জামুইয়ে ‘সুশাসন’-এর ফাটল

যা জানা জরুরি
- কোচিং থেকে বাড়ি ফিরছিল দশম শ্রেণির এক ছাত্রী ও তার বন্ধু।
- পথে শহরের বাইরের পাহাড়ি এলাকায় বেড়াতে গিয়েছিল তারা।
- দুই পড়ুয়াকে হেনস্থা ও মারধরের পাশাপাশি গোটা ঘটনার ভিডিয়ো করে অভিযুক্তেরা।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
কোচিং থেকে বাড়ি ফিরছিল দশম শ্রেণির এক ছাত্রী ও তার বন্ধু। পথে শহরের বাইরের পাহাড়ি এলাকায় বেড়াতে গিয়েছিল তারা। সেখানেই একদল ছেলে তাদের পথ আটকায়। দলের মধ্যে ছিল বেশ কয়েক জন কিশোরও। দুই পড়ুয়াকে হেনস্থা ও মারধরের পাশাপাশি গোটা ঘটনার ভিডিয়ো করে অভিযুক্তেরা। বিহারের জামুইয়ের এই ঘটনা এবার প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে এনডিএ সরকারের বহুচর্চিত ‘সুশাসন’-এর দাবিকে।
ঘটনার ভয়াবহ ভিডিয়োগুলিতে দেখা যাচ্ছে, দুই কিশোর-কিশোরী বারবার কাকুতি-মিনতি করছে, তাদের যেন বাড়ি ফিরে যেতে দেওয়া হয়। কিন্তু অভিযুক্তেরা হুমকি দিতে থাকে। নাবালিকা ছাত্রীটিকে হেনস্থা করার দৃশ্যও ধরা পড়েছে ভিডিয়োয়। ঘটনার পর দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়েছে। লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী-সহ বিরোধী নেতারা সরব হয়েছেন বিহার সরকারের বিরুদ্ধে। চাপে পড়েছেন মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরীও।
প্রায় দু’দশক ধরে বিহারে এনডিএ-র রাজনৈতিক প্রচারের অন্যতম প্রধান ভিত্তি ‘সুশাসন’। আরজেডি আমলে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছিল—এই অভিযোগ তুলে জোটের নেতারা বারবার ‘জঙ্গলরাজ’-এর প্রসঙ্গ তুলেছেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক হিংসার ঘটনা, পুলিশের সঙ্গে বিতর্কিত সংঘর্ষ এবং শরিক নেতাদের বিতর্কিত মন্তব্য সেই প্রচারের ভিত্তিকেই নড়িয়ে দিচ্ছে। জামুই-কাণ্ডে সেই রাজনৈতিক অস্বস্তি আরও প্রকাশ্যে এসেছে।
‘বিচ্ছিন্ন’ বলেই বিতর্কে জেডিইউ
আরজেডি নেতা তেজস্বীপ্রসাদ যাদবের নেতৃত্বে বিহারের বিরোধীরা সরকারের বিরুদ্ধে আক্রমণ শানিয়েছেন। জাতীয় স্তরের বিরোধী দলগুলিও সরব হয়েছে। এর মধ্যেই জেডিইউ-র তিন প্রবীণ নেতার মন্তব্য বিতর্ক আরও বাড়িয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, ঘটনাটিকে ‘বিচ্ছিন্ন’ ও ‘ছোটখাটো’ বলে গুরুত্ব কমিয়ে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে।
জেডিইউ নেতা তথা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী রাজীবরঞ্জন সিংহ, যিনি লালন সিংহ নামে পরিচিত, সাংবাদিকদের বলেন, “একটা সময় ছিল, যখন সন্ধ্যার পরে মেয়েরা বাড়ি থেকে বেরোত না। এখন তারা যে কোনও সময়ে বেরোতে পারে… কোনও একটি ঘটনা দিয়ে গোটা রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা বিচার করা উচিত নয়। এ ধরনের কোনও ঘটনা ঘটলেই পুলিশ ব্যবস্থা নেয়।”
জেডিইউ-র রাজ্য সভাপতি উমেশ কুশওয়াহার মন্তব্যেও একই সুর। তিনি বলেন, “এ রকম ছোটখাটো, বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটলে আমাদের পুলিশ ব্যবস্থা নেয়। কিন্তু ২০০৫ সালের আগের অন্ধকার যুগের কথা মানুষ ভুলে যায় কেন? তখন বিহারের অবস্থা কী ছিল?”
রাজ্যের মন্ত্রী শ্রবণ কুমারও ঘটনাটিকে ‘ছিটপুট’ বা বিক্ষিপ্ত বলে বর্ণনা করেন। তাঁর বক্তব্য, “এ রকম বিক্ষিপ্ত ঘটনা ঘটতেই থাকে।” তাঁর দাবি, পুলিশ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছে।
পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
ঘটনায় যুক্ত থাকার অভিযোগে পাঁচ জনকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে দু’জনকে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে আহত হওয়ার পরে গ্রেফতার করা হয়।
অন্য দিকে, জামুইয়ের বিজেপি বিধায়ক তথা রাজ্যের শিল্পমন্ত্রী শ্রেয়সী সিংহ স্থানীয় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রকাশ্যেই প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য, নির্যাতনের ভিডিয়ো ব্যাপক ভাবে ছড়িয়ে পড়ার পরেই পুলিশ সক্রিয় হয়। পরে তিনি জানান, তদন্তের জন্য একটি বিশেষ তদন্তকারী দল গঠন করা হয়েছে।
এক্স-এ শ্রেয়সী লেখেন, “…এই স্পর্শকাতর সময়ে মেয়েটি ও তার পরিবারের গোপনীয়তা এবং মর্যাদা রক্ষা করাও আমাদের দায়িত্ব। আমার বিনীত অনুরোধ, তাদের পরিচয় প্রকাশ করে দেয় এমন কোনও ছবি, ভিডিয়ো বা অন্য কোনও তথ্য ছড়িয়ে দেবেন না।”
শ্রেয়সীর বক্তব্যের সঙ্গে জেডিইউ নেতাদের মন্তব্যের এই ফারাক শাসক জোটের মধ্যে ঘটনাটি নিয়ে অবস্থানগত অসংগতিও সামনে এনেছে।
বিরোধীদের নিশানায় সরকার
সরকারকে আক্রমণ করে তেজস্বী যাদব বলেন, “একটি ছেলে ও একটি মেয়ের উপর নির্যাতনকে এনডিএ নেতারা বিচ্ছিন্ন, বিক্ষিপ্ত ঘটনা বলছেন—এ অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। তাঁদের নিজেদের পরিবারের কারও সঙ্গে এমন ভয়াবহ ঘটনা ঘটলে কি তাঁরা একই প্রতিক্রিয়া জানাতেন? রাজ্যের কোথাও মেয়েরা নিরাপদ নয়। কারণ, বেপরোয়া ছেলেদের পুলিশের কোনও ভয় নেই।”
বিহার প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি রাজেশ কুমারও ঘটনার নিন্দা করেছেন। তাঁর দাবি, এই ঘটনা গোটা রাজ্যের আইন প্রয়োগের ব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ্যে এনেছে।
রাহুল গান্ধীও সামাজিক মাধ্যমে ঘটনার তীব্র নিন্দা করেন। তিনি লেখেন, “বিহারের জামুইয়ের ভিডিয়ো গভীর ভাবে বিচলিত করে। দশম শ্রেণির দুই পড়ুয়াকে রাস্তায় আটকে হেনস্থা, অপমান ও শ্লীলতাহানি করা হয়েছে। একটি কিশোরী হাত জোড় করে ছেড়ে দেওয়ার অনুনয় করছিল, আর দুষ্কৃতীরা তার শ্লীলতাহানি করে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছিল…”
ঘটনার নিন্দা করেছেন পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও। তাঁর বক্তব্য, “বিহারের ভিডিয়ো হৃদয়বিদারক, ভয়ঙ্কর। সত্যি বলতে, দেখে আমার প্রচণ্ড রাগ হচ্ছে। নৈতিকতার পাহারাদারির নামে যারা আইন নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছে, তাদের জবাবদিহি করতেই হবে…”
মমতা আরও বলেন, কোনও সমাজেই উন্মত্ত জনতার হাতে ব্যক্তির মর্যাদা ও স্বাধীনতার সিদ্ধান্ত ছেড়ে দেওয়া যায় না। পাশাপাশি বিজেপির রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
এদিকে, ঘটনার পর স্থানীয় প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়েছে বিহার রাজ্য মহিলা কমিশন। কমিশনের চেয়ারপার্সন অপ্সরা মিশ্র জানান, জামুইয়ের জেলাশাসক ও পুলিশ সুপারকে অবিলম্বে কঠোর ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
জামুইয়ের ঘটনা এখন শুধু একটি অপরাধের তদন্তে সীমাবদ্ধ নেই। বিহারে আইনশৃঙ্খলা, পুলিশের ভূমিকা এবং এনডিএ-র দীর্ঘদিনের ‘সুশাসন’ প্রচারের বিশ্বাসযোগ্যতা—তিনটিকেই নতুন করে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



