ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর ঘিরে বিতর্কে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে বেআইনি কাজের অভিযোগ তুললেন প্রাক্তন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব আর কে সিং। এসআইআর পরিচালনায় জ্ঞানেশের ভূমিকা নিয়েই তাঁর এই অভিযোগ। কমিশনের অভ্যন্তরীণ আপত্তি প্রকাশ্যে আসার পরে বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তীব্র হয়েছে।

সিংহের পরিচয় এই সমালোচনাকে আলাদা গুরুত্ব দেয়। তিনি শুধু প্রাক্তন আমলা নন, নরেন্দ্র মোদীর সরকারের মন্ত্রীও ছিলেন। বিহারের আরা থেকে বিজেপির সাংসদ নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে পরাজিত হন। পরে দলের সঙ্গে তাঁর বিরোধ প্রকাশ্যে আসে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে দলবিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগে সাসপেন্ড হওয়ার পর তিনি বিজেপির প্রাথমিক সদস্যপদ ছাড়েন। সেই রাজনৈতিক অতীতের কারণেও তাঁর বর্তমান অভিযোগ তাৎপর্যপূর্ণ।

এসআইআর নিয়ে চলতি বিতর্কের বড় সূত্র একটি অনুসন্ধান। তাতে বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক জোশী দশ মাসে অন্তত চোদ্দো বার বিভিন্ন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে লিখিত আপত্তি জানিয়েছিলেন। অভিযোগ ছিল, তাঁদের অজ্ঞাতে কমিশনের নামে নির্দেশ জারি হয়েছে। আপত্তিগুলির বিষয় ছিল নতুন ভোটার নথিভুক্তি, নাম বাদ দেওয়া ও ফিরিয়ে আনা এবং ভোটার তথ্যভান্ডারের নিয়ন্ত্রণ।

বিশেষ করে নতুন ভোটারদের আবেদনপত্র ফর্ম ৬ বদলানো নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। আবেদনকারী অথবা তাঁর বাবা-মা কিংবা পূর্বপুরুষের নাম আগের এসআইআরের তালিকায় ছিল কি না, সেই তথ্য চাওয়া হচ্ছিল। বলা হয়, বিধি সংশোধন ছাড়া এমন পরিবর্তন করা যায় না বলে দুই কমিশনার আপত্তি জানিয়েছিলেন। পাশাপাশি, স্থানীয় নির্বাচনী আধিকারিকদের ভোটার তথ্যভান্ডারে প্রবেশাধিকার সীমিত করে দিল্লিতে নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রীভূত করার অভিযোগও ওঠে।

পশ্চিমবঙ্গের ঘটনাও এই বিতর্কে গুরুত্বপূর্ণ। বিচারবিভাগীয় আধিকারিকেরা যাঁদের নাম তালিকায় রাখার অনুমোদন দিয়েছিলেন, তাঁদের বিরুদ্ধে ১৬.১০ লক্ষ আপিল দায়ের হয়েছিল। কে কমিশনের হয়ে সেই আপিল করার অনুমতি দিয়েছিলেন, সান্ধু তা জানতে চেয়েছিলেন বলে অনুসন্ধানে উল্লেখ রয়েছে। এই প্রশ্ন কমিশনের সিদ্ধান্তগ্রহণের পদ্ধতি এবং দায়িত্ব নির্ধারণের বিষয়টিকে সামনে এনেছে।

তবে নির্বাচন কমিশন নিজেদের পদক্ষেপ আইনসম্মত বলেই দাবি করেছে। প্রতিষ্ঠানের ভিতরে মতপার্থক্য স্বাভাবিক বলেও তাদের বক্তব্য। ২৬ সেপ্টেম্বর কমিশন ভোটার তালিকা পরিচালনার সফটওয়্যার পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত জানায়। একজন প্রবীণ নির্বাচনী আধিকারিকের নেতৃত্বে, স্বাধীন প্রযুক্তিবিশেষজ্ঞকে নিয়ে কমিটি দেখবে সফটওয়্যার নির্বাচনী আইন ও বিধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না। তথ্যের অসংগতি ধরা পড়লেই ভোটারকে নিয়মিত সরকারি দপ্তরে হাজির হতে বলার পরিবর্তে স্থানীয় কর্মীদের বাড়িতে গিয়ে যাচাই করার কথাও জানানো হয়। ফলে অভিযোগের পাশাপাশি কমিশনের এই ব্যাখ্যা ও সংশোধনমূলক পদক্ষেপও বিবেচনায় রয়েছে।

অন্যদিকে, বিরোধীদের আক্রমণ অব্যাহত। সোমবার রাহুল গান্ধী দিল্লির যমুনাতীরের বেলা এস্টেটের বাসিন্দাদের প্রসঙ্গ তুলে দাবি করেন, সেখানকার ৭২৮ জনের মধ্যে এসআইআরের পরে মাত্র একজনের নাম ভোটার তালিকায় রয়েছে। তাঁর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ওই এলাকায় বসবাস এবং আগের নির্বাচনে ভোট দেওয়া সত্ত্বেও বাকি নামগুলি বাদ পড়েছে। তিনি বিষয়টিকে ভোটের অধিকার কেড়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া বলে আক্রমণ করেন। অবশ্য এই সংখ্যা রাহুলের দাবি হিসেবেই প্রকাশিত হয়েছে; তা স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠিত তথ্য বলে ধরে নেওয়া যায় না।

এই পটভূমিতে সিং-এর অভিযোগ কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে চলতি প্রশ্নে নতুন মাত্রা যোগ করছে। বর্তমানে সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নগুলি হল, বিতর্কিত সিদ্ধান্তের অনুমোদন কীভাবে হয়েছিল, আপত্তির নিষ্পত্তি কীভাবে হয়েছে এবং যোগ্য ভোটারের নাম বাদ পড়লে প্রতিকার কত দ্রুত মিলছে। অভিযোগ, কমিশনের জবাব এবং চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত তথ্যকে পৃথক রেখেই এই বিতর্কের মূল্যায়ন করতে হবে। সেই জবাবের উপরই নির্ভর করছে তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে সাধারণ মানুষের আস্থা কতটা ফিরতে পারে।