আক্রমণ প্রতিরোধ থেকে দেবীর তরবারি: নবম শ্রেণির ইতিহাসে নতুন বয়ান এনসিইআরটির

যা জানা জরুরি
- মধ্যযুগের ইতিহাসে সাম্রাজ্য বিস্তারের পাশাপাশি আঞ্চলিক প্রতিরোধ, নারী শাসকদের নেতৃত্ব এবং যুদ্ধের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা দেবী আরাধনার কাহিনিকে সামনে আনল এনসিইআরটি।
- নবম শ্রেণির সমাজবিজ্ঞানের নতুন বইয়ের দ্বিতীয় খণ্ডে এই বিষয়গুলি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
- ‘আন্ডারস্ট্যান্ডিং সোসাইটি: ইন্ডিয়া অ্যান্ড বিয়ন্ড’ নামের বইটি প্রকাশিত হয়েছে মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
মধ্যযুগের ইতিহাসে সাম্রাজ্য বিস্তারের পাশাপাশি আঞ্চলিক প্রতিরোধ, নারী শাসকদের নেতৃত্ব এবং যুদ্ধের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা দেবী আরাধনার কাহিনিকে সামনে আনল এনসিইআরটি। নবম শ্রেণির সমাজবিজ্ঞানের নতুন বইয়ের দ্বিতীয় খণ্ডে এই বিষয়গুলি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। ‘আন্ডারস্ট্যান্ডিং সোসাইটি: ইন্ডিয়া অ্যান্ড বিয়ন্ড’ নামের বইটি প্রকাশিত হয়েছে মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর। শিক্ষাবর্ষ শুরুর প্রায় ছয় মাস পরে প্রকাশিত এই খণ্ডের আগে, জুনে প্রথম খণ্ডটি বেরিয়েছিল।
নতুন পাঠ্যবস্তুর একটি প্রধান অধ্যায়ের নাম ‘রেজিস্ট্যান্স অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স’, অর্থাৎ প্রতিরোধ ও প্রতিকূলতা সামলে টিকে থাকার ক্ষমতা। আলোচনার মূল সময়সীমা ১০০০ থেকে ১৭০০ খ্রিস্টাব্দ। আগের নবম শ্রেণির ইতিহাসে ফরাসি বিপ্লব, ইউরোপের সমাজতন্ত্র, রুশ বিপ্লব এবং হিটলারের উত্থানের মতো বিষয় ছিল। নতুন বইয়ে ভারতের আঞ্চলিক রাজ্য, সার্বভৌমত্ব রক্ষার সংগ্রাম, জোট ও সংঘবদ্ধ প্রতিরোধ সামনে এসেছে।
অধ্যায়ের সূচনায় অবশ্য সপ্তম শতক থেকে উপমহাদেশে বিভিন্ন আক্রমণের পটভূমি আলোচনা করা হয়েছে। বইয়ের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ভূখণ্ড সম্প্রসারণ এবং ধর্মীয় উদ্দেশ্য এসব অভিযানের চালিকাশক্তি ছিল। পাশাপাশি অর্থনৈতিক আকর্ষণের কথাও বলা হয়েছে। নদীবিধৌত উর্বর সমভূমির উদ্বৃত্ত কৃষি উৎপাদন স্থানীয় মানুষের সমৃদ্ধির ভিত্তি গড়ে তুলেছিল; সেই সম্পদ বহিরাগত শক্তিকেও আকৃষ্ট করেছিল। ফলে আক্রমণের কারণ ব্যাখ্যায় রাজনীতি, ধর্ম এবং অর্থনীতিকে পাশাপাশি রাখা হয়েছে।
আরব, তুর্কি, মুঘল ও ইউরোপীয় শক্তির বিরুদ্ধে বিভিন্ন রাজ্য ও জনগোষ্ঠীর প্রতিরোধ এই আলোচনার বিষয়। সপ্তম শতকের মাঝামাঝি আরব বাহিনীর স্থল ও সমুদ্রপথের অভিযান এবং দাক্ষিণাত্য, মালব, কাশ্মীর ও রাজস্থানে তাদের মোকাবিলার উল্লেখ রয়েছে। বইটি জানাচ্ছে, একাদশ ও দ্বাদশ শতকে উত্তর ও পশ্চিম ভারত তুর্কি আক্রমণের প্রধান অভিঘাত বহন করলেও উপদ্বীপীয় ভারত তখন তুর্কি নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল।
আঞ্চলিক প্রতিরোধের বিবরণে মহারানা প্রতাপ, অহোম এবং মরাঠারা গুরুত্ব পেয়েছে। ১৬৭১ সালের সরাইঘাটের যুদ্ধে লাচিত বরফুকনের নেতৃত্বে মুঘল নৌবাহিনীকে পরাজিত করার কথা রয়েছে। অহোমদের সাফল্যের ব্যাখ্যায় ভূপ্রকৃতির জ্ঞান, নৌশক্তি, গেরিলা কৌশল ও জোটের ভূমিকা এসেছে। শিবাজির ক্ষেত্রে স্বরাজ্যের ধারণা, দুর্গ এবং সামরিক কৌশল আলোচিত হয়েছে। আবার মেবারের প্রতিরোধের পাশাপাশি অম্বরের কচ্ছওয়াহা রাজপুতদের সঙ্গে মুঘলদের সহযোগিতার সম্পর্কও উল্লেখ করা হয়েছে।
নারী শাসকদের উপস্থিতিও নতুন আলোচনার উল্লেখযোগ্য দিক। ১১৭৮ সালে মুহাম্মদ ঘোরিকে পরাজিত করার জন্য পরিচিত রানি নায়িকাদেবী এবং পর্তুগিজ শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করা রানি আব্বাক্কা চৌটার কথা রয়েছে। রুদ্রমাদেবীও জায়গা পেয়েছেন। এই সংযোজনের তাৎপর্য হল, রাজনীতি ও যুদ্ধের ইতিহাসে নারীরা কেবল রাজপরিবারের সদস্য হিসেবে থাকছেন না; তাঁদের শাসনক্ষমতা, নেতৃত্ব এবং প্রতিরোধের ভূমিকা শিক্ষার্থীদের সামনে আসছে। এর আগে অন্য পাঠ্যবইয়ে রানি দুর্গাবতী, তারাবাই ও অহল্যাবাই হোলকরের ভূমিকা তুলে ধরা হয়েছিল। এবারের বইয়েও নারী নেতৃত্বকে আলোচনায় আনার সেই ধারা বজায় থাকতে দেখা যাচ্ছে।
সবচেয়ে নজরকাড়া অংশগুলির একটি দেবীর কাছ থেকে তরবারি পাওয়ার প্রচলিত কাহিনি। বইয়ে বলা হয়েছে, বস্তারের শাসক অন্নমরাজা মাণিক্যদেবী বা দন্তেশ্বরীর কাছ থেকে তরবারি পেয়েছিলেন বলে বিশ্বাস প্রচলিত। বিজয়নগরের কুমার কম্পন মাদুরাইয়ের সুলতানি বাহিনীর বিরুদ্ধে দেবীপ্রদত্ত তরবারি ব্যবহার করেছিলেন বলেও বিশ্বাস রয়েছে। একইভাবে শিবাজির সঙ্গে তুলজা ভবানীর দেওয়া তরবারির কাহিনি যুক্ত হয়েছে। যুদ্ধের সময়ে কালী, দুর্গা, ভবানী ও শক্তির অন্যান্য রূপকে রক্ষাকর্ত্রী হিসেবে আহ্বানের ঐতিহ্যের প্রসঙ্গে এগুলি এসেছে।
এখানে পাঠদানের একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। কোনও শাসককে ঘিরে এমন বিশ্বাস প্রচলিত ছিল, এই তথ্য এবং দেবী সত্যিই তাঁকে অস্ত্র দিয়েছিলেন, এই দাবি এক নয়। লোককথা থেকে মানুষের ধর্মচেতনা, বীরত্বের ধারণা ও রাজক্ষমতার বৈধতা নির্মাণের উপায় বোঝা যায়। কিন্তু অলৌকিক ঘটনার সত্যতা প্রতিষ্ঠার জন্য তা যথেষ্ট নয়। তাই বইয়ের এই অংশ বোঝাতে বিশ্বাস, সাহিত্যিক বর্ণনা এবং যাচাইযোগ্য ঐতিহাসিক প্রমাণের তফাত স্পষ্ট রাখা প্রয়োজন।
শিখ গুরুদের উপর মুঘল শাসনের নিপীড়নও অধ্যায়ে বিশেষভাবে আলোচিত। গুরু অর্জন দেবের মৃত্যুদণ্ড, গুরু হরগোবিন্দের বন্দিত্ব এবং গুরু তেগবাহাদুরের মৃত্যুদণ্ডের বিবরণ রয়েছে। বইয়ের বক্তব্য, নিপীড়ন ও রাজনৈতিক চাপ শিখদের সম্মিলিত সংগঠন এবং সশস্ত্র প্রতিরোধের দিকে এগিয়ে দেয়। গুরু গোবিন্দ সিংহের নেতৃত্বে ১৬৯৯ সালে খালসা গঠনের বিষয়ও এই ধারাবাহিকতায় এসেছে। ধর্মীয় নেতৃত্বের সঙ্গে রাজনৈতিক সংগঠনের সম্পর্ক এখানে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে।
জাঠদের বিদ্রোহের ব্যাখ্যায় অর্থনৈতিক অসন্তোষকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। গঙ্গা-যমুনা দোয়াবের জাঠদের উপর অত্যধিক কর ও শোষণের সঙ্গে ঔরঙ্গজেবের ধর্মনীতির প্রভাব যুক্ত হয়েছিল বলে বইটি জানাচ্ছে। ১৬৬৯ সালে গোকুল জাঠের নেতৃত্বে বিদ্রোহের উল্লেখ রয়েছে। এই বর্ণনায় কৃষকসমাজের অসন্তোষকে প্রতিরোধের ইতিহাসের অংশ হিসেবে দেখা হয়েছে।
নতুন বইয়ে মন্দিরের সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ভূমিকা নিয়েও পৃথক আলোচনা রয়েছে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান কীভাবে আঞ্চলিক সমাজজীবনের সঙ্গে যুক্ত ছিল, সেই বিষয়টিও এখানে ইতিহাসচর্চার পরিসরে আনা হয়েছে।
এনসিইআরটির প্রধান দীনেশ সাকলানির বক্তব্য, মাধ্যমিক স্তরে সমাজবিজ্ঞান পড়ানোর লক্ষ্য বিশ্লেষণী ক্ষমতা তৈরি, যুক্তিনির্ভর অনুসন্ধান, বিভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে বোঝাপড়া এবং দায়িত্বশীল নাগরিক অংশগ্রহণে উৎসাহ দেওয়া। তাঁর মতে, সেই ভাবনা থেকেই বইটি তৈরি হয়েছে। এই ঘোষিত লক্ষ্য পূরণে ঐতিহাসিক বর্ণনার উৎস ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে শ্রেণিকক্ষে আলোচনা জরুরি। শিক্ষার্থীরা কেন একটি ব্যাখ্যা গ্রহণ করবে, তার প্রমাণ বিচার করার সুযোগও পাওয়া প্রয়োজন।
বইটি নিজেও জানিয়েছে, আলোচ্য যুগকে কেবল আক্রমণ ও প্রতিরোধের কাহিনি হিসেবে দেখা যায় না; সংঘাতের পাশাপাশি সহযোগিতাও ছিল। নতুন পাঠ্যের মূল্যায়নে এই কথাটি গুরুত্বপূর্ণ। আঞ্চলিক ইতিহাস ও উপেক্ষিত নেতৃত্বকে সামনে আনা শিক্ষার পরিসর বাড়াতে পারে। সেই সঙ্গে বিভিন্ন শক্তির সম্পর্কের পরিবর্তন, সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা এবং প্রমাণের ভিত্তিতে প্রশ্ন তোলার জায়গা বজায় থাকলেই মধ্যযুগের জটিল ইতিহাস শিক্ষার্থীদের কাছে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



