কমিশনের অন্দরেই বিস্ফোরণ: দশ মাসে দুই কমিশনারের চোদ্দো আপত্তি

যা জানা জরুরি
- নতুন ভোটারের নাম তোলা, পুরনো নাম বাদ দেওয়া এবং ভোটার-তথ্যের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নির্বাচন কমিশনের ভিতরেই তীব্র বিরোধের ছবি প্রকাশ্যে এল।
- সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক জোশী গত দশ মাসে অন্তত চোদ্দোবার লিখিত আপত্তি জানিয়েছেন।
- তাঁদের অভিযোগ, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে তাঁদের অন্ধকারে রেখে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
নতুন ভোটারের নাম তোলা, পুরনো নাম বাদ দেওয়া এবং ভোটার-তথ্যের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নির্বাচন কমিশনের ভিতরেই তীব্র বিরোধের ছবি প্রকাশ্যে এল। সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক জোশী গত দশ মাসে অন্তত চোদ্দোবার লিখিত আপত্তি জানিয়েছেন। একদিনেই আপত্তি উঠেছে চারবার। তাঁদের অভিযোগ, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে তাঁদের অন্ধকারে রেখে। সংশ্লিষ্ট আপত্তির প্রতিলিপি প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকেও পাঠানো হয়েছিল।
২৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত অনুসন্ধান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুনে বিহার থেকে শুরু হওয়া বিশেষ নিবিড় সংশোধনে তিরিশটি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের খসড়া ভোটার তালিকা থেকে তেরো কোটির বেশি নাম বাদ পড়েছে। এটি খসড়া তালিকার হিসাব; চূড়ান্তভাবে ভোটাধিকার হারানোর সমার্থক নয়।
বিরোধের একটি প্রধান কেন্দ্র নতুন ভোটারদের আবেদনপত্র, অর্থাৎ ছয় নম্বর ফর্ম। তাতে জানতে চাওয়া হচ্ছে, আবেদনকারী অথবা তাঁর বাবা-মা কিংবা ঠাকুরদা-ঠাকুরমা বা দাদু-দিদিমার নাম আগের বিশেষ নিবিড় সংশোধনের তালিকায় ছিল কি না। বিকল্প উত্তরগুলির মধ্যে সংশ্লিষ্ট পুরনো তালিকায় নিজের বা পরিবারের নাম না থাকার কথাও রয়েছে। প্রশ্নটিকে বাধ্যতামূলক বলে চিহ্নিত করা হয়নি। অথচ উত্তর না দিলে আবেদন জমা দেওয়ার পরবর্তী ধাপে এগোনো যাচ্ছে না। ফলে আপাত ঐচ্ছিক প্রশ্ন কার্যত বাধ্যতামূলক হয়ে উঠেছে।
নথি অনুযায়ী, ১৬ মে জোশী জানিয়েছিলেন, আইনসম্মত বিধিতে নির্ধারিত আবেদনপত্র বদলাতে হলে ১৯৬০ সালের ভোটার নিবন্ধন বিধি সংশোধন প্রয়োজন। বিশেষ সংশোধনের নির্দেশিকা দিয়ে সেই কাজ করা যায় না। ১৯ মে সান্ধু তাঁর সঙ্গে একমত হন। তবু পরিবর্তন কার্যকর হয়। ১৩ অগস্ট সান্ধু ফের লেখেন, পরিবর্তনটি অনুমোদনহীন ও বেআইনি; যোগ্য তরুণ ভোটারদের হয়রানি এড়াতে তা অবিলম্বে সরানো দরকার। এই ‘বেআইনি’ অভিধা কমিশনারের নথিভুক্ত অবস্থান, আদালতের রায় নয়। আবেদনপত্র বদলের স্বীকৃত পথের নজিরও রয়েছে। আধার নম্বর সংগ্রহের বিধান চালুর পরে ২০২২ সালের ১৭ জুন আইন মন্ত্রক সংশ্লিষ্ট বিধি ও ছয় নম্বর ফর্মে পরিবর্তন বিজ্ঞাপিত করেছিল। সেই প্রক্রিয়ার তুলনাতেই বর্তমান পরিবর্তনের অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন দুই কমিশনার।
দ্বিতীয় বিরোধ ভোটার তালিকা পরিচালনার প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা নিয়ে। অভিযোগ, দিল্লির তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের হাতে নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রীভূত হওয়ায় স্থানীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকেরা প্রয়োজনীয় প্রবেশাধিকার পাচ্ছেন না। নাম সংযোজন, বিয়োজন বা সিদ্ধান্ত সংশোধনের ক্ষমতা প্রয়োগেও বাধা তৈরি হচ্ছে। ১৬ এপ্রিল সান্ধু লিখেছিলেন, তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের নতুন ব্যবস্থাগুলির কথা তিনি সংবাদমাধ্যম থেকে জানতে পারছেন। ২৯ মে জোশী আইআইটির বিশেষজ্ঞ যুক্ত করে স্বাধীন নিরীক্ষার প্রস্তাব দেন। উদ্দেশ্য ছিল, আইননির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষ ছাড়া অন্য কেউ ভোটার-তথ্য বদলাতে পারেন কি না এবং প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা আইন মেনে চলছে কি না, তা পরীক্ষা করা।
এই বিরোধ প্রশাসনিক দায়িত্ব বণ্টনেও গড়ায়। ২৮ জুলাই অতিরিক্ত প্রশাসনিক দায়িত্ব পেয়ে মণীশ গর্গ তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের উপর উপনির্বাচন কমিশনার সঞ্জয় কুমারের তদারকির দায়িত্ব সরিয়ে দেন বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। পরদিন সান্ধু ও জোশী আলাদাভাবে ক্যাবিনেট সচিব টি ভি সোমনাথনকে চিঠি দেন। ৩০ জুলাই তাঁরা যৌথভাবে ওই নির্দেশ বাতিল করেন। অন্যদিকে, নিরীক্ষার প্রস্তাব সমর্থন করার পরেও কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা তাঁর জানা নেই বলে ১৪ অগস্ট নথিভুক্ত করেন সান্ধু। ২২ জানুয়ারি চালু হওয়া ইসিআইনেট ব্যবস্থায় চল্লিশটির বেশি পৃথক অ্যাপ ও পোর্টাল একত্র করা হয়েছিল। উদ্বোধনের সময় কমিশন এর মাধ্যমে স্বচ্ছতা ও জনবিশ্বাস বাড়ানোর কথা বলেছিল। অভ্যন্তরীণ আপত্তি সেই ঘোষিত লক্ষ্য পূরণের পদ্ধতিকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রেও উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। বিচারবিভাগীয় আধিকারিকেরা যাঁদের নাম অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন, তাঁদের বিরুদ্ধে কমিশনের নামে আপিল করার অনুমতি কে দিয়েছিলেন, অগস্টে জানতে চান সান্ধু। তাঁর বক্তব্য, তিনি, জোশী এবং রাজ্যের বর্তমান মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকও আপিলের ভিত্তি বা পদ্ধতি সম্পর্কে অবহিত ছিলেন না। আদালতে কমিশনের দেওয়া হিসাবে, অন্তর্ভুক্ত ভোটারদের বিরুদ্ধে ১৬ লক্ষ ১০ হাজার আপিল জমা পড়েছে; সেগুলি কারা করেছেন, কমিশন তখন তা জানায়নি।
গোয়ার অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে প্রযুক্তিগত বাধা কীভাবে ব্যক্তির ভোটাধিকারকে প্রভাবিত করতে পারে। দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকেরা নথি দেখে ৯৭ জনকে তালিকায় অন্তর্ভুক্তির যোগ্য মনে করেছিলেন। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত ব্যবস্থায় নথিভুক্ত করা যায়নি। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের বিশ্লেষণে ঘটনাটি নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রীভূত হওয়ার বাস্তব পরিণতি হিসেবে উঠে এসেছে। স্থানীয় আধিকারিকের সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে দিল্লির প্রযুক্তিগত অনুমতির প্রয়োজন হলে, কাগজে থাকা ক্ষমতা বাস্তবে কতটা অবশিষ্ট থাকে, সেই প্রশ্নও তৈরি হয়।
কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের আইনি কাঠামো এই বিরোধকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। ২০২৩ সালের সংশ্লিষ্ট আইনের ১৮ ধারা অনুযায়ী, কমিশনের কাজ যত দূর সম্ভব সর্বসম্মতিক্রমে পরিচালিত হবে। মতপার্থক্য হলে সংখ্যাগরিষ্ঠের মত অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কাজ পরিচালনার পদ্ধতি এবং কমিশনারদের মধ্যে দায়িত্ব বণ্টন নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের কথা রয়েছে। ফলে তিন সদস্যের মধ্যে দু’জনকে সিদ্ধান্ত সম্পর্কে অবহিত না রাখার অভিযোগ সরাসরি যৌথ পরিচালনার প্রশ্ন তোলে। তবে নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তের বৈধতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথি, অনুমোদন এবং প্রযোজ্য বিধি একত্রে পরীক্ষা করা প্রয়োজন। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদমর্যাদা তাই অন্য দুই সদস্যের মতামত অগ্রাহ্য করার অবাধ অধিকার দেয় না। সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিধান কার্যকর করতে হলে সদস্যদের সামনে সিদ্ধান্তের বিষয় এবং প্রাসঙ্গিক তথ্য থাকা আবশ্যক। তা না থাকলে আইননির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগই সংকুচিত হয়।
কমিশনের ভিতরে মতভেদ নতুন নয়। ২০১৯ সালে অশোক লাভাসা নির্বাচনী আচরণবিধি সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে নিজের ভিন্নমত চূড়ান্ত নির্দেশে নথিভুক্ত করার দাবি তুলেছিলেন। নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহকে ছাড় দেওয়ার কয়েকটি সিদ্ধান্তের সঙ্গে তিনি একমত হননি। এবারের ঘটনায় অবশ্য দুই সদস্যের অভিযোগ, তাঁরা সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া সম্পর্কেই জানতেন না। সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের এই অবস্থান বর্তমান বিরোধকে আগের নজিরগুলির থেকে আলাদা করেছে।
এরই মধ্যে দিল্লির ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে ২২ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্টেও প্রশ্ন উঠেছে। বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী বলেন, সন্দেহভাজন ভোটারদের নোটিস অনেকাংশে যান্ত্রিকভাবে পাঠানো হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে; ব্যবস্থা আরও পরিশীলিত করা প্রয়োজন। আদালত কমিশনের কাছে পরিস্থিতির বিবরণ চেয়েছে। কমিশনের আইনজীবীর বক্তব্য, নোটিসে কারণ উল্লেখ থাকছে। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত জানতে চান, ভোটারকে ঠিক কী ব্যাখ্যা দিতে হবে এবং কোন তথ্য দিলে আপত্তির নিষ্পত্তি হবে, তা যথেষ্ট স্পষ্ট কি না। এই শুনানি অভ্যন্তরীণ বিরোধের নিষ্পত্তি নয়, তবে ভোটার যাচাইয়ের পদ্ধতি নিয়ে বৃহত্তর উদ্বেগের প্রাসঙ্গিক পটভূমি।
২১ সেপ্টেম্বর কমিশন এবং দুই কমিশনারের কাছে প্রশ্ন পাঠিয়েও প্রকাশের সময় পর্যন্ত উত্তর মেলেনি। ফলে আপত্তিগুলির নিষ্পত্তি হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অনুসন্ধান থেকে যে প্রশ্নগুলি সামনে আসছে, তার উত্তর নির্দিষ্ট নথিতেই খুঁজতে হবে। প্রতিটি পরিবর্তন কে প্রস্তাব করেছিলেন, অনুমোদন কার ছিল, আপত্তির পরে কী সিদ্ধান্ত হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত আবেদনকারীদের প্রতিকার কী—এই তথ্য প্রকাশ জরুরি। প্রযুক্তিগত ব্যবস্থায় প্রত্যেক পরিবর্তনের সময়, নির্দেশদাতা এবং কারণ সংরক্ষিত থাকলে দায় নির্ধারণ সহজ হয়। তালিকার শুদ্ধতা রক্ষা এবং যোগ্য নাগরিকের নাম বজায় রাখা একই দায়িত্বের দুই দিক। অভিযোগের যথাযথ পরীক্ষা ছাড়া ভোটচুরির সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যেমন যুক্তিসঙ্গত নয়, তেমনই লিখিত আপত্তিগুলিকে নিছক ব্যক্তিগত মনোমালিন্য বলে সরিয়ে রাখলেও মূল প্রশ্নগুলির উত্তর মিলবে না। সেই কারণেই নাগরিকের পক্ষে সবচেয়ে প্রয়োজন নিজের নামের অবস্থা জানা, আপত্তির কারণ বোঝা এবং ভুল হলে সময়মতো সংশোধনের সুযোগ পাওয়া। প্রশাসনিক ক্ষমতার বিরোধে এই মৌলিক প্রয়োজন আড়াল হয়ে গেলে নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি আস্থার ক্ষয় আরও গভীর হবে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



