সমাজমাধ্যমে টোপ দিয়ে সন্ত্রাসে নিয়োগ, ১৪ রাজ্যে জাল শাহজাদ ভাট্টির

যা জানা জরুরি
- গত দু’বছরে ভারতে একাধিক সন্ত্রাস-সংক্রান্ত তদন্তে উঠে এসেছে পাকিস্তানের এক সমাজমাধ্যম ব্যক্তিত্বের নাম—শাহজাদ ভাট্টি।
- সীমান্তবর্তী পাঞ্জাবে ভয় দেখিয়ে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা দিয়ে শুরু।
- ক্রমে সেই জাল ছড়িয়েছে দেশের ১৪টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
গত দু’বছরে ভারতে একাধিক সন্ত্রাস-সংক্রান্ত তদন্তে উঠে এসেছে পাকিস্তানের এক সমাজমাধ্যম ব্যক্তিত্বের নাম—শাহজাদ ভাট্টি। সীমান্তবর্তী পাঞ্জাবে ভয় দেখিয়ে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা দিয়ে শুরু। ক্রমে সেই জাল ছড়িয়েছে দেশের ১৪টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে। তাঁর নির্দেশে কাজ করতে গিয়ে বহু তরুণ এখন কঠোর সন্ত্রাসবিরোধী আইন ইউএপিএ-তে অভিযুক্ত হয়ে জেলে।
তাঁদের কাউকে দেওয়া হয়েছিল ভাট্টি ও তাঁর সহযোগীদের মহিমা প্রচার করে পোস্টার সাঁটার কাজ। কাউকে বলা হয়েছিল গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার কাছে নজরদারি ক্যামেরা বসাতে, যার ছবি সরাসরি পৌঁছে যাচ্ছিল পাকিস্তানে। আবার কারও দায়িত্ব ছিল ফোন করে তোলাবাজি।
১৬ সেপ্টেম্বর কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক ‘শাহজাদ ভাট্টি নেটওয়ার্ক’ বা এসবিএন-কে ইউএপিএ-র আওতায় সন্ত্রাসবাদী সংগঠন ঘোষণা করেছে। বিজ্ঞপ্তিতে মন্ত্রক জানিয়েছে, সন্ত্রাসমূলক কাজকর্মের মাধ্যমে এই সংগঠন দেশের ‘গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার সামনে গুরুতর বিপদ’ সৃষ্টি করছে। স্বাধীনতা দিবসের আগে দেশজুড়ে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে এই চক্রের সঙ্গে যুক্ত সন্দেহে ২০০-রও বেশি ব্যক্তিকে আটক বা গ্রেফতার করা হয়।
পাঞ্জাবিতে কথা বলেন ভাট্টি। বর্তমানে তাঁর কাজকর্ম চলে সংযুক্ত আরব আমিরশাহি থেকে। নিজের চেহারা আরও আকর্ষণীয় দেখাতে বিশেষ ফিল্টার ব্যবহার করে নিয়মিত ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুকে ভিডিয়ো দেন। পরনে চিরাচরিত পাঠানি পোশাক। বেশির ভাগ ভিডিয়োতেই দেখা যায়, দামি গাড়ি থেকে নামছেন অথবা স্নুকার টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। আবহে বাজে দাপট জাহির করার মতো সঙ্গীত।
নিরাপত্তা আধিকারিকদের দাবি, গত এক বছরে সংগঠিত অপরাধ থেকে সন্ত্রাসমূলক কাজকর্মে জড়িয়ে পড়েছেন ভাট্টি। সমাজমাধ্যমের সুবাদে ভারতীয়দের মধ্যে তাঁর যোগাযোগের বিস্তার দেখে তাঁকে কাজে লাগাতে এগিয়ে আসে পাকিস্তানের গুপ্তচর সংস্থা ইন্টার-সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্স বা আইএসআই। তাঁর একাধিক ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট নিরাপত্তা সংস্থাগুলির নজরে এসেছে। এই অ্যাকাউন্টগুলির নামের শেষে থাকে ‘৩৩৩’।
স্বাধীনতা দিবসের আগে এসবিএন-এর বিরুদ্ধে দেশব্যাপী তল্লাশি ও ধরপাকড় শুরুর আগেই ভাট্টির সঙ্গে সম্পর্কিত ১২৫টি ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট বন্ধ করেছিল দিল্লি পুলিশ। ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে পুলিশ ১৫টি এফআইআর দায়ের করেছে এবং ৬৯ জন অভিযুক্তকে গ্রেফতার করেছে। ধৃতদের দুই-তৃতীয়াংশ পাঞ্জাব ও উত্তরপ্রদেশের বাসিন্দা।
গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিরা মূলত স্বল্পশিক্ষিত ও আর্থিক ভাবে দুর্বল। সমাজমাধ্যমের মাধ্যমে তাঁদের দলে টানা হয়েছিল। কাউকে টাকার প্রলোভন দেখানো হয়, কাউকে উপসাগরীয় অঞ্চলে নিয়ে গিয়ে বসবাসের ব্যবস্থা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। কারও ক্ষেত্রে টোপ ছিল ব্যক্তিগত সমস্যার সমাধান।
ভারতে অপরাধমূলক কাজকর্মের সঙ্গে ভাট্টির যোগাযোগের শুরু পাঞ্জাবে। পরে তা ছড়ায় উত্তরপ্রদেশ, হরিয়ানা, দিল্লি, রাজস্থান, মহারাষ্ট্র, উত্তরাখণ্ড, কর্নাটক, গুজরাত, বিহার, তেলঙ্গানা, হিমাচলপ্রদেশ, জম্মু ও কাশ্মীর এবং কেরলে।
১৯৬৭ সালের বেআইনি কার্যকলাপ প্রতিরোধ আইন বা ইউএপিএ-র ৩৫(১) ধারায় সন্ত্রাসবাদী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত ৪৬তম সংগঠন এসবিএন। এই ধারায় কোনও সংগঠনকে সন্ত্রাসবাদী হিসেবে চিহ্নিত করার ক্ষমতা রয়েছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের।
এসবিএন-এর বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট মামলাগুলির উল্লেখ না করলেও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের বিজ্ঞপ্তিতে নথিভুক্ত অপরাধকে ন’টি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট আইনগুলির মধ্যে রয়েছে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা, তথ্যপ্রযুক্তি আইন, ২০০০, বিস্ফোরক পদার্থ আইন, ইউএপিএ, সরকারি গোপনীয়তা আইন, ১৯২৩, অভিবাসন ও বিদেশি আইন, ২০২৫ এবং দিল্লি সম্পত্তি বিকৃতিকরণ প্রতিরোধ আইন, ২০০৭। মন্ত্রকের বক্তব্য, সহজে প্রভাবিত করা যায় এমন তরুণ এবং স্থানীয় অপরাধীদের কাজে লাগিয়ে সীমান্তের ওপার থেকে অস্ত্র, বিস্ফোরক ও মাদক পাচার করাই এই সংগঠনের উদ্দেশ্য।
উত্তরপ্রদেশ পুলিশের এক আধিকারিকের কথায়, সমাজমাধ্যমে ভাট্টির পোস্টে যাঁরা সাড়া দিতেন, তাঁদের মধ্য থেকে তরুণদের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন তিনি। প্রকাশ্য স্থানে তাঁর ছবি দেওয়া পোস্টার সাঁটার জন্য পাঁচ থেকে দশ হাজার টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দিতেন। উদ্দেশ্য ছিল, নিজেকে অপরাধজগতের দাপুটে ব্যক্তি হিসেবে তুলে ধরে মানুষের মনে ভয় ঢোকানো। পরে তাঁদেরই কয়েক জনকে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার কাছে গ্রেনেড ছোড়া কিংবা বিস্ফোরক পেতে রাখার কাজে লাগান বলে অভিযোগ। টাকা সরাসরি তাঁদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পাঠানো হত। অনেক ক্ষেত্রেই সেই অর্থ আসত মধ্য এশিয়ার দেশগুলি থেকে।
ওই আধিকারিক জানান, নতুন কেউ কতটা ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত, তা বুঝে নিয়ে ভাট্টি তাঁকে আরও গুরুতর কাজের দায়িত্ব দিতেন বলে অভিযোগ। এর মধ্যে ছিল রেলস্টেশন, বিমানঘাঁটি এবং প্রধান সড়কের কাছে চিনে তৈরি নজরদারি ক্যামেরা বসানো। সেই ক্যামেরার ছবি সরাসরি সম্প্রচারিত হত পাকিস্তানে। একটি ঘটনায় পাঞ্জাবের কয়েক জনকে পেট্রলবোমা এবং হাতে তৈরি বিস্ফোরক যন্ত্র তৈরির নির্দেশিকাও অনলাইনে পাঠিয়েছিলেন বলে ভাট্টির বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে।
ওই পুলিশ আধিকারিকের কথায়, ‘কোনও কোনও ক্ষেত্রে টাকাই ছিল প্রেরণা। অন্য ক্ষেত্রে ধর্মীয় আবেগকে কাজে লাগানো হয়েছে।’
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



