International

হরমুজে ট্রাম্পের ছাপ

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • প্রতিবেদন হরমুজ প্রণালী খুলতে ইরানের দেওয়া সাত দিনের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
  • শুধু তা-ই নয়, শুক্রবার নিজের সমাজমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ প্রকাশিত একটি মানচিত্রে হরমুজের নামই বদলে দিলেন তিনি—নতুন নাম, ‘ট্রাম্প প্রণালী’।
  • হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, “ওরা একটি প্রস্তাব দিয়েছে, কিন্তু আমি তা প্রত্যাখ্যান করছি।” ইরানের প্রস্তাবটি এসেছিল চলতি সপ্তাহের গোড়ায় নিউ ইয়র্কে রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ…

বিস্তারিত প্রতিবেদন

প্রতিবেদন

হরমুজ প্রণালী খুলতে ইরানের দেওয়া সাত দিনের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শুধু তা-ই নয়, শুক্রবার নিজের সমাজমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ প্রকাশিত একটি মানচিত্রে হরমুজের নামই বদলে দিলেন তিনি—নতুন নাম, ‘ট্রাম্প প্রণালী’।

হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, “ওরা একটি প্রস্তাব দিয়েছে, কিন্তু আমি তা প্রত্যাখ্যান করছি।”

ইরানের প্রস্তাবটি এসেছিল চলতি সপ্তাহের গোড়ায় নিউ ইয়র্কে রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন ঘিরে কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যে। তিন ঘণ্টার একটি বৈঠকে তেহরান জানিয়েছিল, মার্কিন নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়া হলে সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া হবে এবং পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ফের আলোচনা শুরু হবে।

প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রথম চার-পাঁচ দিনে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শেষ করে ষষ্ঠ দিনে হরমুজ খুলে দেওয়া হবে। সপ্তম দিনে শুরু হতে পারে পরমাণু আলোচনা। একই সঙ্গে রাষ্ট্রপুঞ্জের পরমাণু পরিদর্শকদের ইরানে ফেরার ব্যবস্থাও করার কথা জানিয়েছে তেহরান। ক্ষতিগ্রস্ত পরমাণু কেন্দ্র এবং উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত পরীক্ষা করতে তাঁদের প্রবেশের নিয়মও নির্ধারণ করা হবে।

বিনিময়ে ইরান চেয়েছে মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার, জব্দ থাকা সম্পদের একাংশ ছাড়ার অনুমতি এবং ইরানের তেল রফতানির উপর নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত কিছু ছাড় ফিরিয়ে আনা। পাশাপাশি, “সব রণাঙ্গনে যুদ্ধবিরতি” পালনের দাবিও রেখেছে তেহরান।

শুক্রবার রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদের বাইরে ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি প্রস্তাবটির বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন। তাঁর বক্তব্য, আমেরিকা প্রস্তাব মেনে নিলেই সাত দিনের সময়সীমা কার্যকর হতে পারে। কাতারের মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের কাছে ইতিমধ্যেই একটি নির্দিষ্ট পরিকল্পনা পাঠানো হয়েছে।

আরাঘচির কথায়, “চুক্তিতে পৌঁছনো এবং হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার ব্যাপারে মার্কিন পক্ষ আন্তরিক হলে, এখন সব প্রস্তুত।” তাঁর দাবি, প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ হলে সাত দিনের মধ্যেই স্বাভাবিক নৌচলাচল ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

তবে সেই প্রস্তাবে এমন কিছু শর্ত রয়েছে, যা ওয়াশিংটনের জন্য রাজনৈতিক ও কৌশলগত ভাবে কঠিন। লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লার উপর হামলা বন্ধ করতে ইজরায়েলকে রাজি করানোর প্রশ্ন রয়েছে। আবার প্রস্তাবিত নৌপথের বড় অংশ ইরানের জলসীমার মধ্যে পড়ায় হরমুজ খোলার ব্যবস্থাটিও মূলত তেহরানের শর্ত মেনেই করতে হবে।

সৌদি আরব-সহ উপসাগরীয় দেশগুলিরও এই ব্যবস্থাকে ঘিরে উদ্বেগ রয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। কারণ, প্রস্তাবিত নৌপথ সংক্রান্ত চুক্তি হবে ইরান ও ওমানের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি। উপসাগরীয় দেশগুলি সম্মিলিত ভাবে তার অংশীদার হবে না।

এর মধ্যেই মার্কিন আধিকারিকদের উদ্ধৃত করে ‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ জানিয়েছে, ইরান পরমাণু কর্মসূচি সম্পূর্ণ গুটিয়ে নেওয়ার দাবি মেনে নেবে কি না, তা নিয়ে ট্রাম্প তাঁর ঘনিষ্ঠ মহলে সংশয় প্রকাশ করেছেন। সংবাদপত্রটির দাবি, ট্রাম্প সহযোগীদের বলেছেন, নভেম্বরে আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরে ইরানে ফের বোমাবর্ষণ শুরু হতে পারে।

অন্য দিকে, শনিবার সকালে ইরানের সরকারি সংবাদমাধ্যম জানায়, প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান নিউ ইয়র্ক থেকে তেহরানের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। রাষ্ট্রপুঞ্জের মহাসচিব আন্তোনিয়ো গুতেরেসের সঙ্গে বৈঠকের পরে তিনি বলেন, “ইরান আলোচনার টেবিল ছেড়ে যায়নি। কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতার কারণে আমেরিকাকে আর বিশ্বাস করে না।”

সিবিএস-এর ‘ফেস দ্য নেশন’ অনুষ্ঠানে দেওয়া সাক্ষাৎকারেও পেজেশকিয়ান জানান, পরমাণু কর্মসূচি-সহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনায় বসতে প্রস্তুত তেহরান। তবে “দাদাগিরি বা জবরদস্তি” মেনে নেওয়া হবে না। তাঁর বক্তব্য, “ইরান যুদ্ধ চাইছে না। কিন্তু চাপ, হুমকি ও হামলার বিরুদ্ধে নিজেদের রক্ষা করবে।”

পরমাণু অস্ত্র তৈরির লক্ষ্য নেই বলেও দাবি করেন পেজেশকিয়ান। তাঁর কথায়, ইরান ইতিমধ্যেই মেনে নিয়েছে যে “আমাদের পরমাণু অস্ত্র তৈরি করার কথা নয়।”

কিন্তু কূটনীতির পাশাপাশি হরমুজ ঘিরে বাস্তব চাপও বাড়ছে। মার্কিন নৌ-অবরোধ ইরানের অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করেছে। অন্য দিকে, সাত মাস ধরে চলা সংঘাতে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌবাণিজ্যপথ দিয়ে তেল পরিবহণ ব্যাহত হয়েছে। ফলে জ্বালানির দাম এবং তার সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয়ও বেড়েছে বিভিন্ন দেশে।

এই সংঘাতের শুরু ২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা ও ইজরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে। এরপর কখনও লড়াইয়ে বিরতি এসেছে, কখনও ফের শুরু হয়েছে হামলা। হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ইরানের প্রচলিত সামরিক শক্তি দুর্বল হওয়ার পাশাপাশি আরও চাপে পড়েছে দেশটির অর্থনীতি।

পাল্টা জবাবে ইরান ও তার মিত্ররাও সংঘাতের পরিসর বাড়িয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে আমেরিকার মিত্র দেশগুলিতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছে। ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথিরা সৌদি স্বার্থসংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। ইরাকের একটি তেলের পাইপলাইনে হামলার জন্য ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলিকে দায়ী করা হয়েছে। এর জেরে বাজারে সৌদি তেলের সরবরাহ সাময়িক ভাবে আরও কমে যায়।

ইয়েমেনের এই অস্থিরতা নতুন মানবিক সঙ্কটও তৈরি করেছে। শুক্রবার রাষ্ট্রপুঞ্জের শিশু তহবিল জানিয়েছে, সেখানে শিশুদের মধ্যে তীব্র অপুষ্টি বেড়ে যাচ্ছে।

চড়া তেলের দাম বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ালেও ট্রাম্প এর আগে বলেছেন, ইরানের সঙ্গে চুক্তিতে পৌঁছনোর কোনও তাড়া তাঁর নেই। অন্য দিকে, তেহরানের অভ্যন্তরেও প্রশ্ন রয়েছে—নিরাপত্তা কাঠামোয় প্রভাবশালী কট্টরপন্থীরা পেজেশকিয়ানের মতো তুলনামূলক মধ্যপন্থী নেতৃত্বের সমর্থিত কোনও আপস মেনে নেবেন কি না।

রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ পরিষদের মঞ্চে তাই হরমুজ এখন শুধু একটি জলপথের নাম নয়। তেল, যুদ্ধ, পরমাণু কূটনীতি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য—সব কিছুর চাপ এসে জমেছে এই সরু প্রণালীকে ঘিরে। আর তার মাঝেই ট্রাম্পের মানচিত্রে হরমুজ পেল নতুন এক নাম—‘ট্রাম্প প্রণালী’।

কিউবা প্রসঙ্গেও সুর বদল ট্রাম্পের

হরমুজ নিয়ে টানাপোড়েনের মধ্যেই শনিবার কিউবা নিয়েও মন্তব্য করেন ট্রাম্প। সাধারণ পরিষদে ভাষণে তিনি কিউবাকে “ব্যর্থ রাষ্ট্র” বলে অভিহিত করেছিলেন এবং কমিউনিস্ট শাসনের পতন হবে বলে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। প্রতিবাদে কিউবার প্রতিনিধিদল সভাকক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে যায়।

তবে শনিবার সাংবাদিকদের সামনে ট্রাম্পের সুর ছিল কিছুটা আলাদা। কিউবাকে মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বিপদ বলে দাবি করলেও তিনি বলেন, তাঁর ধারণা, “কিউবা ও আমাদের মধ্যে একটি চুক্তি হবে।” কিউবার বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন হবে বলেও তিনি মনে করেন না।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles