারের এই বন্ধুত্বের বার্তার সঙ্গে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি তাঁর বক্তব্যের সুরে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। হলদিয়ার একটি সভায় শুভেন্দু নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরের উপনির্বাচনকে সংখ্যালঘুদের ‘পরীক্ষা’ বলে বর্ণনা করেছিলেন। তাঁরা সরকারের সঙ্গে থাকতে এবং মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে কাজ করতে চান কি না, ভোটে তা বোঝাতে হবে বলে জানিয়েছিলেন তিনি। সেই পরীক্ষায় সংখ্যালঘুরা পাশ করবেন, না ফেল করবেন, তা দেখার কথাও বলেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী।

আগের ওই মন্তব্যের বিরোধিতা করে তৃণমূল সাংসদ সৌগত রায় একে সংখ্যালঘুদের প্রতি হুমকি বলে অভিযোগ করেছিলেন। বিজেপি নেত্রী কেয়া ঘোষ অবশ্য দাবি করেছিলেন, মুখ্যমন্ত্রী উন্নয়নের পক্ষে ভোট দেওয়ার আবেদনই জানিয়েছেন। অন্যদিকে রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বলেছিলেন, ধর্মের ভিত্তিতে ভোটারদের সংখ্যাগুরু ও সংখ্যালঘু হিসেবে ভাগ করার পক্ষে তাঁর দল নয়। পশ্চিমবঙ্গের প্রতিটি বাসিন্দাকেই তাঁরা নিজেদের মানুষ বলে মনে করেন।

শুক্রবারের প্রচারে তৃণমূলকেও আক্রমণ করেন শুভেন্দু। দলের বিভাজন এবং দুই শিবিরকে পৃথক নাম ও প্রতীক বরাদ্দের প্রসঙ্গ তুলে তাঁর দাবি, পুরনো তৃণমূলের অস্তিত্ব আর নেই। এই অবস্থায় সংখ্যালঘুদের বিজেপি থেকে দূরে থাকলে লাভ হবে না বলে যুক্তি দেন তিনি। একই সঙ্গে বিরোধী প্রার্থীদের জামানত বাজেয়াপ্ত করার আবেদন জানান। তবে তৃণমূলের অস্তিত্বহীনতার বক্তব্যটি তাঁর রাজনৈতিক দাবি।

এই কেন্দ্রে মুসলিম ভোটারের অনুপাত প্রায় ২৬ শতাংশ। ফলে তাঁদের সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা নির্বাচনী অঙ্কে গুরুত্বপূর্ণ। একই দিনে ভোট হতে চলা মুর্শিদাবাদের রেজিনগরে মুসলিম ভোটারের অনুপাত প্রায় ৬৫ শতাংশ। দুই আসনেই সংখ্যালঘুদের কাছে পৌঁছনোর চেষ্টা করছে বিজেপি। নন্দীগ্রামে হাসিরানি রথকে প্রার্থী করার সঙ্গে আবেগের বিষয়টিও যুক্ত: তিনি শুভেন্দুর নিহত প্রাক্তন সহকারী চন্দ্রনাথ রথের মা।

২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রাম ও ভবানীপুর, দুই কেন্দ্রেই জিতেছিলেন শুভেন্দু। পরে ভবানীপুর আসনটি রেখে নন্দীগ্রামের বিধায়ক পদ ছাড়ায় এখানে উপনির্বাচন হচ্ছে। নন্দীগ্রামে এ বার তাঁর জয়ের ব্যবধান ছিল ৯,৬৬৫ ভোট। ২০২১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে তিনি জিতেছিলেন ১,৯৫৬ ভোটে। ফলে নিজের ছেড়ে যাওয়া আসনে বিজেপির সমর্থন ধরে রাখাও তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ।

নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরে ভোটগ্রহণ ৬ অক্টোবর, গণনা ৯ অক্টোবর। প্রচারের শেষ পর্যায়ে তাই উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি, ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং সংখ্যালঘুদের প্রতি বন্ধুত্বের আহ্বানকে একসঙ্গে সামনে আনছেন মুখ্যমন্ত্রী। আগের ‘পরীক্ষা’র ভাষা থেকে এখনকার এই আহ্বান কতটা আস্থা তৈরি করতে পারে, নির্বাচনের ফলেই তার রাজনৈতিক প্রভাব বোঝা যাবে।