কর্নাটকে এসআইআর: গণহারে নাম বাদ দেওয়ার আবেদন, ভোটারের উপর বোঝা—এনডিএ শিবিরেও অসন্তোষ

যা জানা জরুরি
- ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর যে ভাবে এগোচ্ছিল, তা নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরেই একাধিক উদ্বেগ ছিল।
- ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে সেই বিষয়গুলি প্রকাশ্যে আসার পরে কমিশন নতুন একগুচ্ছ নির্দেশ দিয়েছে।
- এর মধ্যে রয়েছে বিএলওদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে নথিপত্র যাচাইয়ের নির্দেশও।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর যে ভাবে এগোচ্ছিল, তা নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরেই একাধিক উদ্বেগ ছিল। ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে সেই বিষয়গুলি প্রকাশ্যে আসার পরে কমিশন নতুন একগুচ্ছ নির্দেশ দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিএলওদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে নথিপত্র যাচাইয়ের নির্দেশও।
এই পদক্ষেপকে সকলেই স্বাগত জানিয়েছেন। তবে কর্নাটকের আধিকারিকেরা বলছেন, নির্দেশ এখনও তাঁদের কাছে এসে না পৌঁছনোয় তা কী ভাবে কার্যকর হবে, তা নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে।
এসআইআর শুরু হওয়ার আগে কর্নাটকে ভোটার ছিলেন ৫ কোটি ৫৪ লক্ষ। তথ্য সংগ্রহের পর্যায়ে তাঁদের মধ্যে প্রায় ১ কোটির নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। তাঁদের ‘অনুপস্থিত, অন্যত্র চলে যাওয়া, মৃত, নাম বাদ পড়া এবং অন্যান্য’ শ্রেণিতে রাখা হয়েছিল। খসড়া তালিকায় জায়গা পাওয়া প্রায় ৪ কোটি ৪০ লক্ষ ভোটারের মধ্যে ৪৩ লক্ষ ৮১ হাজার জনকে নোটিস পাঠানো হয়। আধিকারিকদের আশঙ্কা অনুযায়ী, নোটিস পাওয়া ভোটারদের ২০ থেকে ২৫ শতাংশ, অর্থাৎ ৯ থেকে ১১ লক্ষ জন যদি শেষ পর্যন্ত তালিকায় ফিরতে না পারেন, তা হলে কর্নাটকের মোট ভোটারসংখ্যা ৫ কোটি ৫৪ লক্ষ থেকে কমে প্রায় ৪ কোটি ৩৫ লক্ষে দাঁড়াবে।
একটি সূত্র ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-কে বলেছে, “এগুলি বর্তমান হিসাব। নির্বাচন কমিশনের নতুন নির্দেশের ফলে চূড়ান্ত ভোটারসংখ্যা বাড়তে পারে।”
তা হলেও এসআইআরের গোটা বোঝা সাধারণ মানুষের উপর চাপিয়ে দেওয়ার যুক্তি খুঁজে পাচ্ছেন না জনতা দল (সেকুলার), অর্থাৎ জেডি(এস)-এর এক নেতা। তাঁর কথায়, “তথ্য সংগ্রহের পর্যায়ের মতো আগেই বিএলওদের যাচাইয়ের কাজে লাগানো যেত। তার বদলে মানুষকে নথিপত্র নিয়ে লাইনে দাঁড় করানো হয়েছে।”
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই নেতা আরও জানান, কর্নাটকের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের সভাপতিত্বে হওয়া বৈঠকগুলিতে জেডি(এস) এই প্রশ্ন তুলেছিল। তিনি বলেন, “মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক আমাদের জানিয়েছিলেন, এ বিষয়ে তাঁরা একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছেন।”
বিএলওদের মাধ্যমে যাচাইয়ের বিষয়ে কমিশনের নতুন বিজ্ঞপ্তির পরে সহকারী নির্বাচক নিবন্ধন আধিকারিকদের বা এইআরওদের ভূমিকা কী হবে, তা নিয়েও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। এত দিন নথিপত্র পরীক্ষা করার দায়িত্ব ছিল তাঁদেরই।
বেশির ভাগ বিধানসভা কেন্দ্রে কতগুলি নোটিস পাঠানো হয়েছে, তার ভিত্তিতে এইআরও নিয়োগ করা হয়েছিল। যেমন, উডুপি জেলার কাপু কেন্দ্রে প্রায় ২০ হাজার নোটিস পাঠানোর পরে শুনানির জন্য বিভিন্ন দফতর থেকে অতিরিক্ত ১৮ জন এইআরওকে কাজে আনা হয়।
একটি সূত্র বলেছে, “গত ৩০ দিন ধরে তাঁরা এসআইআরের কাজ করছেন। এখন নির্বাচন কমিশন বলছে, বিএলওরাও শুনানি করতে পারবেন। এসআইআরের দায়িত্বে থাকায় এই ১৮ জন গ্রুপ-বি আধিকারিক নিজেদের দফতরের ফাইলে মন দিতে পারেননি। বিভিন্ন দফতরে যে কাজ আটকে রয়েছে, তার দায় কে নেবে?”
২৪ অগস্ট থেকে শুরু হওয়া দাবি ও আপত্তি জানানোর পর্বের শেষ কয়েক দিনে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার জন্য গণহারে ফর্ম ৭ জমা পড়া নিয়েও প্রশ্নের মুখে পড়েছে কমিশন। ভালকি, বাবলেশ্বর, মুদিগেরে এবং বেলগাম উত্তর—এই চারটি কেন্দ্রে এমন অভিযোগ উঠেছে। সব মিলিয়ে এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ৬,২৫৯ জন ভোটারের নাম। চারটি কেন্দ্রেরই বিধায়ক কংগ্রেসের।
মুদিগেরেতে অজ্ঞাতপরিচয় কয়েক জনের বিরুদ্ধে পুলিশের দ্বারস্থ হয়েছেন নির্বাচনী আধিকারিকেরা। অভিযোগ, এক বুথ লেভেল এজেন্টের পরিচয়সংক্রান্ত তথ্যের “অপব্যবহার” করে ফর্ম ৭ জমা দেওয়া হয়েছে। বুথ লেভেল এজেন্ট বা বিএলএ হলেন কোনও রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি।
মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দফতরের সূত্র জানিয়েছে, এই প্রবণতা ঠেকাতে সতর্ক করা হয়েছে যে, প্রমাণ ছাড়া ফর্ম ৭ জমা দিলে আইনি ব্যবস্থার মুখে পড়তে হতে পারে।
গণহারে নাম বাদ দেওয়ার এমন একাধিক চেষ্টা হয়েছে বলে দাবি করেছেন কর্নাটক প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি বি কে হরিপ্রসাদ। তাঁর অভিযোগ, বিজয়পুরা জেলায় এক ব্যক্তি ১৮ হাজার ফর্ম ৭ সংগ্রহ করেছিলেন। হরিপ্রসাদ বলেন, “আধিকারিকেরা তাঁকে সতর্ক করেন, ওই ফর্মগুলির কারণে কোনও অনিয়ম হলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
পরে ওই আপত্তিগুলি প্রত্যাহার করে নেওয়া হয় বলে জানান তিনি। তাঁর দাবি, সতর্ক আধিকারিকেরা অন্য জায়গাতেও একই ধরনের “জালিয়াতি” ঠেকিয়েছেন।
তবে প্রবীণ বিজেপি বিধায়ক সুনীল কুমারের বক্তব্য, একে জালিয়াতি বলা ঠিক নয়। তিনি বলেন, “শেষ পর্যন্ত যাচাই তো নির্বাচন কমিশনকেই করতে হবে। নাম তোলা বা বাদ দেওয়ার ফর্ম যে কেউ জমা দিতে পারেন।”
জেডি(এস) নেতাদের উদ্বেগ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে দলের প্রবীণ নেতা কে এ থিপ্পেস্বামী বলেন, কমিশনের বদলানো নিয়মে ভোটারদের সুবিধা হবে। তাঁর কথায়, “বিএলওদের শুনানি করার সুযোগ দেওয়ার ব্যবস্থা স্বাগত। আমাদের অপেক্ষা করে দেখতে হবে।”
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



