প্রশ্ন করতে শেখা ছাত্রছাত্রীদের ভয় পায় দেশের বর্তমান শাসনব্যবস্থা; তার পছন্দ প্রশ্নহীন আনুগত্যে অভ্যস্ত অন্ধভক্ত। শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, মধ্যপ্রদেশের ইন্দোরে ‘ছাত্রোঁ কি গুঞ্জ’ কর্মসূচিতে এই অভিযোগ তুলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে আক্রমণ করলেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। শিক্ষার সুযোগ, নিয়োগের অনিশ্চয়তা এবং প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতার প্রশ্নকে একসূত্রে বেঁধে তিনি দাবি করেন, পড়ুয়াদের লড়াই গোটা ব্যবস্থাটির বিরুদ্ধে।

রাহুলের বক্তব্য, ছাত্রের স্বভাবই হল জানতে চাওয়া। অমিত শাহের ছেলে কীভাবে ক্রিকেট প্রশাসনের শীর্ষে পৌঁছলেন, দেশের ব্যবসাবাণিজ্যে দু’জন শিল্পপতির এত প্রভাব কেন, বিচারব্যবস্থা ও নির্বাচন কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠান নিজেদের দায়িত্ব পালন করছে কি না—এসব প্রশ্ন ছাত্ররাই তোলেন। তাঁর মতে, কৌতূহল এবং নির্ভয়ে প্রশ্ন করার ক্ষমতাই ছাত্রকে অন্ধ অনুসারীর থেকে আলাদা করে। সেই কারণেই ক্ষমতাসীনদের কাছে ছাত্র অস্বস্তির কারণ।

এই ব্যবস্থার শীর্ষে ছ’জনের অবস্থান বলে অভিযোগ করেন রাহুল। তাঁর তালিকায় ছিলেন মোদি, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের প্রধান মোহন ভাগবত এবং শিল্পপতি গৌতম আদানি ও মুকেশ অম্বানি। রাজনৈতিক ক্ষমতা, নজরদারি, মতাদর্শ ও অর্থবল পরস্পরকে শক্তি জোগাচ্ছে বলে তাঁর দাবি। দেশের প্রতিষ্ঠানগুলিতে নিজেদের অনুগতদের বসানো হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

শিক্ষায় সরকারি ব্যয়ের প্রসঙ্গ টেনে রাহুল দাবি করেন, ২০১৪ সালে বাজেটের ৪.৬ শতাংশ শিক্ষায় বরাদ্দ হত; এখন তা কমে ২.৬ শতাংশ হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, শিক্ষায় যে অর্থ খরচ হওয়ার কথা ছিল, তার বিপুল অংশ ধনকুবেরদের সুবিধা করে দিতে ব্যবহার হয়েছে। এ প্রসঙ্গে তিনি ৭.৭ লক্ষ কোটি টাকার হিসাব দেন। এগুলি তাঁর উত্থাপিত দাবি; অর্থ অন্যত্র যাওয়ার অভিযোগের স্বতন্ত্র প্রমাণ ওই প্রতিবেদনে দেওয়া হয়নি।

বৃত্তি কমা এবং সরকারি বিদ্যালয় বন্ধ হওয়ার বিষয়টিও তোলেন বিরোধী দলনেতা। তাঁর দাবি, গত দশ বছরে দেড় কোটি পড়ুয়া বৃত্তির সুযোগ হারিয়েছেন এবং দেশে এক লক্ষ সরকারি স্কুল বন্ধ হয়েছে। বন্ধ স্কুলগুলির ৫৫ শতাংশই মধ্যপ্রদেশ ও উত্তরপ্রদেশে বলে অভিযোগ করেন তিনি। বিদ্যালয়ের দুরবস্থা কিংবা পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে অন্ধ অনুসারীরা প্রশ্ন তোলেন না, পড়ুয়ারাই এসব নিয়ে সরব হন—এই ছিল তাঁর যুক্তি।

সমাবেশে পড়ুয়াদের বক্তব্যেও উঠে আসে নিয়োগ নিয়ে অনিশ্চয়তার অভিজ্ঞতা। এক মহিলা জানান, সরকারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও তাঁর মতো বহু প্রার্থী চাকরিতে যোগ দিতে পারছেন না। মধ্যপ্রদেশে অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির সংরক্ষণ নিয়ে বিচারাধীন বিরোধের প্রেক্ষিতে অনুসৃত ৮৭:১৩ ব্যবস্থায় ১৩ শতাংশ নিয়োগ আটকে রয়েছে। ফলে পরীক্ষায় সফল হওয়ার পরেও অপেক্ষার অবসান হচ্ছে না।

দেওয়াসের এক ছাত্রের অভিযোগ, রাজ্যের সরকারি কর্মী বাছাই কমিশনের পরীক্ষায় অনিয়মের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলায় তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, জেলেও যেতে হয়েছে। ইন্দোরে আদিবাসী পড়ুয়াদের ছাত্রাবাসের অভাবের কথা জানান এক ছাত্রী। শিক্ষকতার চাকরিপ্রার্থীদের চলতি প্রতিবাদে যোগ দেওয়ার ইচ্ছাও প্রকাশ করেন রাহুল। তাঁর দাবি, সারা দেশে শিক্ষকের দশ লক্ষ পদ শূন্য পড়ে রয়েছে।

আলোচনায় আসে পড়ুয়াদের নিরাপদে থাকার সমস্যাও। দিল্লির সত্য নিকেতনে বাড়ি ভেঙে মৃত্যুর ঘটনার একটি ভিডিয়ো দেখানো হয়। নিহত আঠারো বছরের অর্পিত জাজের দিদি প্রিয়াংশী প্রশ্ন তোলেন, পড়াশোনার জন্য বাড়ি ছেড়ে অন্য শহরে আসা মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের নিরাপত্তার দায়িত্ব কে নেবে? ব্যবস্থার দায়িত্বজ্ঞানহীনতায় নিরীহ প্রাণ যাচ্ছে বলে তাঁর অভিযোগ। পরিবারটিকে ন্যায়বিচারের লড়াইয়ে সাহায্যের আশ্বাস দেন রাহুল।

ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে এই কথোপকথন ছিল কর্মসূচির পঞ্চম পর্ব। এর আগে কোটা, দেহরাদূন, প্রয়াগরাজ ও পুনেতে এমন অনুষ্ঠান হয়েছে। ইন্দোরে প্রথমে ১২ সেপ্টেম্বর জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল। আদালতের নির্দেশে মাঠটির ব্যবহার নির্দিষ্ট কয়েকটি উদ্দেশ্যে সীমিত থাকার যুক্তিতে প্রশাসন অনুমতি দেয়নি। পরে স্থান বদলায় কংগ্রেস। অন্য মাঠের সাময়িক ভাড়া বাবদ ১০.০৮ লক্ষ টাকা দেওয়ার পরেও অতিরিক্ত ৪.০৩ লক্ষ টাকা চাওয়া হয়। কর্তৃপক্ষের যুক্তি, অনুমোদিত সময়ের আগেই মাঠের একাংশ ব্যবহার করা হয়েছিল।

কর্মসূচির আয়োজন নিয়েও সংঘাত হয়েছিল। কংগ্রেসের অভিযোগ, অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যাওয়া ছাত্রছাত্রীদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিতে হবে বলে প্রশিক্ষণকেন্দ্রের পরিচালকদের কাছ থেকে জোর করে মুচলেকা আদায় করছিল পুলিশ। দলের মুখপাত্র পবন খেরা একে নিরাপত্তার আয়োজনের বদলে ভয় দেখানোর ধারাবাহিক প্রয়াস বলে বর্ণনা করেন। তাঁর বক্তব্য, জনসমাবেশে উপস্থিত প্রত্যেকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব প্রশাসনের।

পুলিশের নিরাপত্তা সংক্রান্ত শর্তে রাজীব গান্ধীর হত্যাকাণ্ড এবং সেই ঘটনায় নিরাপত্তার ব্যর্থতা নিয়ে ভার্মা কমিশনের পর্যবেক্ষণ উল্লেখ করাতেও আপত্তি জানায় কংগ্রেস। দলের অভিযোগ, বাবার হত্যার প্রসঙ্গ তুলে রাহুলকে ভয় দেখানোর চেষ্টা হয়েছে। তবে এই ব্যাখ্যা কংগ্রেসের; নিরাপত্তার শর্ত দেওয়ার ঘটনাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে রাজনৈতিক হুমকির প্রমাণ বলা যায় না।

পাল্টা আক্রমণে মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী মোহন যাদব কর্মসূচিটিকে ‘মিথ্যার প্রতিধ্বনি’ বলে কটাক্ষ করেন। তাঁর দাবি, রাজ্যে বিদ্যালয় শিক্ষার বাজেট প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৩৮,৬৫৮ কোটি টাকা হয়েছে। স্কুলশিক্ষায় দশ হাজার নিয়োগের কাজ চলছে এবং সাত হাজার অধ্যাপক নিয়োগ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। মুখ্যমন্ত্রী আরও দাবি করেন, রাজ্যে চিকিৎসা শিক্ষার প্রসার হয়েছে; বর্তমানে ৩৩টি মেডিক্যাল কলেজ চলছে। পড়ুয়াদের পোশাক, যাতায়াতের সাইকেল এবং মেধাবীদের বিভিন্ন সুবিধার কথাও তুলে ধরেন তিনি। রাহুলকে বিভ্রান্তি ছড়ানোর বদলে তথ্য দিয়ে আলোচনা করার আহ্বান জানান মুখ্যমন্ত্রী।

এই বাদানুবাদের কেন্দ্রে রয়ে গেল পড়ুয়াদের কয়েকটি সরাসরি ও জরুরি প্রশ্ন: যোগ্যতা অর্জনের পর নিয়োগ হবে কবে, শিক্ষার খরচ কীভাবে সামলাবেন তাঁরা, নিরাপদ আবাসন পাবেন কোথায়, আর অনিয়মের প্রতিবাদ করলে শাস্তির ভয় থাকবে কেন? ইন্দোরের মঞ্চে সেই দৈনন্দিন উদ্বেগগুলিকেই বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রশ্নে পরিণত করতে চাইলেন রাহুল।