International

প্রকৃতির টিকা!

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • ব্যাঙের ত্বকে বসানো উপকারী জীবাণু দিয়ে রোগ ঠেকানো?
  • কিংবা বুনো পরাগবাহীদের ভাইরাসের ধাক্কা সামলানোর ক্ষমতা বাড়ানো?
  • শুনতে কল্পবিজ্ঞান মনে হলেও, ব্রিটেনে এখন সেসব নিয়েই গবেষণা শুরু হচ্ছে।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

প্রতিবেদন: মানুষকে টিকা দেওয়া নতুন কিছু নয়। কিন্তু গাছকে ছত্রাকের বিরুদ্ধে ‘টিকা’ দেওয়া? ব্যাঙের ত্বকে বসানো উপকারী জীবাণু দিয়ে রোগ ঠেকানো? কিংবা বুনো পরাগবাহীদের ভাইরাসের ধাক্কা সামলানোর ক্ষমতা বাড়ানো? শুনতে কল্পবিজ্ঞান মনে হলেও, ব্রিটেনে এখন সেসব নিয়েই গবেষণা শুরু হচ্ছে।

২১ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রকল্পতালিকায় সরকারি উদ্ভাবন সংস্থা আরিয়া জানিয়েছে, ‘অ্যাক্সেলারেটেড অ্যাডাপটেশন’ কর্মসূচিতে মোট ৫ কোটি ৪০ লাখ পাউন্ড বরাদ্দ করা হয়েছে। প্রথম দুই বছরে ১৪টি আন্তঃবিভাগীয় দলকে দেওয়া হবে প্রায় ৩ কোটি পাউন্ড। প্রাথমিক ফল আশাব্যঞ্জক হলে পরে আরও ২ কোটি ৪০ লাখ পাউন্ড দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

উদ্দেশ্যটা বেশ সরল, যদিও কাজটা মোটেই নয়। জলবায়ু পরিবর্তন, নতুন রোগ, দূষণ এবং ভূমি ব্যবহারের বদলের ফলে বন্যপ্রাণী ও উদ্ভিদের উপর চাপ বাড়ছে দ্রুত। কিন্তু প্রকৃতির স্বাভাবিক অভিযোজনের গতি অনেক সময় সেই চাপের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। প্রশ্ন হল, জৈবপ্রযুক্তি কি সেই ব্যবধানটা দায়িত্বশীল ভাবে কিছুটা কমাতে পারে?

কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি দল আরএনএ-নির্ভর পদ্ধতিতে গাছকে নতুন ছত্রাকজনিত রোগের বিরুদ্ধে সুরক্ষিত করার চেষ্টা করবে। বার্মিংহামের একটি দল তৈরি করছে এমন একটি প্রযুক্তি, যা গাছের নিজস্ব রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা সক্রিয় করতে পারে। কিউয়ের রয়্যাল বোটানিক গার্ডেনস আবার খরা সহ্য করার ক্ষমতা বাড়াতে বীজের প্রাথমিক প্রস্তুতির পদ্ধতি পরীক্ষা করবে।

শুধু চারাগাছ নয়, গবেষণার নজরে রয়েছে পূর্ণবয়স্ক বুনো গাছও। কোথাও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা, কোথাও ফুল ফোটার সময় সাময়িক ভাবে বদলে দেওয়ার পরীক্ষা। পিটভূমির শ্যাওলাকেও ভবিষ্যতের বদলে যাওয়া আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার উপায় খোঁজা হচ্ছে।

আর ব্যাঙ? তাদের জন্য রয়েছে ‘শিল্ড’ প্রকল্প। উভচর প্রাণীর ত্বকে থাকা অণুজীবসমাজ বদলে দিয়ে প্রাণঘাতী কাইট্রিড ছত্রাকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ তৈরি করা যায় কি না, সেটিই পরীক্ষার বিষয়। পরাগবাহী পোকাদের নিয়েও দুটি দল কাজ করবে—লক্ষ্য, ভাইরাসের ক্ষতি কমানো। গবেষণার আলোচনায় এসেছে ইংলিশ ওক, বাফ-টেইলড বাম্বলবি এবং সোয়ালো-টেইল প্রজাপতির মতো প্রজাতিও।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘কিন্তু’ আছে। এগুলি সম্ভাব্য গবেষণা, তৈরি কোনও সংরক্ষণ-চিকিৎসা নয়। পরীক্ষাগারে কোনও পদ্ধতি কাজ করলেই তা পরের দিন জঙ্গলে প্রয়োগ করা হবে না।

বরং কর্মসূচিতে নিরাপত্তার উপর বেশ জোর দেওয়া হয়েছে। দায়িত্বশীল গবেষণা কাঠামো অনুযায়ী ২০৩০ সালের আগে পরীক্ষামূলক প্রাণী বা পরিবর্তিত জীবকে বুনো পরিবেশে ছাড়ার অনুমতি নেই। পরিবেশগত মডেল, তথ্য যাচাই, নৈতিকতা ও শাসনব্যবস্থা নিয়েও আলাদা দল কাজ করবে।

কারণ আসল প্রশ্ন শুধু ‘কাজ করবে কি না’ নয়। কোনও পরিবর্তন পরবর্তী প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়বে কি? অন্য প্রজাতির উপর তার প্রভাব কী হতে পারে? একবার প্রকৃতিতে ছেড়ে দিলে সেটিকে আবার ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে তো? প্রযুক্তির সাফল্যের পাশাপাশি এই প্রশ্নগুলির উত্তরও জরুরি।

সমালোচকদের আশঙ্কা, জটিল বাস্তুতন্ত্রকে কয়েকটি জিন বা জীবাণুর সমস্যা হিসেবে দেখলে বিপদ হতে পারে। দ্রুত বেড়ে ওঠা গাছ হয়তো কম শক্ত কাঠ তৈরি করবে। কোনও রোগপ্রতিরোধী প্রজাতি আবার প্রতিবেশী প্রজাতির তুলনায় অস্বাভাবিক সুবিধা পেয়ে যেতে পারে। পরীক্ষাগারে উপকারী বলে মনে হওয়া ত্বকের জীবাণুও প্রকৃতিতে গিয়ে অপ্রত্যাশিত ভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

তাই এই গবেষণাকে ‘প্রকৃতিকে বাঁচানোর শেষ অস্ত্র’ বলা যেমন আগেভাগে সিদ্ধান্তে পৌঁছনো, তেমনই জিন বা জীবাণু নিয়ে পরীক্ষা হচ্ছে বলেই সব দরজা বন্ধ করে দেওয়াও সহজ সমাধান নয়। আবাসস্থল ধ্বংস, দূষণ ও জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমানোই জলবায়ু ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার মূল কাজ। প্রযুক্তি সেই দায়িত্বের বিকল্প হতে পারে না।

তবে ছাইগাছের রোগ কিংবা উভচরদের প্রাণঘাতী ছত্রাক যখন দ্রুত জনসংখ্যা কমিয়ে দিচ্ছে, তখন অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত ও সতর্ক পরীক্ষাও ভবিষ্যতের সংরক্ষণ-সরঞ্জামের অংশ হয়ে উঠতে পারে।

আর সেই সিদ্ধান্ত শুধু গবেষক ও অর্থদাতাদের হাতে থাকলে চলবে না। যে এলাকায় ভবিষ্যতে কোনও প্রযুক্তি প্রয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে, সেখানকার মানুষ, ভূমিমালিক, আদিবাসী জ্ঞানধারী এবং সংরক্ষণকর্মীদের মতও গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ শেষ পর্যন্ত সফলতা মানে পরীক্ষাগারে রোগ কমে যাওয়া নয়। সফলতা মানে বনের ভিতরেও সেই পরিবর্তন নিরাপদ থাকা—শুধু এক প্রজন্ম নয়, বহু প্রজন্ম ধরে।

প্রকৃতিকে দ্রুত বদলে দেওয়ার প্রযুক্তি তৈরি করার আগে তাই আরও একটি জিনিসের পরীক্ষা জরুরি—সতর্ক হওয়ার ক্ষমতায় মানুষ প্রকৃতির চেয়ে কতটা এগিয়ে?

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles