International

সিএসএমটির গোপন ফাইল

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • মুম্বইয়ের ছত্রপতি শিবাজি মহারাজ টার্মিনাসে (সিএসএমটি) মিলেছে ব্রিটিশ আমলের ১২–১৫টি গোপন ফাইল।
  • হিন্দুস্তান টাইমস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, নথিগুলি গত শতকের বিশের দশকের শেষভাগ এবং তিরিশের দশকের গোড়ার।
  • স্বাধীনতা আন্দোলনের উত্তাল সময়ের এই দলিলগুলি সামনে আসায় ব্রিটিশ আমলের প্রশাসন ও সেই সময়কার ঘটনাপ্রবাহকে নতুন করে খতিয়ে দেখার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

মুম্বইয়ের ছত্রপতি শিবাজি মহারাজ টার্মিনাসে (সিএসএমটি) মিলেছে ব্রিটিশ আমলের ১২–১৫টি গোপন ফাইল। হিন্দুস্তান টাইমস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, নথিগুলি গত শতকের বিশের দশকের শেষভাগ এবং তিরিশের দশকের গোড়ার। স্বাধীনতা আন্দোলনের উত্তাল সময়ের এই দলিলগুলি সামনে আসায় ব্রিটিশ আমলের প্রশাসন ও সেই সময়কার ঘটনাপ্রবাহকে নতুন করে খতিয়ে দেখার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

এই আবিষ্কারের গুরুত্ব বুঝতে হলে ফিরে তাকাতে হয় সিএসএমটির ইতিহাসে। ছত্রপতি শিবাজি মহারাজ টার্মিনাসের পুরনো নাম ছিল ভিক্টোরিয়া টার্মিনাস। ইউনেসকোর তথ্য অনুযায়ী, ১৮৭৮ সালে শুরু হয়ে প্রায় দশ বছর ধরে তৈরি হয়েছিল এই ভবন। ব্রিটিশ স্থপতি এফ ডব্লিউ স্টিভেন্সের নকশায় ইউরোপীয় গথিক স্থাপত্যের সঙ্গে মিশেছিল ভারতীয় নির্মাণশৈলী। পাথরের গম্বুজ, খিলান ও অলংকরণে সেই মিশ্রণ এখনও স্পষ্ট। ২০০৪ সালে ভবনটি ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পায়।

অর্থাৎ, সিএসএমটি শুধু একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা নয়—ঔপনিবেশিক প্রশাসন, রেলব্যবস্থা এবং মুম্বই শহরের দীর্ঘ ইতিহাসেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল।

এই জায়গার সঙ্গে ভারতের রেলযাত্রার সূচনাপর্বও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ১৮৫৩ সালের ১৬ এপ্রিল বোরি বন্দর থেকে ঠাণের উদ্দেশে যাত্রা করেছিল ভারতের প্রথম যাত্রীবাহী ট্রেন। ১৪টি কামরায় ছিলেন প্রায় ৪০০ আমন্ত্রিত যাত্রী। ৩৪ কিলোমিটারের সেই যাত্রা ভারতীয় রেলের ইতিহাসে আজও একটি মাইলফলক।

তাই রেল দপ্তরে তৈরি পুরনো নথি শুধু রেল চলাচলের ইতিহাস নয়, সেই সময়ের প্রশাসন, যোগাযোগব্যবস্থা এবং বৃহত্তর সামাজিক পরিস্থিতি বোঝারও সূত্র হয়ে উঠতে পারে।

তবে পুরনো ফাইল পাওয়া গেলেই ইতিহাসের কোনও নতুন অধ্যায় লেখা হয়ে যায় না। নথিটি কে লিখেছিলেন, কাকে পাঠানো হয়েছিল, কোন পরিস্থিতিতে লেখা হয়েছিল এবং একই বিষয়ে আর কী কী নথি রয়েছে—প্রথমে সেগুলি খতিয়ে দেখা জরুরি। একটি প্রশাসনিক মন্তব্যকে তার প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করে পড়লে তার অর্থ বদলে যেতে পারে।

বিশেষ করে স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। ব্রিটিশ প্রশাসনের তৈরি নথিতে ঘটনাকে দেখা হয়েছে শাসকের দৃষ্টিকোণ থেকে। আন্দোলনকারীদের অভিজ্ঞতা বা স্থানীয় মানুষের বক্তব্য সেখানে অনুপস্থিতও থাকতে পারে। ফলে উদ্ধার হওয়া ফাইলকে অন্য চিঠিপত্র, সংবাদপত্র, ব্যক্তিগত স্মৃতিকথা ও সমকালীন দলিলের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।

অনেক সময় ইতিহাসের বড় সূত্র লুকিয়ে থাকে ছোট তথ্যেই। একটি তারিখ, কোনও অচেনা নাম, চিঠির প্রাপক কিংবা দপ্তরের একটি নির্দেশই কোনও ঘটনার সময়ক্রম স্পষ্ট করে দিতে পারে। একাধিক নথি পাশাপাশি রাখলে আবার বোঝা যেতে পারে, কোনও সিদ্ধান্ত কোথায় নেওয়া হয়েছিল এবং কীভাবে তা বাস্তবায়নের চেষ্টা হয়েছিল।

সেই কারণেই শুধু ফাইল উদ্ধার নয়, তার তালিকা তৈরি, বিষয়বস্তু চিহ্নিত করা এবং সংশ্লিষ্ট নথির সঙ্গে যোগসূত্র খুঁজে বের করাও জরুরি।

এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সংরক্ষণের প্রশ্ন। পুরনো কাগজের আয়ু বাড়াতে প্রয়োজন বিশেষজ্ঞের হাতে যথাযথ সংরক্ষণ, ক্ষয়রোধ এবং প্রয়োজনমতো মেরামতি। ভারতের জাতীয় মহাফেজখানার সংরক্ষণপদ্ধতিতেও নথির শারীরিক অবস্থার ভিত্তিতে উপযুক্ত পদ্ধতি বেছে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

অর্থাৎ, কয়েক দশক বা শতাব্দী পুরনো কাগজ হাতে পাওয়া মানেই সেটিকে অবাধে নাড়াচাড়া করা নয়। ভুলভাবে সংরক্ষণ বা মেরামতি করলে মূল নথিরই ক্ষতি হতে পারে। ঐতিহাসিক তথ্যের পাশাপাশি তাই দলিলটির বস্তুগত অস্তিত্বও রক্ষা করা জরুরি।

এ ক্ষেত্রে ডিজিটাল প্রতিলিপি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। জাতীয় মহাফেজখানা ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ব্যাপক হারে নথি ডিজিটাইজেশনের কাজ শুরু করেছে। লক্ষ্য, গবেষকদের অনলাইন প্রবেশাধিকার বাড়ানো এবং মূল দলিলের পাশাপাশি তার ডিজিটাল সংস্করণও ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষণ করা। ‘অভিলেখ পটল’ সেই বৃহত্তর উদ্যোগেরই একটি অংশ।

সিএসএমটিতে পাওয়া ফাইলগুলির ক্ষেত্রে এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ তাই চমকপ্রদ কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাওয়া নয়, বরং নথিগুলির পরিচয় ও বিষয়বস্তু নির্ভুলভাবে উদ্ধার করা। কার লেখা, কেন লেখা, কোথায় পাঠানো হয়েছিল এবং অন্য কোন দলিলের সঙ্গে তার সম্পর্ক রয়েছে—এই প্রশ্নগুলির উত্তরই ঠিক করবে আবিষ্কারটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব কতটা।

একটি পুরনো ফাইলের ‘গোপন’ পরিচয় কৌতূহল তৈরি করতেই পারে। কিন্তু তার আসল মূল্য লুকিয়ে থাকবে ফাইলের পাতায়—তারিখে, নামের তালিকায়, সরকারি নির্দেশে, কিংবা এমন কোনও ছোট তথ্যের মধ্যে, যা এত দিন ইতিহাসের আড়ালে ছিল।

সিএসএমটির এই আবিষ্কার তাই অতীতের দরজা খুলে দেওয়ার একটি সম্ভাব্য চাবি। সেই দরজা দিয়ে ইতিহাসের কতটা নতুনভাবে দেখা যাবে, তার উত্তর মিলবে গবেষণার পরবর্তী ধাপেই।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles