নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনে আপাতত সুবিধাজনক অবস্থানে বিজেপি। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক প্রভাব, বিরোধী শিবিরের বিভাজন এবং তৃণমূলের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়পন্থী প্রার্থীর সরে দাঁড়ানো গেরুয়া শিবিরের পথ সহজ করেছে। কিন্তু কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানকে উনিশ বছরের পুরনো মামলায় গ্রেফতার করার ঘটনায় সেই সুবিধার মধ্যেও অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। জমিরক্ষা আন্দোলনের স্মৃতিবাহী এই জনপদে প্রশ্ন উঠেছে, নির্বাচনের মুখেই কেন সেই আন্দোলনের এক অংশগ্রহণকারীর বিরুদ্ধে পুলিশ সক্রিয় হল? প্রশ্নটি বিরোধীদের প্রচার ছাপিয়ে আন্দোলনের পুরনো কর্মীদের একাংশকেও নাড়া দিয়েছে।

আগামী ৬ অক্টোবর নন্দীগ্রামে ভোট, গণনা ৯ অক্টোবর। শুভেন্দু এ বছরের বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রাম ও ভবানীপুর, দুই কেন্দ্রেই জিতেছিলেন। ভবানীপুর রেখে নন্দীগ্রাম ছাড়ায় এই উপনির্বাচন। বিজেপি এখানে প্রার্থী করেছে হাসিরানি রথকে। তিনি শুভেন্দুর নিহত ব্যক্তিগত সহকারী চন্দ্রনাথ রথের মা। ফলে এই নির্বাচনে মুখ্যমন্ত্রীর সাংগঠনিক প্রভাবের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সহকারীর হত্যাকাণ্ডের আবেগও যুক্ত হয়েছে। বিজেপির কাছে আসনটি ধরে রাখা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই নিজের পুরনো কেন্দ্রে রাজনৈতিক কর্তৃত্ব অক্ষুণ্ণ রাখার পরীক্ষাও এটি শুভেন্দুর।

বিরোধী শিবিরের হিসাব বদলে যায় ১৮ সেপ্টেম্বর। মমতা শিবিরের প্রার্থী সঞ্চিতা প্রধান দে মনোনয়ন প্রত্যাহার করেন। তার আগের দিন তিনি শুভেন্দুর সঙ্গে দেখা করেছিলেন। নিজের প্রার্থী সরে যাওয়ার পরে মমতা কংগ্রেসের মিলন প্রধানকে সমর্থনের ঘোষণা করেন। তাঁর বক্তব্য, বৃহত্তর রাজনৈতিক স্বার্থে এবং ইন্ডিয়া জোটকে শক্তিশালী করতেই এই সিদ্ধান্ত। কিন্তু সমর্থন ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মিলনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এই ঘটনাক্রমকে সামনে রেখে কংগ্রেস অভিযোগ তোলে, বিরোধী ভোট একত্র হওয়ার সম্ভাবনা ঠেকাতেই প্রশাসনকে ব্যবহার করছে বিজেপি।

পুলিশের ব্যাখ্যা অবশ্য আলাদা। তাদের বক্তব্য, ২০০৭ সালের নন্দীগ্রাম আন্দোলন ঘিরে দায়ের হওয়া মামলায় মিলনের বিরুদ্ধে বকেয়া গ্রেফতারি পরোয়ানা ছিল। অভিযোগগুলির মধ্যে রয়েছে খুন, খুনের চেষ্টা, খুনের উদ্দেশ্যে অপহরণ, প্রমাণ লোপাট এবং অস্ত্র নিয়ে দাঙ্গা। বিজেপির স্থানীয় নেতৃত্বও পুলিশি পদক্ষেপকে আইনি প্রক্রিয়ার অংশ বলেই সমর্থন করেছে। অন্যদিকে কংগ্রেসের প্রশ্ন, মনোনয়ন জমা দেওয়ার সময় পুলিশ ও প্রশাসনের সামনেই যখন মিলন উপস্থিত ছিলেন, তখন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন? মমতার সমর্থন ঘোষণার পরেই কেন এত তৎপরতা?

এই বিতর্কের গভীরে রয়েছে নন্দীগ্রামের রাজনৈতিক ইতিহাস। ২০০৭ সালে প্রস্তাবিত রাসায়নিক শিল্পতালুকের জন্য জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে গড়ে উঠেছিল ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটি। তৃণমূল, কংগ্রেস এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ধারার মানুষ সেই আন্দোলনে একত্র হয়েছিলেন। আন্দোলন মমতার ক্ষমতায় আসার পথ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল; শুভেন্দুর রাজনৈতিক উত্থানেরও অন্যতম ভিত্তি ছিল নন্দীগ্রাম। আজ সেই আন্দোলনের সহযাত্রীরা বিভিন্ন দলে ছড়িয়ে রয়েছেন। তাই পুরনো মামলা ফিরে আসা অনেকের কাছে নিছক একটি নির্বাচনী বিরোধ নয়, নিজেদের অতীতের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগের কারণ।

আন্দোলনের পুরনো কর্মীদের একাংশের এই ক্ষোভ দেখা গেছে। তাঁদের বক্তব্য, নেতাদের রাজনৈতিক অবস্থান বদলেছে বলে একসঙ্গে আন্দোলন করা মানুষদের আলাদা পরিণতি ভোগ করতে হবে কেন? ভূমি আন্দোলনের নেতা আবু তাহের পুরনো মামলাগুলি প্রত্যাহারের উদ্যোগ নিতে শুভেন্দুর কাছে আবেদন জানিয়েছেন। আন্দোলনের আর এক প্রবীণ অংশগ্রহণকারী মনোরঞ্জন মান্নার আশঙ্কা, মিলনের গ্রেফতার এখনও মামলার মুখোমুখি থাকা অন্যদের কাছেও ভুল বার্তা পৌঁছে দেবে। তবে এই ক্ষোভ কতটা ভোটে প্রতিফলিত হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।

অস্বস্তির ইঙ্গিত মিলেছে বিজেপির স্থানীয় স্তরেও। বিজেপি নেতা স্বদেশ দাস অধিকারী বলেছেন, যে ভাবে মিলনকে গ্রেফতার করা হয়েছে, তিনি তা সমর্থন করেন না। তাঁর যুক্তি, এতে অকারণে কংগ্রেস প্রার্থী রাজনৈতিক সুবিধা পেয়ে যাচ্ছেন। স্বদেশ নিজেও আন্দোলনপর্বের কয়েকটি মামলায় অভিযুক্ত ছিলেন এবং জামিন পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন। একই আন্দোলনের মামলায় বিভিন্ন দলের নেতাদের নাম থাকায় পুলিশের পদক্ষেপ নিয়ে তুলনা তৈরি হচ্ছে। বিরোধীরা এই প্রশ্নকেই নির্বাচনী প্রচারে কাজে লাগাচ্ছে।

এর মধ্যে আদালতের হস্তক্ষেপে প্রচারে ফিরেছেন মিলন। ২৯ সেপ্টেম্বর কলকাতা হাই কোর্টের বিচারপতি তীর্থঙ্কর ঘোষ তাঁকে তিন সপ্তাহের অন্তর্বর্তী জামিন দেন এবং ২১ অক্টোবর হলদিয়ার আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেন। পরদিন কারামুক্ত হয়ে তিনি সোনাচূড়ার বাড়িতে যান, বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করেন এবং রোড শো শুরু করেন। তাঁর অভিযোগ, প্রথমে প্রার্থীপদ প্রত্যাহারের জন্য চাপ দেওয়া হয়েছিল; রাজি না হওয়ায় গ্রেফতার করে প্রচার আটকানোর চেষ্টা হয়েছে। এগুলি মিলনের অভিযোগ; আদালতে অপরাধের বিচার এখনও নিষ্পত্তি হয়নি। প্রচারের শেষ দিন ৪ অক্টোবর হওয়ায় কারামুক্তির পরে ভোটারদের কাছে পৌঁছনোর জন্য মিলনের হাতে সময়ও কম। সেই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে সংগঠনকে সক্রিয় করাই এখন তাঁর দলের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।

অন্যদিকে, এই রাজনৈতিক টানাপড়েনের আড়ালে রয়ে গিয়েছে ২০০৭ সালের হিংসায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির দীর্ঘ অপেক্ষা। নিহত বা নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনদের দুর্দশা এবং বিচার না পাওয়ার হতাশা। তাঁদের অভিজ্ঞতা মনে করিয়ে দেয়, আন্দোলনের রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে প্রতিটি ফৌজদারি অভিযোগের নিষ্পত্তি করা যায় না। আবার অভিযোগের বিচার চলা এবং ভোটের মুখে গ্রেফতারের সময় নির্বাচন নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। অন্তর্বর্তী জামিন কোনও অভিযোগ থেকে চূড়ান্ত অব্যাহতি নয়; সেই পার্থক্যটিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

সব মিলিয়ে নন্দীগ্রামের লড়াইয়ে বিজেপির সুবিধা থাকলেও গ্রেফতার বিতর্ক কংগ্রেসকে নতুন প্রচারের বিষয় দিয়েছে। মমতার সমর্থন মিলনের পক্ষে কতটা কার্যকর হবে, তৃণমূলের বিভক্ত কর্মীসমর্থকেরা কতটা একদিকে ভোট দেবেন, এবং আন্দোলনের পুরনো কর্মীদের ক্ষোভ কতটা ব্যালটে পৌঁছবে, তার উত্তর এখনও অজানা। বিজেপির সাংগঠনিক শক্তির মোকাবিলায় বিরোধীরা এখন মিলনের স্থানীয় পরিচয় ও গ্রেফতারজনিত সহানুভূতিকে সামনে আনছে। নন্দীগ্রামের ভোট তাই আসন দখলের পাশাপাশি দেখাবে, অতীতের আন্দোলনের স্মৃতি বর্তমানের রাজনৈতিক আনুগত্যকে কতটা প্রভাবিত করতে পারে।