আগে নিজের সন্তান

যা জানা জরুরি
- পানমশলা ও গুটখার বিজ্ঞাপনে মুখ দেখানো তারকাদের উদ্দেশে এ বার সরাসরি প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন মহারাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের কমিশনার তুকারাম মুন্ধে—যে জিনিস অন্যকে…
- এনডিটিভি যুবা অনুষ্ঠানে মুন্ধের এই মন্তব্য নতুন করে সামনে আনল বিজ্ঞাপনের মুখ হিসেবে তারকাদের সামাজিক দায়িত্বের প্রশ্ন।
- তাঁর বক্তব্যের মূল কথা, কাউকে কোনও অভ্যাস গ্রহণের পরামর্শ দেওয়ার আগে নিজের জীবনেও তার দায় নিতে হবে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
পানমশলা ও গুটখার বিজ্ঞাপনে মুখ দেখানো তারকাদের উদ্দেশে এ বার সরাসরি প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন মহারাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের কমিশনার তুকারাম মুন্ধে—যে জিনিস অন্যকে খেতে বলছেন, নিজের সন্তানদেরও কি তা খাওয়াবেন?
এনডিটিভি যুবা অনুষ্ঠানে মুন্ধের এই মন্তব্য নতুন করে সামনে আনল বিজ্ঞাপনের মুখ হিসেবে তারকাদের সামাজিক দায়িত্বের প্রশ্ন। তাঁর বক্তব্যের মূল কথা, কাউকে কোনও অভ্যাস গ্রহণের পরামর্শ দেওয়ার আগে নিজের জীবনেও তার দায় নিতে হবে। ব্যক্তিগত জীবনে এক নিয়ম আর পেশাগত জীবনে অন্য নিয়ম—এই দ্বৈত মানদণ্ড তিনি মানতে রাজি নন।
মুন্ধে কার্যত প্রশ্ন তুলেছেন, পান বা গুটখার বিজ্ঞাপনে অংশ নেওয়া তারকারা নিজেরাও কি সেই পণ্য ব্যবহার করেন? করলে সন্তানদেরও কি একই অভ্যাসে উৎসাহিত করবেন? তাঁর মতে, জনপ্রিয়তার আড়ালে এমন প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। তোষামোদ কিংবা পরিস্থিতি অনুযায়ী অবস্থান বদলানোর প্রবণতার বিরুদ্ধেও নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন তিনি।
শুধু বিজ্ঞাপনে মুখ দেখানোই অভিনেতার কাজ, আর পণ্যের দায় পুরোপুরি প্রস্তুতকারকের—এই যুক্তিও মানছেন না মুন্ধে। তাঁর বক্তব্য, জনপ্রিয় অভিনেতা বা প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বরা পেশার দোহাই দিয়ে সব দায় এড়াতে পারেন না। তাঁরা মানুষকে কী খেতে, কী ব্যবহার করতে বা কী বিশ্বাস করতে বলছেন, সে বিষয়ে সচেতন থাকা প্রয়োজন। বিষয়টি শুধু নৈতিকতার নয়, আইনি দায়িত্বেরও। খাদ্য বা ওষুধ নিয়ে বিভ্রান্তিকর দাবি করার ক্ষেত্রে কাউকেই ছাড় দেওয়া হয়নি।
বিতর্কের কেন্দ্রে ‘বিমল’
মুন্ধের মন্তব্যের পটভূমিতে রয়েছে বিমল এলাচের বিজ্ঞাপন। মহারাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন শাহরুখ খান, অজয় দেবগন ও টাইগার শ্রফকে কারণ দর্শানোর নোটিস দিয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার অভিযোগ, এলাচের প্রচারের আড়ালে মহারাষ্ট্রে নিষিদ্ধ বিমল পানমশলার পরোক্ষ বিজ্ঞাপন করা হচ্ছে।
১১ অগস্টের নোটিসে তিন অভিনেতাকে ১৫ দিনের মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছিল। পাশাপাশি বিজ্ঞাপনে অংশ নেওয়া বন্ধ করার নির্দেশও দেওয়া হয়। ২৩ সেপ্টেম্বরের একটি প্রতিবেদনে মুন্ধে জানিয়েছিলেন, দুই অভিনেতা জবাব দিয়েছেন। অন্য জন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জবাব দেননি।
এই বিতর্কের মধ্যেই রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর একটি ভিডিয়ো এক্সে শেয়ার করেছিলেন মুন্ধে। সেখানে রাষ্ট্রপতি জনপ্রিয় অভিনেতাদের স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর খাদ্যপণ্যের বিজ্ঞাপন না করার আবেদন জানান। বিশেষ করে তরুণদের উপর তারকাদের প্রভাবের কথাও তুলে ধরেন তিনি।
মুন্ধের বক্তব্য ছিল, জনপ্রিয়তা বা প্রভাব কাউকে দায়মুক্তি দেয় না। জনস্বাস্থ্যের বিষয়টি বাণিজ্যিক স্বার্থের আড়ালে চলে যেতে পারে না।
আদালতেও গড়িয়েছে বিতর্ক
বিজ্ঞাপন ঘিরে তৈরি হওয়া বিরোধ আদালত পর্যন্তও গড়িয়েছে। বিমল ব্র্যান্ডের এলাচ ও তামাকবিহীন পানমশলার উৎপাদন ও বিক্রির মাস্টার লাইসেন্সধারী সংস্থা পিবি অ্যাগ্রো এলএলপি নোটিস বাতিলের আবেদন করেছিল। দিল্লি হাই কোর্ট অবশ্য আঞ্চলিক এক্তিয়ার না থাকার কারণ দেখিয়ে সেই আবেদন খারিজ করে।
তবে এই সিদ্ধান্তকে বিজ্ঞাপনটির বৈধতা নিয়ে আদালতের চূড়ান্ত রায় হিসেবে দেখা যায় না। অর্থাৎ, নোটিস বহাল থাকা আর অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া—দুটি এক বিষয় নয়।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট অভিনেতাদের নিজেদের সমাজমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট থেকে বিজ্ঞাপনের প্রচারসামগ্রী সরাতে, ভবিষ্যতের সম্প্রচারে সহযোগিতা না করতে এবং প্রস্তুতকারকের সঙ্গে তাঁদের চুক্তির বিবরণ দিতে বলা হয়েছিল।
বিজ্ঞাপনে দেখা যাচ্ছে এলাচ। কিন্তু ব্র্যান্ডটি মূলত পানমশলার সঙ্গে পরিচিত। নিয়ন্ত্রক সংস্থার আপত্তির কেন্দ্রও সেখানেই। সরাসরি কোনও নিষিদ্ধ পণ্যের বিজ্ঞাপন করা না গেলে অন্য একটি পণ্যের মাধ্যমে একই ব্র্যান্ডকে মানুষের সামনে ধরে রাখার কৌশল—যাকে সাধারণত ‘সারোগেট অ্যাডভার্টাইজিং’ বলা হয়—সেটিই এই বিতর্কের মূল প্রশ্ন।
আর এর পিছনে রয়েছে বড় ব্যবসাও। রয়টার্সের উদ্ধৃত শিল্পমহলের হিসাব অনুযায়ী, আগের বছর ভারতে পানমশলার বাজারের মূল্য ছিল প্রায় ৫০০ কোটি ডলার।
তাই প্রশ্নটা শুধু শাহরুখ, অজয় বা টাইগারের মতো তারকারা বিজ্ঞাপনে মুখ দেখালেন কি না, সেখানেই থেমে থাকছে না। এলাচের বিজ্ঞাপন ঠিক কোথায় শেষ হচ্ছে, আর নিষিদ্ধ পানমশলার ব্র্যান্ডকে প্রচারের চেষ্টা কোথা থেকে শুরু হচ্ছে—প্রশাসনকে শেষ পর্যন্ত সেটিই স্পষ্ট করতে হবে।
তারকাদের জবাব এবং বিজ্ঞাপনের প্রকৃত বিষয়বস্তু সেই তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। কারণ কারণ দর্শানোর নোটিস তদন্ত ও জবাবদিহির একটি ধাপ—তা নিজে থেকেই কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ করে না। এই পার্থক্যটিই বজায় রাখা জরুরি।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



