হিংসার জেরে বন্ধ, ছাত্রবিক্ষোভে ফের উদ্যোগ: মহারাষ্ট্রে ফিরবে ছাত্রভোট?

যা জানা জরুরি
- বাংলাস্ফিয়ারঃ তেত্রিশ বছর পরে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রভোট ফেরানোর উদ্যোগ নিল মহারাষ্ট্র সরকার।
- মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফডণবীসের নেতৃত্বাধীন মহাযুতি সরকারের উচ্চ ও কারিগরি শিক্ষা দপ্তর বৃহস্পতিবার মুম্বই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য সুহাস পেডনেকরের নেতৃত্বে বারো সদস্যের কমিটি গড়েছে।
- এক মাসের মধ্যে নির্বাচনের নিয়মকানুন নিয়ে সুপারিশ জমা দেবে কমিটি।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
বাংলাস্ফিয়ারঃ তেত্রিশ বছর পরে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রভোট ফেরানোর উদ্যোগ নিল মহারাষ্ট্র সরকার। মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফডণবীসের নেতৃত্বাধীন মহাযুতি সরকারের উচ্চ ও কারিগরি শিক্ষা দপ্তর বৃহস্পতিবার মুম্বই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য সুহাস পেডনেকরের নেতৃত্বে বারো সদস্যের কমিটি গড়েছে। এক মাসের মধ্যে নির্বাচনের নিয়মকানুন নিয়ে সুপারিশ জমা দেবে কমিটি। তবে ভোটের দিনক্ষণ এখনও ঘোষণা হয়নি।
মহারাষ্ট্রে সর্বশেষ ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়েছিল ১৯৯৩ সালে। তার আগে শিক্ষাঙ্গনে রাজনৈতিক সংঘর্ষ, অর্থবল ও পেশিশক্তির দাপট নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছিল। ১৯৮৯ সালের অক্টোবরে মুম্বইয়ের একটি কলেজের বাইরে নির্বাচনী প্রচারের সময় খুন হন কংগ্রেসের ছাত্র সংগঠন এনএসইউআইয়ের নেতা ওয়েন ডিসুজা। ছাত্ররাজনীতির হিংসাত্মক চেহারা নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র হয় এই ঘটনার পরে।
১৯৯৪ সালের মহারাষ্ট্র বিশ্ববিদ্যালয় আইনে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ছাত্র নির্বাচন বন্ধ হয়। সরকারের যুক্তি ছিল, শিক্ষাঙ্গনের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষা জরুরি। এরপর ছাত্র পরিষদ থাকলেও প্রতিনিধি বাছাইয়ের অধিকার হারান সাধারণ পড়ুয়ারা। নির্বাচনের জায়গা নেয় মনোনয়ন বা কর্তৃপক্ষের পছন্দের সদস্যদের পরিষদ। কয়েক প্রজন্মের পড়ুয়া নিজেদের প্রতিনিধি বেছে নেওয়ার অভিজ্ঞতা ছাড়াই কলেজ ছাড়েন।
নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের উদ্যোগ অবশ্য নতুন নয়। ২০১৩–১৪ সালে সর্বদলীয় আলোচনার পরে ২০১৬ সালে ফডণবীসের তৎকালীন বিজেপি–শিবসেনা সরকার নতুন বিশ্ববিদ্যালয় আইন আনে। তাতে নির্বাচিত ছাত্র পরিষদের ব্যবস্থা রাখা হয়। লিংডো কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী প্রার্থীর যোগ্যতা, উপস্থিতি, প্রচারের খরচ ও আচরণবিধির মাধ্যমে অর্থবল এবং পেশিশক্তি নিয়ন্ত্রণের কথাও ভাবা হয়েছিল।
২০১৮ সালে বিস্তারিত নিয়ম তৈরি হয়; বিশ্ববিদ্যালয়গুলি ২০১৯ সালের ভোটের প্রস্তুতিও নেয়। কিন্তু সেই বছরের অগস্টে ফের নির্বাচন স্থগিত করে রাজ্য মন্ত্রিসভা। কারণ হিসেবে সামনে আনা হয় আসন্ন বিধানসভা নির্বাচন এবং আইনশৃঙ্খলার আশঙ্কা। এরপর অতিমারি ও রাজ্যের রাজনৈতিক অস্থিরতায় বিষয়টি পিছিয়ে যায়। নতুন ভোটের দিন আর ঘোষণা হয়নি।
এবারের উদ্যোগের পটভূমিতে রয়েছে ছাত্রবিক্ষোভ। জুলাইয়ে ডাক্তারির প্রবেশিকা নিটের প্রশ্নফাঁসের প্রতিবাদে মহারাষ্ট্রজুড়ে বহু তরুণ পথে নামেন। সেপ্টেম্বরে আইআইটি বম্বের কুড়ি বছরের পড়ুয়া সাহিল ওয়াকোড়ের আত্মহত্যার পরে প্রতিষ্ঠানের অভিযোগ নিষ্পত্তি ও শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা নিয়ে আন্দোলন হয়। পরিবারের তোলা অভিযোগের তদন্ত চলছে। এই ঘটনাগুলির প্রেক্ষাপটেই ছাত্রদের নির্বাচিত প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন নতুন গুরুত্ব পেয়েছে।
বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, ছাত্রভোট বন্ধ থাকলেই ছাত্ররাজনীতি বা ক্ষোভ বন্ধ থাকে না। প্রতিষ্ঠিত সংগঠনের বাইরেও তরুণেরা আন্দোলনে নামছেন। তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে বিভিন্ন ছাত্র ও যুব সংগঠন সদস্য সংগ্রহ শুরু করেছে। ফলে নির্বাচন ফেরানোর দাবির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জবাবদিহির প্রশ্ন।
পেডনেকর কমিটিকে বাইরের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও নির্বাচনে অর্থের দাপট ঠেকানোর ব্যবস্থা খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছে। মনোনয়ন, যাচাই, ভোটগ্রহণ এবং অভিযোগ নিষ্পত্তিতে প্রযুক্তির ব্যবহারও বিবেচনায় রয়েছে। ছাত্র পরিষদের তহবিল পরিচালনা, ব্যয় ও হিসাব পরীক্ষার নিয়ম সুপারিশ করবে। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দায়িত্ব সম্পর্কে প্রশিক্ষণ এবং নারী, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও বিভিন্ন সহশিক্ষামূলক কার্যক্রমে যুক্ত পড়ুয়াদের প্রতিনিধিত্বও আলোচ্য।
উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও সংশয় রয়েছে ছাত্র সংগঠনগুলির। উদ্ধব ঠাকরের শিবসেনার যুবনেতা প্রদীপ সাওয়ন্তের প্রশ্ন, নতুন কমিটি সত্যিই ভোট ফেরাবে, নাকি ক্ষোভ প্রশমনের চেষ্টা হয়েই থাকবে? শরদ পওয়ারের এনসিপির অমোল মাতেলের দাবি, পুরনো নিয়ম প্রস্তুত থাকায় সরকার দ্রুত এগোক; আগামী শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই প্রক্রিয়া তৈরি করে জুলাইয়ে নির্বাচন করানো হোক।
অন্যদিকে, কয়েকজন কলেজ অধ্যক্ষ শিক্ষাঙ্গনে দলীয় প্রভাব ও অশান্তি বাড়ার আশঙ্কা জানিয়েছেন। সমর্থকদের যুক্তি, নির্বাচিত পরিষদ পড়ুয়াদের অভিযোগ জানানোর স্বীকৃত পথ এবং নেতৃত্ব শেখার সুযোগ দেয়। ফলে সরকারের সামনে কাজ শুধু ভোট চালু করা নয়, এমন ব্যবস্থা গড়া যেখানে ছাত্রদের স্বাধীন প্রতিনিধিত্ব ও শিক্ষাঙ্গনের শান্তি একসঙ্গে সুরক্ষিত থাকবে। কমিটির সুপারিশেই সেই ব্যবস্থার রূপরেখা স্পষ্ট হবে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



