প্যারিসের পূর্ব দিকের একটি শহরে ‘ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রাঙ্গণ’-এ নির্মিত হিন্দু মন্দিরটির সম্প্রতি মহাসমারোহে উদ্বোধন হয়েছে। কিন্তু তার পর থেকেই মন্দিরকে ঘিরে তৈরি হয়েছে একাধিক বিতর্ক। ঐক্য ও সম্প্রীতিকে মূলমন্ত্র করে চলা এই আন্তর্ধর্মীয় পরিসরে এমন ঘটনা অস্বাভাবিক।

প্যারিসের পূর্ব উপকণ্ঠের ব্যুসি-সাঁ-জর্জে গড়ে ওঠা হিন্দু মন্দিরটি ফ্রান্সের প্রথম মন্দির, যা হিন্দুধর্মের ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যরীতি মেনে নির্মিত হয়েছে। তার উদ্বোধন ঘিরে উৎসবের আয়োজনও ছিল জমকালো। প্যারিসের প্রাণকেন্দ্রে বেরিয়েছিল ‘নগরযাত্রা’; সঙ্গে সেন নদীতে ১১টি নৌকার ‘জলযাত্রা’। ২ থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলেছিল বিপুল আয়োজনে ‘সংস্কৃতি উৎসব’। উজ্জ্বল রঙের শাড়ি ও কুর্তা পরা হাজার হাজার হিন্দু ভক্ত সুসজ্জিত পালকিতে দেবদেবীর বিগ্রহ নিয়ে পথে নেমেছিলেন। ফরাসি রাজধানীর রাস্তায় যেন নেমে এসেছিল ভারতের রঙের উৎসব হোলির আবহ।

কিন্তু ৫ সেপ্টেম্বর আইফেল টাওয়ারে একটি ঘটনা গোটা উৎসবের উপর ছায়া ফেলে। মন্দির নির্মাণের উদ্যোক্তা বোচাসনবাসী অক্ষর পুরুষোত্তম স্বামীনারায়ণ সংস্থা বা বিএপিএসের একটি প্রতিনিধিদল আইফেল টাওয়ার দেখতে যেতে চেয়েছিল। অভিযোগ, ঐতিহাসিক স্থাপনাটির পরিচালনাকারী সংস্থার কাছে ওই দল ‘মহিলাদের সঙ্গে মেলামেশা’ সীমিত রাখার অনুরোধ জানিয়েছিল। প্রতিনিধিদলে কয়েক জন সাধু ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন সংগঠনের বর্তমান আধ্যাত্মিক প্রধান, ৯৩ বছর বয়সি মহন্ত স্বামী মহারাজও। তাঁর সন্ন্যাসব্রত অনুযায়ী মহিলাদের সংস্পর্শ নিষিদ্ধ। এই অনুরোধে আইফেল টাওয়ারের কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ৭ সেপ্টেম্বর তাঁরা ধর্মঘটে যান।

আচমকাই অস্বস্তিকর প্রচারের কেন্দ্রে চলে আসে এই ধর্মীয় সম্প্রদায়। একটি বিবৃতিতে তারা জানায়, ‘কোনও সময়েই কাউকে [স্মৃতিসৌধে] প্রবেশ করতে বাধা দেওয়া হয়নি।’ পাশাপাশি বলা হয়, ‘এই পরিস্থিতিতে যাঁরা আঘাত পেয়েছেন বা অসুবিধায় পড়েছেন, তাঁদের কাছে আমরা আন্তরিকভাবে ক্ষমাপ্রার্থী।’

বিতর্কে হতাশা প্রকাশ করেছে ব্যুসি-সাঁ-জর্জের পুর কর্তৃপক্ষও। বাগান বাদ দিয়েই সেখানে মন্দিরটি ৩,৫০০ বর্গমিটার জায়গা জুড়ে রয়েছে; উচ্চতা ২৪ মিটার। শহরের রক্ষণশীল মেয়র ইয়ান দুবস্কের দপ্তরপ্রধান সেদ্রিক তার্তো-জিনেস্ত বলেন, ‘এই শোরগোল আমাদের পক্ষে খুবই পীড়াদায়ক হয়েছে। কারণ, এর ফলে আমাদের হিন্দু সহযোগীদের অযথা সন্দেহের মুখে পড়তে হয়েছে। তাঁদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগের দশ বছরে কখনও সামান্যতম সমস্যাও হয়নি, তাঁদের সম্পর্কে কোনও সতর্কবার্তাও আমরা পাইনি।’

ফ্রান্সে বিএপিএসের অনুগামীর সংখ্যা কম। ভারতের গুজরাতে ১৯০৭ সালে এই সংগঠনের প্রতিষ্ঠা। হিন্দুধর্মের এই শাখাটির নাম এসেছে আধ্যাত্মিক গুরু স্বামীনারায়ণের নাম থেকে। হিন্দুধর্মের পরিসরে এ ধরনের ধর্মীয় শাখা বোঝাতে ব্যবহৃত ‘সম্প্রদায়’ শব্দটির কোনও নেতিবাচক অর্থ নেই। স্বামীনারায়ণের মৃত্যু হয় ১৮৩০ সালে; বিএপিএসের অনুগামীরা তাঁকে ঈশ্বরের অবতার বলে মনে করেন। ভারতেও তুলনামূলকভাবে কম পরিচিত এই সংগঠনের বিস্তার ঘটেছে মূলত প্রবাসী গুজরাতিদের মাধ্যমে—বিশেষ করে ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং আফ্রিকার কয়েকটি দেশে।

প্যারিসের সিয়ঁস পো-র আন্তর্জাতিক গবেষণাকেন্দ্র এবং ফ্রান্সের জাতীয় বৈজ্ঞানিক গবেষণাকেন্দ্রের গবেষণা অধিকর্তা ক্রিস্তফ জাফরেলো বলেন, ‘ধর্মীয় দিক থেকে এটি অত্যন্ত রক্ষণশীল একটি গোষ্ঠী। তারা নারী-পুরুষকে পৃথক রাখার রীতি অনুসরণ করে। সামাজিক দিক থেকেও রক্ষণশীল, কারণ তারা জাতিভেদপ্রথাকে সমর্থন করে।’ বিএপিএসের সদস্যেরা নিজেদের ‘অরাজনৈতিক’ বলে দাবি করলেও, জাতীয়তাবাদী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে সংগঠনটির ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথাও তুলে ধরেন জাফরেলো। মোদীও গুজরাতের মানুষ।

এক সময়ে মন্দিরের প্রাণপ্রতিষ্ঠা অনুষ্ঠানে মোদীর উপস্থিত থাকার সম্ভাবনা ছিল। শেষ পর্যন্ত তিনি আসেননি। তবে ৬ সেপ্টেম্বর সরাসরি ভিডিয়ো-যোগে অনুষ্ঠানে অংশ নেন। গোটা বিশ্ব এক পরিবারের অন্তর্গত—ভারতীয় দর্শনের এই ধারণার প্রতিফলন হিসেবে মন্দিরটিকে বর্ণনা করে তিনি বলেন, ভারত ও ফ্রান্সের সাংস্কৃতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটি ‘আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন মাইলফলক’।

বৃহত্তর হিন্দুসমাজের মধ্যে বিএপিএস সংখ্যালঘু হলেও, জাফরেলোর কথায়, ‘এই সম্প্রদায়ের সদস্যেরা প্রায়ই ব্যবসায় সাফল্য পান এবং রাজনৈতিকভাবে তাঁরা অত্যন্ত প্রভাবশালী।’ ২০২৫ সালের এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স ও তাঁর পরিবারকে নয়াদিল্লির মন্দিরে স্বাগত জানিয়েছিল এই সংগঠন। ভ্যান্সের স্ত্রী ঊষা হিন্দু। জাফরেলো বলেন, ‘সারা পৃথিবীতে তারা বিশাল বিশাল মন্দির তৈরি করে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে হিন্দুদের সাংস্কৃতিক প্রভাব বিস্তারের মাধ্যম হিসেবে কাজ করে এই মন্দিরগুলি।’ বিশ্বজুড়ে এখন তাদের মন্দিরের সংখ্যা ১,৩০০-র বেশি।

এই পরিচয়ের সঙ্গে ব্যুসি-সাঁ-জর্জের ব্যতিক্রমী ‘ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রাঙ্গণ’-এর শান্ত চরিত্রের ফারাক বিস্তর। প্যারিস থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরের শহরটি গড়ে উঠেছে মূলত ১৯৯০-এর দশকে। ২০১২ সালে উদ্বোধন হওয়া এই আন্তর্ধর্মীয় ও আন্তঃসাংস্কৃতিক জনপরিসরের পরিকল্পনা করেছিলেন তৎকালীন মেয়র হিউগ রোঁদো। তিনি ১৯৯৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত মেয়র ছিলেন। জাতিগতভাবে অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় এই শহরে তিনি এমন একটি জায়গা গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন, যেখানে নানা পটভূমি ও ধর্মবিশ্বাসের বাসিন্দারা একত্র হতে পারেন।

পুরনো ক্যাথলিক গির্জা নোত্র-দাম দ্যু ভালের পাশে মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে আরও সাতটি ধর্মীয় ভবন গড়ে উঠেছে অথবা নির্মাণের পরিকল্পনায় এসেছে। রয়েছে দু’টি বৌদ্ধ প্যাগোডা—যার একটি ইউরোপের বৃহত্তম বৌদ্ধমন্দির—একটি মসজিদ, একটি সিনাগগ, একটি প্রোটেস্ট্যান্ট গির্জা এবং একটি হিন্দু মন্দির। ইথিয়োপীয় অর্থোডক্স গির্জাটি এখনও পরিকল্পনার স্তরে। সিনাগগের অস্থায়ী ভবনটি দাঁড়িয়ে রয়েছে ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের জমিতে। এই পরিসরের মূলমন্ত্র, ‘ব্যুসি-সাঁ-জর্জে শান্তি ও সম্প্রীতির মধ্যে নিজের ধর্ম পালন করুন।’ এখানে উপস্থিত ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলির মধ্য থেকে প্রতি বছর কোনও একটি সম্প্রদায়ের নেতা প্রাঙ্গণের সভাপতির দায়িত্ব নেন।

মেয়রের দপ্তরপ্রধান তার্তো-জিনেস্ত বলেন, ‘ব্যুসি-সাঁ-জর্জের পাদরিকে খুঁজছেন? মসজিদে গেলেই তাঁকে পাবেন, রাবাইয়ের সঙ্গে বসে চা খাচ্ছেন।’ তাঁর ব্যাখ্যা, ‘১৯০৫ সালের [ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রের পৃথকীকরণ সংক্রান্ত] আইনের সীমারেখা মেনেই পুরসভা যুক্ত থাকে। ধর্মাচরণ অবশ্যই আমাদের এক্তিয়ারের মধ্যে পড়ে না। তবে ভ্রাতৃত্ব এবং সুপ্রতিবেশী সম্পর্ক গড়ে তুলতে আমরা উৎসাহ দিই।’

ব্যুসি-সাঁ-জর্জে কোনও ধর্মীয় গোষ্ঠী প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে চাইলে দু’টি শর্ত মানতে হয়। ধর্মান্তরিত করার উদ্দেশ্যে প্রচার চালানো যাবে না এবং প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্প্রীতিপূর্ণ সহাবস্থানে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়ার অঙ্গীকার করতে হবে। তা ছাড়া, নতুন কোনও উপাসনালয় তৈরির জন্য এই প্রাঙ্গণে আগে থেকে থাকা সব ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সর্বসম্মত অনুমোদন প্রয়োজন।

২০১৩ সালে নিউ ইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন পড়ে ফ্রান্সের এই ব্যতিক্রমী ধর্মীয় পরিসরের সন্ধান পায় বিএপিএস। তার পর ব্রিটেন থেকে একটি প্রতিনিধিদল শহরের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে। তার্তো-জিনেস্ত জানান, ‘যোগাযোগ হয়েছিল তাঁদের আইনজীবী এমানুয়েল মিনিয়ঁর মাধ্যমে। তিনি প্রেসিডেন্ট নিকোলা সারকোজির প্রাক্তন উপদেষ্টাও ছিলেন।’ তাঁর কথায়, ‘তাঁরা সহিষ্ণুতা, সকলের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং ভ্রাতৃত্বের উপর জোর দিয়েছিলেন। প্রাঙ্গণের মূল চেতনার সঙ্গে এই ভাবনার সম্পূর্ণ মিল রয়েছে।’

২০১৯ সালে সরকারি উন্নয়ন সংস্থা এপামার্নের কাছ থেকে ৫,০০০ বর্গমিটারের জমিটি কেনে বিএপিএস। কোভিড অতিমারির কারণে কাজ পিছিয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত মসজিদের পাশে মন্দির নির্মাণ শুরু হয় ২০২২ সালে। ফ্রান্সে হিন্দু স্থাপত্যের ঐতিহ্য মেনে মন্দির গড়ে তোলা সহজ ছিল না। প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ফরাসি সংস্থা ভিঞ্চি কনস্ট্রাকশন, আর্ত শারপঁতিয়ে এবং এইচ শভালিয়ের সঙ্গে বিএপিএসকে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে হয়েছে। এইচ শভালিয়ে প্যারিসের নোত্র-দাম গির্জার সংস্কারকাজেও যুক্ত ছিল। নির্মাণস্থলে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেছেন ভারতীয় কারিগরেরাও। আর গেরুয়া বসনধারী সন্ন্যাসীরা দেখেছেন, হিন্দুধর্মের পবিত্র গ্রন্থ বেদের বিধান মেনে মন্দিরটি তৈরি হচ্ছে কি না।

জুলাই মাসে আগাম না জানিয়ে নির্মাণস্থলে গিয়েছিল ল্য মোঁদ। তখন প্রকল্পের প্রধান সঞ্জয় কারা বলেছিলেন, ‘আমরা মন্দির তৈরি করছি না; আমরা সংস্কৃতির মধ্যে সেতু গড়ে তুলছি। এই জায়গাটি হিন্দু ও অহিন্দু—সকলের জন্য খোলা থাকবে। ভবনের নীচের তলায় যে যৌথ ব্যবহারের জায়গাগুলি রয়েছে—রেস্তরাঁ, ব্যায়ামাগার, শিশুদের দিবাযত্নকেন্দ্র—সেখানেও সবাই একত্র হতে পারবেন।’

গুজরাতি বংশোদ্ভূত, লন্ডনবাসী এই ইঞ্জিনিয়ার মন্দিরটিকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রায় দশ বছর ধরে স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে নিরলস কাজ করে চলেছেন। অসংখ্য বার যাতায়াত করেছেন প্যারিস ও ব্রিটেনের মধ্যে। সামলেছেন সেই হাজার হাজার স্বেচ্ছাসেবককে, যাঁরা নিজেদের সময় দিতে চান—কেউ যোগাযোগ ও প্রচারের দলে, কেউ নির্মাণস্থল পরিষ্কারে, আবার কেউ রান্নার কাজে।

কিন্তু হিন্দুধর্মে ‘সেবা’ বা নিঃস্বার্থভাবে অন্যের জন্য কাজ করার ধারণা কেন্দ্রীয় হলেও, এত বড় স্থাপনা নির্মাণের জন্য মজবুত আর্থিক ভিত্তি প্রয়োজন। নির্মাণ প্রকল্পের ব্যবস্থাপনার তদারকিতে থাকা পরামর্শদাতা সংস্থা প্রোকোবার হিসাব অনুযায়ী, কর বাদ দিয়েই ব্যয় ধরা হয়েছে ২ কোটি ১০ লক্ষ ইউরোর বেশি। আন্তর্জাতিক বিএপিএস সম্প্রদায় অনুদান ও দানের মাধ্যমে পুরো অর্থ সংগ্রহ করেছে।

এই বিষয়ে বিএপিএসকে পরামর্শ দেওয়া আইনজীবী লিওনেল দ্যভিক বলেন, ‘ধর্মীয় সংগঠনগুলির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী এই অর্থের বিবরণ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রককে জানানো হয়েছিল।’ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক লা ক্রোয়া সংবাদপত্রকে জানিয়েছে, ‘উপাসনার স্বাধীনতা নিশ্চিত করার দায়িত্ব থেকে আমরা বিএপিএসের নির্মাণ প্রকল্পে, বিশেষ করে স্থানীয় স্তরে, এবং উদ্বোধনের আয়োজনেও সহায়তা করেছি।’

এই ধরনের তদারকির গুরুত্ব আরও বেড়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের একটি ঘটনার কারণে। ২০২১ সালে নিউ জার্সিতে মন্দির নির্মাণের কাজ চলাকালীন কেন্দ্রীয় পুলিশের অভিযানের পরে ২০০-র বেশি ভারতীয় শ্রমিকের তরফে একটি যৌথ মামলা দায়ের হয়েছিল। তাঁদের অভিযোগ ছিল, বিএপিএস মানব পাচার, জোর করে শ্রম আদায় এবং প্রাপ্য মজুরি আত্মসাতের সঙ্গে যুক্ত।

বিএপিএসের আর এক আইনজীবী নাতালি পেরঁ পাল্টা বলেন, ‘ফ্রান্সে বৈধ কাগজপত্রহীন মানুষদের নিয়ে কাজ করতে ভিঞ্চি কনস্ট্রাকশন কখনও রাজি হত না।’ ব্যুসির মেয়রের দপ্তরপ্রধানও আপত্তি জানান। তাঁর কথায়, ‘শ্রম পরিদর্শকেরা নির্মাণস্থলে এসেছিলেন। কোনও সমস্যা থাকলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হত বলেই আমার ধারণা। অন্য কোনও দেশে অনিয়ম ঘটে থাকতে পারে বলেই এখানেও একই পরিস্থিতি রয়েছে, এমন নয়।’

প্যারিস অঞ্চলের রক্ষণশীল প্রশাসনিক প্রধান ভালেরি পেক্রেস ২ সেপ্টেম্বর ‘ফ্রান্সের প্রথম পাথরে নির্মিত হিন্দু মন্দির’-এর প্রশংসা করেন। তাঁর বর্ণনায়, এটি ‘দুই দেশের কারিগরদের অসাধারণ সম্মিলনে জন্ম নেওয়া এক স্থাপনা’। কিন্তু বিতর্কগুলি হিন্দু উপাসকদের মনে তিক্ততা রেখে গিয়েছে।

তেমনই এক জন লন্ডনবাসী ৩১ বছরের আর্থিক বিশ্লেষক পার্বতী। বিষয়টি ঘিরে ফ্রান্সে এত উত্তেজনা কেন, তা তিনি বুঝতে পারছেন না। তাঁর কথায়, ‘মন্দিরে পুরুষ ও মহিলারা আলাদা দিকে থাকেন। কিন্তু ইহুদি বা ইসলামের মতো অন্য ধর্মেও তো তা হয়। দৈনন্দিন জীবনে বিএপিএসের মহিলারা উচ্চশিক্ষিত এবং পেশাগত ও সামাজিক ক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত। আর জাতিভেদের প্রসঙ্গে জানা দরকার, আমাদের আধ্যাত্মিক গুরু স্বামীনারায়ণ উনিশ শতকেই এই বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন। আমাদের সংগঠন দরিদ্রতম মানুষের সহায়তায় দাতব্য কাজও করে।’

আর এক অনুগামী উল্লেখ করেন, রাষ্ট্রপুঞ্জের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের সঙ্গে যুক্ত বিএপিএস জরুরি ত্রাণসাহায্য দেয়—যেমন ইউক্রেনে বা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সময়ে—এবং বিশ্বজুড়ে নিরক্ষরতা দূরীকরণেও কাজ করে।

ব্যুসি-সাঁ-জর্জে অবশ্য বিতর্ক ঘিরে অস্থিরতা কাটেনি। ১২ সেপ্টেম্বর ‘নমস্তে’ নামের সড়কচত্বরের স্থাপনার বিরুদ্ধে বিক্ষোভের ডাক দেয় বাম বিরোধীরা। ওই স্থাপনায় রয়েছে জোড়হাতের একটি ভাস্কর্য এবং ‘বিএপিএস’ লেখা।

সমালোচনার মুখেও শান্ত থাকার চেষ্টা করছে ব্যুসি-সাঁ-জর্জের পুর কর্তৃপক্ষ। তার্তো-জিনেস্তের প্রশ্ন, ‘ভারত যদি এতটাই অগ্রহণযোগ্য হয়, তা হলে ফ্রান্স সেই দেশের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারি বাড়াচ্ছে কী করে?’

নিজস্বতা ও অন্তর্ভুক্তির জন্য সংবাদমাধ্যমে এত দিন প্রশংসাই পেয়ে এসেছে ‘ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রাঙ্গণ’। এ বার তাকে এমন সব ভূরাজনৈতিক প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে, যার পরিধি ব্যুসি-সাঁ-জর্জের সীমানা ছাড়িয়ে অনেক দূর বিস্তৃত।