টানা ভারী বৃষ্টি ও ঝড়ে বিপর্যস্ত উত্তরপ্রদেশ। ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর সকাল পর্যন্ত দুর্যোগের পর্বে অন্তত ৫৬ জনের মৃত্যু হয়েছে, আহত হয়েছেন আরও ৪৬ জন। ত্রাণ কমিশনারের দফতরের হিসাবে, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১,০২১টি বাড়ি। মারা গিয়েছে ১০৭টি পশুও। জলমগ্ন এলাকা থেকে মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি শুরু হয়েছে ফসল ও সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়ন।

মৃত্যুর নিরিখে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত সীতাপুর জেলা। সেখানে সাতজনের প্রাণহানির খবর এসেছে। লখিমপুর খেরি, বাহরাইচ ও বলরামপুরে পাঁচজন করে এবং অযোধ্যা ও গোরক্ষপুরে চারজন করে মারা গিয়েছেন। আহতদের মধ্যে হরদোইয়ে সাতজন, মৈনপুরী ও শ্রাবস্তীতে পাঁচজন করে রয়েছেন। সীতাপুর ও লখিমপুর খেরিতে আহত হয়েছেন তিনজন করে।

ঘরবাড়ির ক্ষতি সবচেয়ে বেশি হয়েছে হরদোইয়ে। সেখানে ২৭২টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত, সীতাপুরে সংখ্যাটি ১০৮। চন্দৌলি, ঔরাইয়া, গোন্ডা, হামিরপুর, শাহজাহানপুর এবং বাহরাইচেও বহু বসতবাড়ির ক্ষতি হয়েছে। পশুমৃত্যুতেও হরদোই এগিয়ে: সেখানে ২৮টি পশু মারা গিয়েছে। সীতাপুরে ১৬টি এবং কনৌজে ১৪টি পশুর মৃত্যুর খবর মিলেছে। কৃষির মোট ক্ষতির পরিমাণ তখনও চূড়ান্ত হয়নি।

রাজ্যের ৭৫টি জেলার মধ্যে ৫৬টিতে অতিরিক্ত বৃষ্টি নথিভুক্ত হয়েছে। কানপুর, বারাণসী, প্রয়াগরাজ, গোরক্ষপুর ও বরেলি-সহ বিস্তীর্ণ এলাকায় বৃষ্টির সঙ্গে ঘণ্টায় ৩০ থেকে ৪০ কিলোমিটার বেগে হাওয়া বয়েছে। ঝড়ে গাছ ও বিদ্যুতের খুঁটি উপড়ে পড়েছে, জল ঢুকেছে গ্রাম ও রাস্তায়। একাধিক জেলায় জলাবদ্ধতা এবং বন্যার মতো পরিস্থিতিতে আটকে পড়া মানুষকে সরানোর কাজ চালাচ্ছে উদ্ধারকারী দল।

বৃষ্টির পাশাপাশি উদ্বেগ বাড়াচ্ছে ঘাঘরা ও রাপ্তী নদীর জলস্তর। কেন্দ্রীয় জল কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, রবিবার সকালে বারাবাঁকির এলগিনব্রিজে ঘাঘরার জলস্তর ছিল ১০৬.১৪ মিটার। সেখানে বিপদসীমা ১০৬.০৭ মিটার। অর্থাৎ জল বিপদসীমার সাত সেন্টিমিটার উপরে ছিল। অযোধ্যাতেও নদীর জল সতর্কসীমা অতিক্রম করেছিল। নিম্নাঞ্চলের পরিস্থিতির উপর নজর রাখছে প্রশাসন।

বলরামপুরে রাপ্তীর জলস্তরও সতর্কসীমার উপরে উঠেছিল। রবিবারের হিসাবে সেখানে জল ছিল ১০৪ মিটারে, সতর্কসীমা ১০৩.৬২ মিটার। নদী অববাহিকায় বৃষ্টির কারণে আরও জল বাড়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল। এই পরিসংখ্যান ২৭ সেপ্টেম্বরের পর্যবেক্ষণ; পরবর্তী সময়ে জল কতটা বেড়েছে বা কমেছে, তার হিসাব নয়। নদীর ধারে বসবাসকারীদের জন্য হালনাগাদ সতর্কতা তাই বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

রবিবার ত্রাণ কমিশনার হৃষীকেশ ভাস্কর যশোদ ক্ষতিগ্রস্ত জেলার জেলাশাসক ও অতিরিক্ত জেলাশাসকদের সঙ্গে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেন। কর্মকর্তাদের মাঠে থেকে দুর্গত পরিবারের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাঁদের প্রয়োজন বুঝে অবিলম্বে সহায়তা পৌঁছে দিতে বলা হয়েছে। উদ্ধার ও ত্রাণে কোনও গাফিলতি বরদাস্ত করা হবে না বলেও প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে।

ফসলের ক্ষতি দ্রুত যাচাই করে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ক্ষতিপূরণের প্রক্রিয়া শুরু করতে বলা হয়েছে। যাঁদের বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত, প্রয়োজন অনুযায়ী তাঁদের বিকল্প থাকার ব্যবস্থা করতে হবে। যোগ্য পরিবারগুলিকে আবাসন প্রকল্পের সুবিধা দেওয়ার নির্দেশও রয়েছে। তবে কত পরিবার ইতিমধ্যে আশ্রয় বা অর্থসাহায্য পেয়েছে, প্রকাশিত নির্দেশে তার হিসাব নেই।

আবহাওয়া দফতরের ২৭ সেপ্টেম্বরের বিজ্ঞপ্তিতেও পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের কোনও কোনও জায়গায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির আশঙ্কা ছিল। তার আগের সতর্কতায় উত্তর-পূর্ব মধ্যপ্রদেশ ও সংলগ্ন উত্তর ছত্তীসগঢ়ের নিম্নচাপের প্রভাবে উত্তরপ্রদেশে প্রবল বৃষ্টির কথা জানানো হয়। ফলে দুর্যোগের মধ্যে উদ্ধারকাজের পাশাপাশি নতুন বৃষ্টির সম্ভাবনাও প্রশাসনের উদ্বেগের কারণ হয়ে রয়েছে।

ত্রাণ কমিশনার মানুষকে জলমগ্ন ও বন্যাকবলিত এলাকায় অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত এড়াতে বলেছেন। খরস্রোতা নদী, জলধারা ও নালা থেকে দূরে থাকার আবেদনও জানিয়েছেন তিনি। জরুরি সহায়তার জন্য রাজ্যের ত্রাণ কমিশনারের দফতরের ১০৭০ নম্বরে যোগাযোগ করা যাবে। সরকারি ওয়েবসাইটেও এই নম্বরটি দেওয়া রয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির সমীক্ষা চলতে থাকায় প্রকাশিত সংখ্যাগুলিকে এখনও সম্পূর্ণ চূড়ান্ত হিসাব হিসেবে দেখা যাচ্ছে না।