শনিবারের বৈঠকের পরে নির্বাচন কমিশন যে নয়টি সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে, তাতে দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক জোশীর নথিভুক্ত উদ্বেগের বেশ কয়েকটির সুরাহার চেষ্টা রয়েছে। কিন্তু কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নীরবতা থেকেই গেল—বিশেষ করে ফর্ম ৬ এবং বাংলায় ভোটারদের নাম অন্তর্ভুক্তির বিরুদ্ধে আপিল নিয়ে।

মাত্র তিন দিন আগেও তিন সদস্যের নির্বাচন কমিশনের কাজকর্ম নিয়ে কমিশনের বক্তব্য ছিল সোজাসাপ্টা।

কমিশনের মূল দায়িত্বের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে তার দুই সদস্য অন্তত ১৪ বার লিখিত আপত্তি জানিয়েছিলেন। কাকে ভোটার হিসেবে নথিভুক্ত করা হবে, কার নাম বাদ যাবে বা ফেরানো হবে, নাম ফেরানোর বিরুদ্ধে কে আপিল করবে এবং যে ব্যবস্থার মাধ্যমে ভোটার তালিকা রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়, তার নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে—আপত্তি উঠেছিল এই সব প্রশ্নে।

কমিশন অবশ্য ওই লিখিত আপত্তিগুলিকে বলেছিল ‘পরামর্শ’ ও ‘মতামত’—স্বাভাবিক আলোচনাপ্রক্রিয়ারই অংশ। জোর দিয়ে দাবি করেছিল, গত এক বছরের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলি পূর্ণাঙ্গ কমিশনের ‘সর্বসম্মত’ অনুমোদনেই নেওয়া হয়েছে।

শনিবার কমিশন আবার বৈঠকে বসল। তার পরে যা ঘটল, তা নজর কাড়ার মতো। বৈঠক শেষে প্রকাশিত চার পাতার বিবৃতিতে নয়টি সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হল। দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক জোশী যে উদ্বেগগুলি লিখিত ভাবে জানিয়েছিলেন, তার বেশ কয়েকটির বিষয়ে একে একে পদক্ষেপের কথা বলা হল।

নতুন সিদ্ধান্তগুলি কী?

এখন থেকে কমিশনের প্রতিটি বৈঠকের আগে আলোচ্যসূচি পাঠানো হবে এবং বৈঠকের পরে কার্যবিবরণী প্রকাশ করা হবে। আধিকারিকদের বিদেশ সফরের জন্য কমিশনের অনুমোদন নিতে হবে। নতুন তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থা ও পোর্টাল প্রথমে আধিকারিকদের একটি কমিটির পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাবে; তার পরে তা কমিশনের সামনে পেশ করা হবে।

একজন প্রবীণ ডেপুটি  কমিশনারের নেতৃত্বাধীন কমিটি ইসিনেট খতিয়ে দেখবে। সেই কমিটিতে কোনও আইআইটি বা আইআইআইটি-র একজন স্বাধীন বিশেষজ্ঞও থাকবেন। মাঠপর্যায়ের আধিকারিকদের কাজের প্রয়োজনে ব্যবস্থাটিতে আরও নমনীয়তা দরকার হলে, তার সংস্থান করা হবে। আর নির্বাচন কমিশনারেরা আধিকারিকদের যে নির্দেশ দেবেন, তা ‘অক্ষরে অক্ষরে পালন’ করতে হবে।

গত দশ মাসে দুই কমিশনার যে উদ্বেগগুলি নথিভুক্ত করেছিলেন, এই সিদ্ধান্তগুলি প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই তার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। তাঁদের অভিযোগ ছিল, বৈঠকের আলোচ্যসূচি পাঠানো হচ্ছিল না, কার্যবিবরণী প্রকাশ করা হচ্ছিল না, কমিশনের অনুমোদন ছাড়াই আধিকারিকেরা বিদেশে যাচ্ছিলেন, কমিশনকে না জানিয়েই নতুন তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থা তৈরি হচ্ছিল, ভোটার তালিকার তথ্যভান্ডার স্বাধীন বিশেষজ্ঞকে দিয়ে নিরীক্ষা করানো প্রয়োজন,, মাঠপর্যায়ের আধিকারিকদের ইরোনেটে ‘যথাযথ ও পূর্ণাঙ্গ প্রবেশাধিকার’ ছিল না,

এবং তাঁদের অংশগ্রহণ ছাড়াই একটি প্রশাসনিক আদেশে তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের কাজের দায়িত্ববণ্টন বদলে দেওয়া হয়েছিল।

গোয়ায় স্থানীয় আধিকারিকদের ছাড়পত্র পাওয়া সত্ত্বেও ৯৭ জন ভোটারের নাম চূড়ান্ত তালিকায় ছিল না বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছিল। কমিশন এখন জানিয়েছে, তাঁদের মধ্যে ৮১ জন ফর্ম ৬ পূরণ করেছেন। তাঁদের নাম অন্তর্ভুক্তির ব্যবস্থা করতে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

অবস্থানের এই আকস্মিক পরিবর্তন বুঝিয়ে দেয়, কমিশনের অন্দরের অস্বস্তি কত গভীর হয়েছিল এবং তার অভিঘাত বাইরেও কত দূর ছড়িয়েছিল। শুক্রবারের মধ্যেই বিরোধী দলগুলি বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর-এ তৈরি ভোটার তালিকার ভিত্তিতে হওয়া নির্বাচন বাতিলের দাবি তুলেছিল।

ফর্ম ৬-এর কী হবে?

তবে আপত্তি মেনে নেওয়ারও সীমা আছে। ফর্ম ৬-এর প্রশ্নে সেটাই স্পষ্ট। বিবৃতির এই অংশটি পড়লে মনে হয় আপত্তি মেনে নেওয়া হয়েছে। আসলে তা হয়নি।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এসআইআর চলার সময় ছাড়া অন্য সময়ে ভোটার নিবন্ধন বিধিতে নির্ধারিত ফর্মই প্রযোজ্য হবে। মে মাসে জোশী যে আপত্তি তুলেছিলেন, তার মূল কথাও ছিল সেটাই।

কিন্তু আপত্তিটি ছিল ইসিনেটে থাকা অনলাইন ফর্ম নিয়ে। সেখানে ‘জে’ এবং ‘কে’ অংশের মাঝখানে আবেদনকারীর বাবা-মা সম্পর্কে একটি প্রশ্ন ঢোকানো হয়েছিল। সেই প্রশ্নের উত্তর না দিলে আবেদনকারী আর এগোতে পারছিলেন না। কমিশনের বিবৃতিতে ওই অনলাইন ফর্মের উল্লেখ নেই, প্রশ্নটিরও উল্লেখ নেই। সেটি সরিয়ে দেওয়া হয়েছে কি না, তা-ও বলা হয়নি।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্ট ওই ঘোষণাপত্র ‘বহাল রেখেছে’। কিন্তু এসআইআর নিয়ে আদালতের ২৭ মে-র আদেশের ভাষায় তেমন কথা স্পষ্ট ভাবে বলা হয়েছে বলে মনে হয় না। জুলাই মাসে কে ওই প্রশ্নটি ঢুকিয়েছিলেন, কিংবা ১৩ আগস্ট সান্ধু সেটিকে ‘অননুমোদিত/বেআইনি’ বলার পরেও কেন তা বহাল ছিল—বিবৃতিতে তারও উত্তর নেই।

যে প্রশ্নগুলির উত্তর মিলল না

আরও কিছু প্রশ্নও অমীমাংসিত রয়ে গেল।

পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি নিয়ে বিবৃতিতে কিছুই বলা হয়নি। বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের নির্দেশে যাঁদের নাম ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল, তাঁদের সেই অন্তর্ভুক্তির বিরুদ্ধে আপিল করার অনুমতি কে দিয়েছিলেন? আপিলগুলি কি ভারতের নির্বাচন কমিশনের তরফে করা হয়েছিল? হয়ে থাকলে, কমিশনের হয়ে সেই অনুমোদন কে দিয়েছিলেন?

গোয়ায় ভোটারদের নাম ফেরানোর জন্য সফটওয়্যারে যে সুবিধা চাওয়া হয়েছিল, তা কেন কখনও চালু করা হল না, তারও ব্যাখ্যা নেই।

তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের মহাপরিচালক সীমা খান্নার কাজকর্ম নিয়ে মতবিরোধ তৈরি হয়েছিল। অন্য দিকে, প্রবীণ কমিশনার মণীশ গর্গের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছিলেন দুই কমিশনারই। তাঁরা নিজ নিজ পদে বহাল থাকবেন কি না, বিবৃতিতে তা-ও বলা হয়নি।

আর সবচেয়ে বড় প্রশ্নটিও খোলাই রয়ে গেল: এর পরে কমিশনের ভিতরে কাজকর্ম চলবে কী ভাবে? জ্ঞানেশ কুমার কি এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সান্ধু ও জোশীকে সঙ্গে নেবেন? নিজেদের আপত্তি নথিভুক্ত করার পরে ওই দুই কমিশনার কি সিদ্ধান্ত গ্রহণে আরও বেশি গুরুত্ব পাবেন? তার উত্তর এখনও ভবিষ্যতের গর্ভে।