খবর

‘পিছড়া’ থেকে ‘পণ্ডিত’: অখিলেশের পিডিএ নিয়ে উত্তরপ্রদেশে অর্থ বদলের রাজনীতি

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • বাংলাস্ফিয়ার: বৃহত্তর সামাজিক জোট গড়ার ভাবনাকে তিন অক্ষরে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদব।
  • সেই সংক্ষিপ্ত নামই এখন তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের হাতে বারবার নতুন অর্থ পাচ্ছে।
  • ‘পিছড়া, দলিত, অল্পসংখ্যক’—অর্থাৎ অনগ্রসর, দলিত ও সংখ্যালঘুদের নিয়ে গঠিত এই সমীকরণকে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ-র বিরুদ্ধে সমাজবাদী পার্টির সামাজিক জোট হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

বাংলাস্ফিয়ার: বৃহত্তর সামাজিক জোট গড়ার ভাবনাকে তিন অক্ষরে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদব। সেই সংক্ষিপ্ত নামই এখন তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের হাতে বারবার নতুন অর্থ পাচ্ছে।

‘পিছড়া, দলিত, অল্পসংখ্যক’—অর্থাৎ অনগ্রসর, দলিত ও সংখ্যালঘুদের নিয়ে গঠিত এই সমীকরণকে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ-র বিরুদ্ধে সমাজবাদী পার্টির সামাজিক জোট হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। অখিলেশ বারবার দাবি করেছেন, ‘পিডিএ হি এনডিএ কো হরায়েগা’—এনডিএ-কে হারাবে পিডিএ-ই। কিন্তু তার পর থেকে এই তিন অক্ষরের একাধিক অর্থ তৈরি হয়েছে।

পিডিএ-র ভাবনার লক্ষ্য ছিল যাদব ও মুসলিমদের উপর নির্ভরশীল সমাজবাদী পার্টির চিরাচরিত সমর্থনভিত্তিকে আরও প্রসারিত করা। যাদব নন এমন অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির মানুষ, দলিত এবং অন্য সংখ্যালঘুদেরও সেই জোটে আনার চেষ্টা ছিল এর পিছনে। অখিলেশ জানিয়েছিলেন, উচ্চবর্ণের পিছিয়ে থাকা অংশও এই জোটের অন্তর্ভুক্ত হবে। উচ্চবর্ণের ভোটারদের সাধারণত বিজেপির সমর্থনভিত্তির অংশ বলে মনে করা হয়।

২০২৩ সালের অক্টোবরে সমাজবাদী পার্টির কয়েক জন উচ্চবর্ণের নেতা আশঙ্কা প্রকাশ করেন, এই সমীকরণে উচ্চবর্ণ এবং আদিবাসীরা বাদ পড়ছেন বলে ধারণা তৈরি হতে পারে। এর পর অখিলেশ ‘এ’-র অর্থ প্রসারিত করে তার মধ্যে ‘অগড়ে’ বা অগ্রসর জাতি, ‘আদিবাসী’ বা তফসিলি জনজাতি এবং ‘আধি আবাদি’ বা অর্ধেক জনসংখ্যা—অর্থাৎ নারীদেরও অন্তর্ভুক্ত করেন।

২০২৫ সালের এপ্রিলে অখিলেশ এই সমীকরণে সাংবাদিকদেরও যুক্ত করেন। তিনি বলেন, ‘পি’ বলতে ‘পত্রকার’ বা সাংবাদিকও বোঝাতে পারে। পহেলগাঁও সন্ত্রাসবাদী হামলা নিয়ে প্রশ্ন তোলার জন্য তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে বলে এক সাংবাদিক অভিযোগ করার পর অখিলেশ ওই মন্তব্য করেছিলেন।

২০২৭ সালের উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক লড়াই তীব্র হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পিডিএ-র আরও নতুন ব্যাখ্যা দিতে শুরু করেন অখিলেশ। মার্চে গৌতম বুদ্ধ নগরে সমাজবাদী পার্টির এক সমাবেশে তিনি বলেন, পিডিএ আন্দোলনের উদ্দেশ্য হল ‘পীড়িত, দুঃখী, অপমানিত’ মানুষদের একত্র করা।

৫ অগস্ট লখনউয়ে সমাজবাদী নেতা জনেশ্বর মিশ্রের জন্মবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে অখিলেশ বলেন, পিডিএ-র ‘পিডি’ বলতে ‘পণ্ডিত’ বা ব্রাহ্মণদের বোঝায়। হাতে ত্রিশূল নিয়ে ‘ছোটে লোহিয়া’ নামে পরিচিত মিশ্রকে স্মরণ করেন তিনি। শিবতাণ্ডব স্তোত্র পাঠের একটি অনুষ্ঠানেও যোগ দেন। ব্রাহ্মণ সমাজের কাছে পৌঁছনোর জন্য সমাজবাদী পার্টির প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই এই উদ্যোগকে দেখা হয়।

২৫ সেপ্টেম্বর রায়বরেলিতে পিডিএ রথযাত্রায় ফের এই সমীকরণের পরিধি বাড়ান সমাজবাদী পার্টির প্রধান। তিনি বলেন, ‘অল্পসংখ্যক’-এর ‘এ’-র মধ্যে মুসলিম, পারসি, বৌদ্ধ, শিখদের পাশাপাশি ‘আধি আবাদি’ও রয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, বুলডোজারের ব্যবহার-সহ বিভিন্ন প্রশাসনিক পদক্ষেপের মাধ্যমে বেছে বেছে পিডিএ-ভুক্ত জনগোষ্ঠীর মানুষদের নিশানা করা হচ্ছে। অথচ শাসক শিবিরের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ভিন্ন আচরণ করা হচ্ছে।

এই পরিবর্তনশীল ব্যাখ্যাই বিজেপি এবং অন্য প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলিকে পাল্টা আক্রমণের রসদ জুগিয়েছে। তারাও পিডিএ-র নিজস্ব অর্থ তৈরি করতে শুরু করেছে।

অখিলেশের পিডিএ যাত্রার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সমাজমাধ্যমে বিজেপি অভিযোগ করে, সমাজবাদী পার্টির সমীকরণ থেকে ‘পণ্ডিত’ উধাও হয়ে গিয়েছেন। তাদের দাবি, অখিলেশের বিশেষভাবে সাজানো রথে লেখা পিডিএ-র অর্থ দাঁড়িয়েছে ‘পিছড়া, দলিত, অল্পসংখ্যক-মুসলিম’।

উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথও বারবার এই সংক্ষিপ্ত নামকে নিশানা করেছেন। গত মাসে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী কল্যাণ সিংহের মৃত্যুবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, সমাজবাদী পার্টি পিডিএ-র ‘পি’-র অর্থ ক্রমাগত বদলে চলেছে। তাঁর কটাক্ষ, এক দিন ওই ‘পি’ বলতে ‘পাকিস্তান’-ও বোঝানো হতে পারে।

২০২৪ সালের নভেম্বরে আদিত্যনাথ এর আরও একটি ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। তাঁর দাবি ছিল, পিডিএ হল ‘প্রোডাকশন হাউস অব দাঙ্গাই অউর অপরাধী’—অর্থাৎ দাঙ্গাবাজ ও অপরাধী তৈরির কারখানা। অখিলেশকে সেই সংস্থার প্রধান নির্বাহী এবং তাঁর কাকা শিবপাল সিংহ যাদবকে প্রশিক্ষক বলে কটাক্ষ করেন তিনি। এই অভিযোগ করার সময় অপরাধজগৎ থেকে রাজনীতিতে আসা আতিক আহমেদ ও মুখতার আনসারি এবং পুলিশের খোঁজে থাকা অপরাধী খান মুবারকের নাম উল্লেখ করেন আদিত্যনাথ।

বিজেপির অন্য নেতারাও পিডিএ-র নিজস্ব ব্যাখ্যা তৈরি করেছেন। দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক তথা উত্তরপ্রদেশের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা বিনোদ তাওড়ে সম্প্রতি দাবি করেন, পিডিএ-র ‘আসল অর্থ’ হল ‘পরায়া ধন অপনা’—অন্যের সম্পদ নিজের করে নেওয়া।

উপমুখ্যমন্ত্রী কেশবপ্রসাদ মৌর্য ১৪ সেপ্টেম্বর এক্স-এ একটি পোস্টে পিডিএ-কে ‘পরিবার ডেভেলপমেন্ট এজেন্সি’ বা পরিবার উন্নয়ন সংস্থা বলে কটাক্ষ করেন। তাঁর অভিযোগ, মানুষের উন্নয়নের চেয়ে নিজের পরিবার, গুন্ডা ও অপরাধীদের রক্ষা করতেই সমাজবাদী পার্টি বেশি আগ্রহী। এর বিপরীতে বিজেপির সমীকরণকে তিনি অগ্রসর, অনগ্রসর ও দলিত জনগোষ্ঠীর ‘ত্রিবেণী’ হিসেবে তুলে ধরেন।

মৌর্য পিডিএ-কে ‘পার্সোনাল ডেভেলপমেন্ট অথরিটি’ বা ব্যক্তিগত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বলেও উল্লেখ করেছেন। তাঁর অভিযোগ, এই সমীকরণের উদ্দেশ্য অখিলেশের নিজের সুবিধা নিশ্চিত করা।

বিজেপির উত্তরপ্রদেশ সভাপতি তথা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী পঙ্কজ চৌধুরী ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে পিডিএ-কে ‘পারিবারিক দল অ্যালায়েন্স’ বা পরিবারতান্ত্রিক দলগুলির জোট বলে বর্ণনা করেন। পরিবারকেন্দ্রিক রাজনীতির অভিযোগ তুলে সমাজবাদী পার্টি এবং ইন্ডিয়া জোটের অন্য দলগুলিকে আক্রমণ করাই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য।

২০২৬ সালের ২৯ মে চৌধুরী আরও একটি ব্যাখ্যা দেন—‘পীড়া, দমন অউর অপমান’, অর্থাৎ যন্ত্রণা, নিপীড়ন ও অপমান। চান্দৌলিতে দলের এক মহিলা কর্মীকে সমাজবাদী পার্টির নেতারা মারধর করেছেন বলে ওঠা অভিযোগের প্রসঙ্গে এই মন্তব্য করেন তিনি।

বিজেপির শরিক সুহেলদেব ভারতীয় সমাজ পার্টির সভাপতি ওমপ্রকাশ রাজভরও সমাজবাদী পার্টির এই সমীকরণ নিয়ে বিদ্রুপ করেছেন। সমাজবাদী পার্টির নেতাদের মধ্যে সংঘর্ষের খবরের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, পিডিএ-র অর্থ ‘পয়সা, দবঙ্গই অউর আপসি লড়াই’—টাকা, পেশিশক্তির দাপট এবং নিজেদের মধ্যে বিবাদ।

এর আগে রাজভর বলেছিলেন, পিডিএ মানে ‘পিট দেগা আহির’—যাদব তোমাকে পেটাবে। পরে সেই কথাটিই বাড়িয়ে তিনি বলেন, ‘পিট দেগা আহির, পিট দেগা অল্পসংখ্যক’—যাদব পেটাবে, সংখ্যালঘুও পেটাবে।

বহুজন সমাজ পার্টির সভাপতি মায়াবতীও সমাজবাদী পার্টির এই বদলে যাওয়া ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এক্স-এ একটি পোস্টে তিনি জানতে চান, পিডিএ বলতে আসলে কী বোঝায়, তা স্পষ্ট করুক সমাজবাদী পার্টি। তাঁর অভিযোগ, রাজনৈতিক স্বার্থ অনুযায়ী কখনও ‘পিডি’ বলতে ‘পিছড়া-দলিত’, আবার কখনও ‘পণ্ডিত’ বোঝাচ্ছে দলটি।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles