চিনকে হারিয়ে ৪৪ বছরের অপেক্ষার অবসান, মেয়েদের হকিতে সোনা ভারতের

যা জানা জরুরি
- একটি গোল, আর সেই গোলকে আগলে রাখার অদম্য লড়াই।
- এই দুইয়ে ভর করে এশিয়ান গেমসের মহিলা হকিতে ইতিহাস লিখল ভারত।
- শুক্রবার, ২ অক্টোবর, জাপানের আইচি-নাগোয়া গেমসের ফাইনালে গতবারের চ্যাম্পিয়ন চিনকে ১–০ গোলে হারিয়ে সোনা জিতলেন ভারতীয় মেয়েরা।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
একটি গোল, আর সেই গোলকে আগলে রাখার অদম্য লড়াই। এই দুইয়ে ভর করে এশিয়ান গেমসের মহিলা হকিতে ইতিহাস লিখল ভারত। শুক্রবার, ২ অক্টোবর, জাপানের আইচি-নাগোয়া গেমসের ফাইনালে গতবারের চ্যাম্পিয়ন চিনকে ১–০ গোলে হারিয়ে সোনা জিতলেন ভারতীয় মেয়েরা। ১৯৮২ সালের দিল্লি এশিয়ান গেমসের পরে এই প্রথম। দীর্ঘ ৪৪ বছরের অপেক্ষার অবসানের পাশাপাশি নিশ্চিত হল ২০২৮ সালের লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিক্সে খেলার যোগ্যতাও।
ভারতের জয়ের নায়িকা লালরেমসিয়ামি। দেশের হয়ে নিজের ২০০তম আন্তর্জাতিক ম্যাচে দশ মিনিটের মাথায় একমাত্র গোলটি করেন তিনি। সাক্ষী রানার পাস ধরে চলন্ত অবস্থায় তাঁর জোরালো রিভার্স হিট চিনের গোলের উপরের অংশে আছড়ে পড়ে। গোলরক্ষককে কার্যত কোনও সুযোগই দেননি ভারতীয় ফরোয়ার্ড। ব্যক্তিগত মাইলফলকের দিন এমন একটি গোল, যা শেষ পর্যন্ত গোটা দলের বহু বছরের স্বপ্নপূরণের চাবিকাঠি হয়ে উঠল।
অথচ শুরুতে আক্রমণের ঝাঁজ বেশি ছিল চিনেরই। প্রথম পাঁচ মিনিটে বারবার ভারতের সার্কলে ঢুকে পড়ছিলেন চিনা খেলোয়াড়েরা। ভারত সেই চাপ সামলে ধীরে ধীরে পাল্টা আক্রমণ তৈরি করে। এগিয়ে যাওয়ার পরেও অবশ্য স্বস্তির অবকাশ মেলেনি। বলের নিয়ন্ত্রণ এবং আক্রমণের ধারাবাহিকতায় চিন ম্যাচে ফেরার চেষ্টা চালিয়ে যায়। প্রথম কোয়ার্টার শেষে ব্যবধান এক গোল থাকলেও বোঝা যাচ্ছিল, বাকি সময় ভারতীয় রক্ষণকে কঠিন পরীক্ষা দিতে হবে।
দ্বিতীয় কোয়ার্টারে আসে সবচেয়ে বিপজ্জনক মুহূর্ত। পেনাল্টি স্ট্রোক পায় চিন। সমতা ফেরানোর সেই সুবর্ণ সুযোগ রুখে দেন অভিজ্ঞ গোলরক্ষক সবিতা পুনিয়া। বাঁ দিকে ঝাঁপিয়ে এক হাতে বল ঠেকিয়ে ভারতের এগিয়ে থাকা নিশ্চিত করেন তিনি। গোল করার জন্য লালরেমসিয়ামি যতটা কৃতিত্বের দাবিদার, এই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে দলকে বাঁচানোর জন্য সবিতার অবদানও ততটাই বড়। প্রথমার্ধ শেষ হয় ভারতের ১–০ গোলে এগিয়ে থাকা অবস্থায়।
বিরতির পরে চিনের চাপ আরও বাড়ে। ভারতকে একের পর এক আক্রমণ ঠেকাতে হয়। অধিনায়ক সালিমা টেটে প্রতিপক্ষের শট আটকাতে সামনে এগিয়ে আসেন। একটি ঘটনায় আম্পায়ার চিনকে ফের পেনাল্টি স্ট্রোক দিলেও ভারতের রিভিউ সফল হওয়ায় সিদ্ধান্ত বদলে পেনাল্টি কর্নার হয়। আক্রমণ আটকাতে গিয়ে আঘাত পেয়ে কিছুক্ষণের জন্য মাঠের বাইরেও যেতে হয় সালিমাকে। তবু দলের রক্ষণে ভাঙন ধরেনি।
শেষ কোয়ার্টারে ফিরে আসেন সালিমা। সময় ফুরিয়ে আসায় চিন গোলরক্ষককে তুলে বাড়তি একজন খেলোয়াড় নামিয়ে আক্রমণ আরও জোরদার করে। কিন্তু ভারতীয় মেয়েরা মাথা ঠান্ডা রেখে নিজেদের গোল সুরক্ষিত রাখেন। শেষ পর্যন্ত লালরেমসিয়ামির গোলটিই দু’দলের মধ্যে ব্যবধান গড়ে দেয়। এই ফাইনালে ভারতের সাফল্যের বড় ভিত্তি ছিল সমবেত রক্ষণ, বিপদের সময়ে একে অন্যকে সাহায্য করা এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত মনোযোগ ধরে রাখা।
এই জয়ের ঐতিহাসিক গুরুত্বও বিরাট। ১৯৮২ সালে এশিয়ান গেমসে মহিলা হকি চালু হওয়ার বছরেই সোনা জিতেছিল ভারত। তার পরে ১৯৯৮ এবং ২০১৮ সালে ফাইনালে উঠেও যথাক্রমে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের কাছে হেরে রুপো নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছিল। এবার সেই আক্ষেপ মুছল। সেমিফাইনালে দক্ষিণ কোরিয়াকে ২–০ গোলে হারিয়ে ফাইনালে আসা ভারত শেষ বাধাটিও পেরিয়ে গেল। প্রতিপক্ষ চিন আবার প্যারিস অলিম্পিক্সের রুপোজয়ী দল।
প্যারিস অলিম্পিক্সে যোগ্যতা অর্জন করতে না পারার হতাশার পরে এই সোনা ভারতীয় মহিলা হকির জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এশিয়ার সেরার শিরোপার সঙ্গে পরবর্তী অলিম্পিক্সের দরজাও খুলে গেল। এখন সামনে প্রস্তুতির সময় এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে এই সাফল্য ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ। শুক্রবারের ফাইনাল দেখাল, কঠিন প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে সীমিত সুযোগ কাজে লাগিয়ে এবং চাপের মধ্যে সংগঠিত থেকে বড় ম্যাচ জেতা সম্ভব। ভারতীয় মেয়েদের কাছে এই জয় নতুন আত্মবিশ্বাসেরও ভিত্তি। চার দশকের বেশি সময় ধরে অধরা থাকা সোনা জিতে আজ তাঁরা দেশের মহিলা হকির ইতিহাসে নতুন অধ্যায় যোগ করলেন।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



