বন্ধুত্বের দাম স্মৃতি

যা জানা জরুরি
- স্কুলের শেষ ঘণ্টা পেরোলেই কেউ চলে যায় অন্য শহরে, কেউ বেছে নেয় অন্য জীবন।
- কিন্তু যদি পুরনো বন্ধুর সঙ্গে আবার বাড়ি ফিরতে হয় এমন এক দ্বীপ থেকে, যেখানে ফেরার একমাত্র মূল্য—তাকে নিয়ে জমিয়ে রাখা সব স্মৃতি ভুলে যাওয়া?
- ড্রিমওয়ার্কসের নতুন অ্যানিমেশন ‘ফরগটেন আইল্যান্ড’ সেই প্রশ্নই নিয়ে যাচ্ছে এক রহস্যময় দ্বীপে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
বড় হওয়ার সঙ্গে বদলে যায় বন্ধুত্বও। স্কুলের শেষ ঘণ্টা পেরোলেই কেউ চলে যায় অন্য শহরে, কেউ বেছে নেয় অন্য জীবন। কিন্তু যদি পুরনো বন্ধুর সঙ্গে আবার বাড়ি ফিরতে হয় এমন এক দ্বীপ থেকে, যেখানে ফেরার একমাত্র মূল্য—তাকে নিয়ে জমিয়ে রাখা সব স্মৃতি ভুলে যাওয়া?
ড্রিমওয়ার্কসের নতুন অ্যানিমেশন ‘ফরগটেন আইল্যান্ড’ সেই প্রশ্নই নিয়ে যাচ্ছে এক রহস্যময় দ্বীপে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেক্ষাগৃহে ছবিটির মুক্তির কথা ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬। মুক্তির আগে ২২ সেপ্টেম্বর রয়টার্সের সাক্ষাৎকারভিত্তিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ছবিটির আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক—এর গভীর ফিলিপিনো শিকড়।
পরিচালক জানুয়েল মেরকাদো ও জোয়েল ক্রফোর্ড এমন এক কল্পজগৎ তৈরি করেছেন, যেখানে ফিলিপিন্সের পারিবারিক গল্প ও লোকবিশ্বাস থেকে উঠে এসেছে দ্বীপের বহু প্রাণী। ফলে ছবির অচেনা জগৎটি শুধু হলিউডি অ্যাডভেঞ্চারের নতুন সাজ নয়; নির্মাতাদের নিজেদের পারিবারিক স্মৃতি ও সম্পর্কও এর ভিত গড়ে দিয়েছে।
ড্রিমওয়ার্কসের প্রকাশিত কাহিনিসূত্রে দুই বন্ধু—জো ও রাইসা। ছোটবেলা থেকে একসঙ্গে বেড়ে ওঠা এই দুই তরুণী উচ্চবিদ্যালয় শেষ করে জীবনের আলাদা পথে পা রাখার মুখে। বিচ্ছেদের আগে শেষ রাতটা একসঙ্গে কাটাতে গিয়ে রহস্যময় এক প্রবেশপথ তাঁদের পৌঁছে দেয় নাকালি দ্বীপে।
তারপর শৈশবে শোনা গল্পগুলো আর গল্প থাকে না। সেই দ্বীপে দেখা মেলে লোককথার প্রাণীদের—কেউ বন্ধু, কেউ বিপজ্জনক। কিন্তু আসল লড়াই কোনও দানবকে হারানো নয়। বাড়ি ফিরতে হলে জো ও রাইসাকে এমন এক মূল্য দিতে হতে পারে, যা তাদের বন্ধুত্বের সবচেয়ে গভীর জায়গাতেই আঘাত করবে।
জোয়ের কণ্ঠ দিয়েছেন সংগীতশিল্পী এইচ.ই.আর., রাইসার কণ্ঠে লিজা সোবেরানো। রয়েছেন লিয়া সালোঁগা, ডেভ ফ্র্যাঙ্কো, ম্যানি হাসিন্তো, ডলি দে লিয়ন, জো কয়, জেনি স্লেট ও রনি চিয়েংও। তবে তারকা-কণ্ঠের দীর্ঘ তালিকার চেয়ে ছবিটির কেন্দ্রীয় সম্পর্কটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ—দুই বন্ধুর বড় হয়ে ওঠা এবং সেই সঙ্গে একে অপরকে হারিয়ে ফেলার ভয়।
দ্বীপের অন্যতম ভয়ংকর প্রাণী মানানাঙ্গাল, ফিলিপিনো লোককথার এমন এক সত্তা যে নিজের শরীরকে দু’ভাগ করতে পারে। ছবিতে তার কণ্ঠ দিয়েছেন সালোঁগা। এইচ.ই.আর. রয়টার্সকে জানিয়েছেন, ছোটবেলায় তাঁর মা তাঁকে মানানাঙ্গালের গল্প শোনাতেন। ফলে চরিত্রটির সঙ্গে কাজ করা তাঁর কাছে নিছক অভিনয় নয়; শৈশবের এক পরিচিত গল্পে ফিরে যাওয়াও।
ছবির সঙ্গে পরিচালকদের ব্যক্তিগত যোগও রয়েছে। মেরকাদোর বোন জোয়ানের নাম থেকেই এসেছে ‘জো’ চরিত্রটির নাম। অন্যদিকে সহপরিচালক ক্রফোর্ডের স্ত্রী ফিলিপিনো। এই ব্যক্তিগত সম্পর্কগুলো ছবির সাংস্কৃতিক উৎসের একটা ধারণা দেয়। তবে একটি পরিবারের অভিজ্ঞতাকে গোটা ফিলিপিন্সের সংস্কৃতির সমার্থক করে দেখা ঠিক হবে না। দেশটির বহু ভাষা, অঞ্চল ও বিচিত্র লোকবিশ্বাসের কতটা ছবিতে জায়গা পেয়েছে, তা বোঝা যাবে পুরো ছবিটি দেখার পরেই।
ফিলিপিনো সংযোগ শুধু গল্পেই থেমে নেই। ১৭ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত দ্য অস্ট্রেলিয়ান-এর স্টুডিয়োভিত্তিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মূল ত্রিমাত্রিক অ্যানিমেশনের পাশাপাশি ম্যানিলার স্নিপল অ্যানিমেশন দ্বিমাত্রিক অংশের কাজ করেছে। অর্থাৎ ফিলিপিন্স এখানে শুধু গল্পের পটভূমি নয়, নির্মাণপ্রক্রিয়ারও একটি অংশ।
ছবির সময়কালও নব্বইয়ের দশক। তাই তাকে সমকালীন ফিলিপিন্সের সরাসরি প্রতিচ্ছবি হিসেবে পড়ার সুযোগ সীমিত। প্রযোজক মার্ক সুইফট, ক্রফোর্ড ও মেরকাদো এর আগে ‘পুস ইন বুটস: দ্য লাস্ট উইশ’-এ একসঙ্গে কাজ করেছেন। নতুন ছবিটি পরিবেশন করছে ইউনিভার্সাল পিকচার্স। তবে আগের ছবির সাফল্য নতুন ছবির মান বা বাণিজ্যিক ফলের নিশ্চয়তা নয়।
‘ফরগটেন আইল্যান্ড’-এর আকর্ষণ সম্ভবত এখানেই—একদিকে নির্দিষ্ট সংস্কৃতির লোককথা, অন্যদিকে এমন এক আবেগ যা সংস্কৃতির সীমানা মানে না। বন্ধুকে হারানোর ভয়, বড় হয়ে ওঠার অস্বস্তি, পুরনো সম্পর্ক ধরে রাখার চেষ্টা—এই অনুভূতিগুলোই হয়তো অচেনা দ্বীপটিকে দর্শকের কাছে পরিচিত করে তুলবে।
আর সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক প্রশ্নটি হল, বাড়ি ফিরতে যদি স্মৃতিই বিসর্জন দিতে হয়, তবে সেই ফেরা আদৌ কাকে নিয়ে?
শিশু-কিশোরের গল্পে বাড়ি ফেরা সাধারণত নিরাপত্তার প্রতীক। এখানে সেই নিরাপত্তার সঙ্গেই যদি স্মৃতি হারানোর ভয় জুড়ে যায়, তবে গল্পটি পরিচয় ও সম্পর্কের অন্য এক স্তরে পৌঁছতে পারে। সেটি কতটা গভীরভাবে ছবিতে ফুটে উঠেছে, তার উত্তর অবশ্য মুক্তির পরই মিলবে। আপাতত ‘ফরগটেন আইল্যান্ড’ ফিলিপিনো লোককথাকে আন্তর্জাতিক অ্যানিমেশনের কেন্দ্রে আনার একটি উল্লেখযোগ্য প্রচেষ্টা—এর পরিণতি দর্শকরাই ঠিক করবেন।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



